কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ফেরিওয়ালা ফেরি করে স্বপ্ন

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

কীর্তিমান ব্যক্তিদের জীবদ্দশায় তাঁদের উল্লেখযোগ্য কর্মসমূহ নিয়ে লেখালেখি তেমন দৃশ্যমান নয়। গ্রন্থ প্রকাশ আরও কম। কীর্তিমানদের যাঁর যা প্রাপ্য, তা জীবিত অবস্থায় প্রদানের ঘটনা হাতেগোনা। মৃত্যুর পর তাঁদের নিয়ে বহু গল্পগাথা নির্মাণ হয়, যার অনেক কিছুর সত্যতা নির্ধারণ তখন সম্ভব হয় না। আর রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রে জীবদ্দশায় তাঁদের জীবন ও কর্মসমূহ নিয়ে আলোচনা নামমাত্র। নির্মোহ পক্ষপাতহীন দৃষ্টিতে মূল্যায়ন আরও কম। তবে অনেকে আত্মজীবনী রচনা করে থাকেন, যার ভেতর মানুষটিকে তাঁর নিজের দৃষ্টিতে খুঁজে পাওয়া যায়। এমনিতেই এ দেশে রাজনীতিতে পারদর্শী না হলে টেকা যায় না। বহু রাজনীতিক ইতিহাসে যেমন ধিক্কৃত হয়েছেন আবার অনেকে ইতিহাস হতে বিলীন হয়ে গেছেন। দেশ, জাতি ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ রাজনীতিকের জীবন ও কর্ম উত্তরসূরিদের জন্য মাইলফলক হয়ে থাকে। জীবদ্দশায় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম নিয়ে যে হাতেগোনা গ্রন্থ রচনা হয়েছে, ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’ গ্রন্থটি সেদিক হতে ব্যতিক্রম। একজন জননেতা একজন পেশাদার সাংবাদিকের দৃষ্টিতে বিধৃত হয়েছেন গ্রন্থটিতে। তিনি চট্টগ্রামের গণমানুষের নন্দিত নেতা, যিনি একজন অসাধারণ কর্মবীর, কর্মযোগী। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানটি কৈশোরোত্তরণের সময় হতেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। মানুষের সঙ্গে, মানুষের পাশে থেকে তিনি ক্রমশ জনগণের নেতা তথা জননেতা হয়ে ওঠেন। আর এক্ষেত্রে তাঁর কর্মকুশলতা, কর্মনিষ্ঠা, সততা, আন্তরিকতা, একাগ্রতা, সত্যনিষ্ঠতা, মানবিকতা, গণমুখিনতা ইত্যাদি সমন্বিত হয়ে তাঁকে বিশেষ আসন ও মর্যাদা দিয়েছে। মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, ভালবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, স্বাধীনতাবোধ, সেবার মনোভাব অনন্য রাজনীতিক হিসেবে তাঁকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত থেকে তিনি স্থান করে নিয়েছেন মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়। বাধাধরা নিয়মের ঘেরাটোপে বন্দী করা যায় না তাঁকে। শেকলমুক্ত পাখির মতো ডানা মেলে উড়ছেন আপন ইচ্ছা ও শক্তিতে। সফলতা-ব্যর্থতার হিসাব না কষে দাঁড়িয়ে যান যে কোন ঘটনায় ঘটনার পাশে। পাহাড়, নদী, সমুদ্র ঘেরা চট্টগ্রামের বীর সন্তান তিনি। অনেক বীরের জন্মদাতা কবি কিশোর সুকান্তর ‘বীর চট্টগ্রাম’-এর সন্তান তিনি। তাই বীর প্রসবিনী চট্টগ্রামকে নিয়েই তিনি স্বপ্ন দেখেন। আর সেই স্বপ্ন পূরণে নিজেকে সমর্পিত করেছেন। জীবনভর এই পথ ধরেই তিনি হেঁটে চলেছেন। কখনও দ্রুত পায়ে, কখনো শ্লথগতিতে। এই চলাতেই তাঁর আনন্দ। আর এই আমাদের ভেতর দিয়ে তিনি মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে বিরাজ করেন।

রাজপুত্র হয়ে জন্মাননি স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। কিন্তু তিনিই হয়ে গেলেন বীর চট্টলার রাজপুত্র। রাজনীতি যাঁর অস্থিমজ্জায়, সামাজিক দায়বদ্ধতা যাঁর মস্তিষ্কজুড়ে, তিনি তো সামান্য থেকে অসামান্য হয়ে উঠবেন কর্মকুশলতায়, হয়েছেনও তাই। চট্টগ্রামের প্রশ্নে অপরিসীম দরদ তাঁকে চট্টগ্রামেই আবদ্ধ রেখেছে। শত যোগ্যতা, গুণাবলী থাকা সত্ত্বেও তিনি জাতীয় নেতা হতে চান না। জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে নিজেকে না জড়ালেও জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব অপরিসীম। আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করতে পেরেছেন মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হয়ে।

মহান বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামী মাস্টারদা সূর্যসেনের জন্মস্থান রাউজানেই জননেতা আবুল বশর মোহাম্মদ মহিউদ্দিন চৌধুরী জন্মেছেন। সোনার চামচ মুখে জন্ম হয়নি তাঁর, বিত্তের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা জনও তিনি নন। বীরের দেশে তিনি নিজেও বীরের তকমা ধারণ করে আছেন। স্বপ্ন দেখেন তিনি তাঁর চট্টগ্রামকে নিয়ে। আর এই স্বপ্ন দেখা আঞ্চলিকতায় সীমাবদ্ধ মনে হলেও পরিধি তার পুরো দেশ। বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম। প্রধান বন্দর। এই বন্দর থেকে দেশের সর্বোচ্চ রাজস্ব আসে। সেই চট্টগ্রামকে ‘তস্য মফস্বল’ থেকে আধুনিক শহরে পরিণত করার কাজটি তিনিই শুরু করেছেন। স্বপ্নকে পরিণত করেন বাস্তবে। তাঁর বোধের ভেতর বীর চট্টলার বীরত্ব প্রক্রিয়াধীন সব সময়ই। চট্টগ্রামের উন্নয়নের স্বপ্ন তাঁর অপূর্ণই রয়ে গেছে। শুধু রাজনীতিবিদ নন, তিনি চট্টগ্রামের মেয়র হিসেবে ১৭ বছর দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে প্রশাসক হিসেবেও নিজের দক্ষতা, যোগ্যতা, সামর্থ্য প্রমাণ করেছেন।

এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে সাংবাদিক হিসেবে চার বছরের বেশি সময়। অনায়াসে যে কোন মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়ার গুণ মুগ্ধ করার মতো। পুরো চট্টগ্রামই তাঁর নখদর্পণে। ‘জুতো সেলাই থেকে চ-ী পাঠ’ প্রবাদটি তাঁর জন্য প্রযোজ্য। পোস্টার বা পুস্তিকা ডিজাইন, কাগজ ক্রয়, প্রেসে ছাপানো- সব একাই করতে পারার দক্ষতাও রয়েছে। নিজ হাতে পোস্টার লাগাতেন। তাঁর কর্মকুশলতার প্রতি অনুরক্ত মানুষের সংখ্যাও কম নয়। সংবাদপত্রে তাঁর সম্পর্কে প্রকাশিত নেতিবাচক প্রতিবেদন তাঁকে ক্ষুব্ধ বা বিচলিত করত না। বরং তিনি প্রতিবেদককে সহাস্য মুখে অভ্যর্থনা জানাতে কসুর করতেন না। ইতিবাচক-নেতিবাচক যেভাবেই দেখা হোক, তিনি সব সময় প্রচারের আলোতে থাকেন, কিংবা তিনি নিজেই সৃষ্টি করেন বিতর্ক। বিরোধীদের প্রচারণা তাই তাকেই ঘিরে থাকে। গুণীজনদের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তি তার অপরিসীম। তাই মেয়র থাকাকালে তিনি দেশের গুণীজন বরেণ্য সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, জনকণ্ঠ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা আতিকউল্লাহ খান মাসুদসহ আরও কয়েকজন গুণীকে লালদীঘি ময়দানে সংবর্ধিত করেন। গড়ে তোলেন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে থেকেছেন, অনুষ্ঠান আয়োজনও করেছেন। এক জীবনে এত বৈচিত্র্য, এত সৃষ্টিশীলতা খুব কম রাজনীতিকের মধ্যে মেলে, মহিউদ্দিন সবকিছুতেই ব্যতিক্রমী। রাজনীতিই তাঁর পেশা। পুরো জীবনটাই নিবেদিত রাজনীতি ও সমাজসেবায়। ব্যবসায়ী বা অন্য পেশাদারদের মতো রাজনীতি তাঁর কাছে অবকাশকালীন কোন বিষয় নয়। দুর্যোগে-সঙ্কটে, সবার আগে যে রাজনীতিক এগিয়ে যান তিনি মহিউদ্দিন চৌধুরী। অসুখ-বিসুখ সবকিছুকে তুচ্ছ করে তিনি সাহসের সঙ্গে সবকিছু মোকাবেলা করে এসেছেন। যা বিশ্বাস করেন, তাই বলেন। মুখে আর অন্তরে পৃথক কোন ভাবধারা নেই। স্ববিরোধিতা, পরশ্রীকাতরতা তাকে স্পর্শ করে না। তিনিই প্রথম টুঙ্গিপাড়ার জাতির জনকের কবর ইট দিয়ে পাকা করার কাজটি করেছিলেন। নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিক হিসেবে মহিউদ্দিন নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। পূর্বসূরি জহুর আহমদ চৌধুরীর জনপ্রিয়তাকে ছাড়িয়ে তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রামের নেতা হিসেবে মর্যাদা পেয়ে আসছেন।

সাংবাদিক মোয়াজ্জেমুল হক পেশাগত কারণে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে মিশেছেন। খুব কাছ থেকে দেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে। মহিউদ্দিনের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর বিশ্বাসে মিল না থাকলেও মোয়াজ্জেম মুগ্ধ এবং বিস্ময়কে বোধে ধারণ করে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে তুলে এনেছেন নির্মোহ ভঙ্গিতে। একজন জননেতার গুণাবলী লেখককে আলোড়িত করেছে। তাই মহিউদ্দিনের জীবনী লেখার কাজটি করতে পেরেছেন ঘনিষ্ঠতার মধ্যে বসবাস করার কারণেই। নানা বিশ্লেষণে তিনি ভূষিত করেছেন জননেতাকে, যা তাঁর প্রাপ্য। একজন রাজনীতিবিদের উত্থান, বিকাশ, কর্মজগত মূল্যায়ন করেছেন একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টি থেকে যেমনি, তেমনি সাংবাদিকসুলভ ভঙ্গি থেকেও। মহিউদ্দিনকে তিনি কোন মহাপুরুষে পরিণত করতে চাননি। বরং মহিউদ্দিন যা, তাকেই তিনি তুলে এনেছেন জীবনের নির্যাসকে সামনে রেখে। মোয়াজ্জেমের রচনায় মহিউদ্দিনকে পাই একজন জনমানুষের নেতা হিসেবে। দেশ, জাতি ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ একজন জননেতাকে, যে নেতার আদর্শ জাতির জনকের জীবন ও কর্ম। তাই বঙ্গবন্ধুর অনুসারী মহিউদ্দিন সবখানেই ছুটে যান। সব সময় মানুষের পাশে দাঁড়ান। আর এক্ষেত্রেও তিনি বঙ্গবন্ধুকেই অনুসরণ করেন। বঙ্গবন্ধুর চিন্তা, চেতনা, আদর্শকে ধারণ করেই তাঁর জীবনের পথ পরিক্রমা। সত্তরোর্ধ জীবনে মহিউদ্দিন চৌধুরী নানা কীর্তিতে ভাস্বর। মানুষের এত অভূতপূর্ব সমর্থন আর কোন নেতা অর্জন করতে পেরেছেন, তেমন নয়। মহিউদ্দিন তাঁর নেতার প্রতি, দেশের প্রতি, জাতির প্রতি নিজেকে বিশস্ত, আস্থাভাজন করে তুলতে পেরেছেন, এ তাঁর একান্ত নিজস্ব ক্যারিশমা। চট্টগ্রামের আবির প্রকাশন ৩৩৬ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি প্রকাশ করে একটি মহৎ কাজ সম্পন্ন করেছে। অবশ্য তা সম্ভব হয়েছে মোয়াজ্জেমুল হকের কাব্যিক বর্ণনাধর্মী রচনার গুণগত কারণেই। গ্রন্থে প্রচুর আলোকচিত্রও সন্নিবেশিত হয়েছে। মুদ্রণ প্রমাদ নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় মহিউদ্দিন চৌধুরী নিজেকে ঠাঁই দিতে পেরেছেন নিজের সৃজনশীল কর্ম-কীর্তির কারণেই। তাঁকে নিয়ে অর্থাৎ তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে ভাবীকাল যে গবেষণা করবে, তার আকর গ্রন্থ হিসেবে ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’র গুরুত্ব অত্যধিক। একজন পূর্ণ মহিউদ্দিন চৌধুরীকে এই গ্রন্থে পেয়ে মুগ্ধ হয়েছি। এর কার্যকারণও রয়েছে। খুব কাছ থেকে দেখা মহিউদ্দিন চৌধুরীকে গ্রন্থে পেয়ে মুগ্ধচিত্তে পাঠ করে বিমোহিত হয়েছি। মহিউদ্দিনকে যারা চেনেন না, জানেন না, গ্রন্থটি পড়ে তাদের কাছে তিনি একজন পরিপূর্ণ রাজনীতিবিদের উদাহরণ হয়ে দাঁড়াবেন। গ্রন্থটির মুখবন্ধে প্রখ্যাত সমাজ বিজ্ঞানী ও মহিউদ্দিন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য ড. অনুপম সেন উল্লেখ করেছেন, করুণাঘন মানবরূপেই চট্টগ্রামের শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত, সহায়হীন মানুষের বন্ধু করেছে মহিউদ্দিনকে। স্বপ্নের ফেরিওয়ালা মহিউদ্দিন চৌধুরী প্রতিভাত হবেন সামনে স্বপ্নের বাস্তবায়নওয়ালা হিসেবে- এমনটা অপ্রত্যাশিত নয়। মানুষের কাছে, মানুষের সঙ্গে থাকা মানুষের নেতা মহিউদ্দিন জীবনের বাকি পর্বে আরও আলোড়িত করবেন- তাঁর জীবন ও কর্ম তাই বলে।

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫

১৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: