মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পাহাড়ঘেরা রাঙ্গামাটি

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫
  • গৌরব জি পাথাং

রাঙ্গামাটি শহর বলতেই চোখে ভাসে ঝুলন্ত ব্রিজের ছবি। ঝুলন্ত ব্রিজ আর রাঙ্গামাটি শহর একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ঝুলন্ত ব্রিজ ছাড়া রাঙ্গামাটি শহর যেন পূর্ণতা পায় না। ঝুলন্ত ব্রিজের হাতছানি সর্বদাই আমাকে আকর্ষণ করত। শৈশব থেকেই রাঙ্গামাটি দেখার তীব্র ইচ্ছা ছিল। সেই ইচ্ছা প্রথমবারের মতো পূরণ হলো ২০১৩ সালে। ফাদার সুধীর, ফাদার মাইকেল, ফাদার বিকাশ, সিস্টার অনিতা তজু, সিস্টার ট্রিজা আসাম, সিস্টার ট্রিজা বেবি গমেজ এবং আমি-এই সাতজন মিলে রাঙ্গামাটিতে ঘুরতে গেলাম। রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত ব্রিজ, সুবলং জলপ্রপাত, কাপ্তাই লেক, কাপ্তাই বাঁধ, জলবিদ্যুত উৎপাদন কেন্দ্র ও রাজবন বিহার ঘুরে দেখে এলাম। সেই অভিজ্ঞতাই সহভাগিতা করতে চাই।

রাঙ্গামাটি শহরের অনতিদূরেই রয়েছে পর্যটন কেন্দ্র। সেখানে গিয়েই দেখতে পেলাম বিখ্যাত ঝুলন্ত ব্রিজ। ঝুলন্ত ব্রিজ লেকের ওপর নির্মিত। আর সেখানেই আছে পর্যটকদের জন্য হোটেল, মোটেল, কটেজ প্রভৃতি। এখানে থেকেই উপভোগ করা যায় কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য। কাপ্তাই লেক দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম মনুষ্যসৃষ্ট স্বাদুপানির হ্রদ। এর আয়তন ১৭২২ বর্গ কি.মি.। আশপাশে প্রায় ৭৭৭ বর্গ কি.মি. এলাকা প্লাবিত করে রেখেছে। এখানে প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। নৌবিহারের জন্য এটি খুব উত্তম স্থান। কাপ্তাইয়ের জলে অনেক ঘরবাড়ি জমিজমা নিমজ্জিত হয়ে গেছে। চাকমা রাজার প্রাসাদও তলিয়ে গেছে। কাপ্তাই বাঁধের কারণে কর্ণফুলি নদীর জল সব ঘরবাড়ির ওপর আঘাত হেনেছে। ভাসিয়ে দিয়েছে স্বপ্ন ও শান্তি সুখের নীড়। সরকারী হিসেব মতে, আনুমাণিক ১৮০০০ পরিবার, ৫৪০০০ একর কৃষিজমি, ৬৯০ বর্গ কি.মি. বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাপ্তাই লেকের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে মনে পড়ল এই উক্তি, ‘আমায় ভাবতে পারো সুখী, হাসি দিয়ে দুঃখটাকে আড়াল করে রাখি’। মানুষ রাঙ্গামাটিতে যায় তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে, কিন্তু কত বেদনা তার বুকে। অনুরোধ করব, শুধু সৌন্দর্য উপভোগ করলেই হবে না, তার ব্যথা বেদনাও উপলব্ধি করুন।

রাঙ্গামাটি শহর থেকে প্রায় ২১ কি.মি. পথ পাড়ি দিয়ে কাপ্তাই জলবিদ্যুত কেন্দ্রে পৌঁছলাম। অনুমতির অভাবে জলবিদ্যুত কেন্দ্রের ভেতরে গিয়ে ঘুরে দেখার সুযোগ পেলাম না। কিন্তু কর্ণফুলি নদীর ওপর নৌকা ভ্রমণ করে বাঁধের কাছাকাছি গিয়ে বাঁধ দেখতে পেলাম। সেখান থেকে গেলাম পার্কে। এই পার্কটি নৌবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত। পার্ক দেখে খুব ভাল লাগল। পার্কটি সবুজে ঘেরা আর টিলায় উঠে হ্রদের সৌন্দর্য দেখা যায়। কাপ্তাই থানার পাশেই রয়েছে বিভিন্ন পার্ক ও পর্যটন কেন্দ্র। এসব দেখতে হলে অনেক সময়ের প্রয়োজন। সময়ের অভাবে ফিরে এলাম রাঙ্গামাটি।

বিকেলে রাজবন বিহারে ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম। রাজবন বিহার বৌদ্ধদের একটা বড় বিহার। এলাকায় প্রথম পা দিয়েই ছোট ব্রিজের ওপর দিয়ে যেতে হলো। চারপাশে জলাশয় আর সারি সারি বৃক্ষরাজি। গিয়ে দেখলাম স্বর্গের প্রতীক বা নির্বাণের প্রতীকরূপে সাতটি ধাপে ঘর নির্মাণ করে রেখেছে। প্রবেশের পর দেখতে পেলাম বানরের মূর্তি বানিয়ে চোখ, মুখ, কান, নাক হাত দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে তাতে লিখে রেখেছেÑ খারাপ কিছু দেখব না, খারাপ কিছু শুনব না, খারাপ কিছু বলব না ইত্যাদি, যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। কিছুদূর অগ্রসর হয়েই দেখতে পেলাম সেখানকার খ্যাতিমান ভিক্ষু বনভান্তের শবদেহ সংরক্ষিত করে রেখেছে। ঘুরে ঘুরে বিহারের সৌন্দর্য দেখে খুবই মুগ্ধ হলাম।

রাঙ্গামাটি শহর থেকে সুবলং জলপ্রপাতের দূরত্ব নৌকা দিয়ে দুই আড়াই ঘণ্টার। এখানে যেতে হলে জলপথেই আপনাকে যেতে হবে। কাপ্তাই লেকের ওপর নৌকায় করে ভ্রমণ করার আনন্দই অনন্য। সকালেই আমরা নৌকায় করে সুবলং জলপ্রপাত দেখার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। আড়াই ঘণ্টা নৌকা ভ্রমণ শেষে পৌঁছলাম সুবলং জলপ্রপাতে। জলপ্রপাতের জলে আমরা ভিজে খুব আনন্দ পেলাম। ঝর্ণা দেখে মনে পড়ল একটি গান, ‘পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝর্ণা বল।’ হ্যাঁ, ঝর্ণা যেন পাহাড়েই কান্না। বোবা বলে সে কিছু বলে না। সেখান থেকে ফেরার পথে একটি লেখা পড়লামÑ ‘ক্ষণিকের অবসরে জলঝিরিতে পদচিহ্ন এঁকে/নয়নমোহিনী জলধারার পরশ নিও মেখে।’ এখানে এসে আমাদের ক্ষণিকের অবসরগুলো খুব আনন্দেই কেটে গেল।

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫

২৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: