রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভার্জিনিয়ায় বাঙালী বিয়ে

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫
  • জয়নব কুলসুম

জুন মাসের প্রথম দিকে ওয়াশিংটনের ডালাস এয়ারপোর্টে এসে নামলাম। ভাই রুমি, বোন শামিম, ভ্রাতৃজায়া পারভিন এবং সুমি একসঙ্গে সবাই হাস্যোজ্জ্বল মুখে অভ্যর্থনা করতে সামনে এসে দাঁড়াল। খুশির আর অন্ত নেই। এক ঢিলে দুই পাখি মারা! আমেরিকা বেড়ানো হলো, রুমীর ছেলের বিয়েতেও আসা হলো। যদিও এর আগে কয়েকবার এখানে এসেছি। আমি যেন পৃথিবীর মধ্যে আরও একটি পৃথিবী দেখতেই আসি। সেই বিশাল পৃথিবীর কতটুকুই বা দেখা সম্ভব! আমি সমুদ্রে শিশিরবিন্দু বৈ তো নই! বাঙালী ঘরানার রুমির ছেলের বিয়ে এবং তা আমিরাকাতেই! এও কি সম্ভব! বিয়ের নিমন্ত্রণে তাই ভার্জিনিয়া স্টেটের আর্লিংটনে গেলাম।

সুদর্শন ছেলে প্রান্তিক। শ্যাম স্নিগ্ধ ছায়ার সারাও কম লাবণ্যময়ী নয়। দুজনকেই মানিয়েছে ভাল। বরকর্তা রুমি সকলের মধ্যমণি। আমেরিকায় দেড়যুগ বসবাস করলেও, মনেপ্রাণে সে ষোলো আনা বাঙালী। বাঙালী সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের যত অনুষ্ঠান, তার আন্তরিক উদ্যোগ আর উৎসাহেই অনুষ্ঠিত হয় বেশিরভাগ সময়। বাংলা নববর্ষ, একুশে ফেব্রুয়ারী, পৌষের পিঠাপুলি,বাঙালীর বারোমাসের তেরো পার্বণ কোনটাই করতে বাদ থাকে না তার। ভার্জিনিয়ার বাঙালীরাও দেখছি বাংলা সংস্কৃতিপ্রিয় লোক। এখানেও রুমি সকলের প্রিয় ব্যক্তিত্ব। অভিবাসী জীবনের সমৃদ্ধি তারা বহিরঙে ধারণ করলেও, অন্তরঙ্গ এখনও তারা রাঙিয়ে তোলে বাঙালীর আনন্দ উৎসবের রঙে।

স্যুটেড-বুটেড বাঙালীরাই তখন পাজামা পাঞ্জাবি পরে, কেউ বা লুঙ্গি, গেঞ্জি, গামছা কাঁধে চড়িয়ে বনে যার ষোলোআনা বাঙালী। রুমীর ছেলের বেলায় একই ঘটনাই ঘটল। ছেলের বিয়ে বলে কথা। গায়ে হলুদে শানাই, ঢাকডোল সবই বাজা চাই। হলুদ দিতে চাই হলুদের মঞ্চ। সেটি তৈরি করতে ছন, বেত, বাঁশ আর কাঠের দরকার। এমন কি একজোড়া কলাগাছও। বাঙালী উৎসবপ্রিয় জাতি, কর্মযজ্ঞের জাতি আমিকানরাও কম সৌখিন নয়। ফুলের টব সাজাতে, বাগ-বাগিচার বেড়া বাঁধতে প্রয়োজনে ঘরের ছাদ থেকে বেজমেন্টে শখের কারুকার্য করতে জিনিসের অভাব নেই এখানে। সকলের সেই সখ মেটাতে হোমডিপো নামক বিশাল ডিপার্টমেন্ট হলো তার একমাত্র যোগানদার। প্রান্তিকের হলুদ নেয়ার সুন্দর কুঁেড়ঘর তৈরি হলো হোমডিপো থেকে কেনা সামগ্রী দিয়ে। রুমির তত্ত্বাবধানেই দুজন শক্ত সমর্থ স্পেনিস কার্পেন্টার এসে ইলেট্রিক করাত আর হাতুড়ি-বাটালের সাহায্যে ছন, বাঁশ আর কাঠ দিয়ে তা বানিয়ে দিয়ে গেল। কে বলবে গ্রামবাংলার এটি চিরন্তন সুন্দর একটি দৃশ্য নয়।

ব্যাকইয়ার্ডে যখন হলুদের মঞ্চ তৈরি হচ্ছে, পারভিনের তত্ত্বাবধানে তখন কিচেন লাগোয়া ডেকে বারবিকিউতে মাছ ভাজার তুমুল ব্যস্ততা। হলুদের সকালে টেবিল ভরে গেল লুচি, মাছ ভাজি, পায়েস ইত্যাদি বাঙালীর রসনাতৃপ্ত খাবারের সম্ভারে। আর্লিংটনের বাড়িতে সে মুহূর্তে কানাডা থেকে মিনু, দেড়ঘণ্টা দূরত্বের ডামফ্রিসের বাসা থেকে ছোট বোন শামিম এবং বোস্টন থেকে এসেছে সেজো ভাইয়ের মেয়ে লিপি। মিশিগান থেকেও এক ভাগ্নে রূপক ও তার বৌ রুশীর উপস্থিতিতে বাড়ি-ঘর সে সময় সরগরম। মাছ ভাজার ম ম গন্ধে, আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবের কোলাহলে যেন বাংলাদেশের খাঁটি একটি বিয়েবাড়ি।

লি হাইওয়ের বাঙালী মুদী দোকান থেকে বিশ, ত্রিশ পাউন্ডের দুটি মাছ আনা হলো। একটি বরমাছ, আরেকটি কনেমাছ। সাজানো হলো বরমাছকে লুঙ্গি গামছা দিয়ে, কনেমাছকে ডুরা কাটা রঙিন শাড়ি ও কানে দুল দিয়ে। একটা চলে গেল কনের বাসা সিটি স্টারলিং-এ, আর বড় একটি ইউ হাউলের ভ্যানে করে আমেরিকান লিজিয়ন কমিউনিটি সেন্টারে।

হলুদের সন্ধ্যায় গানবাজনা ও নৃত্যানুষ্ঠানের কিছু বর্ণনা এসেই যায়। নাচলো হলুদ গাঁদাফুলের রঙের শাড়ি আর রং-বেরং চুড়ি, দুল পরে ছোট ছোট সোনামণিরা। অন্যদিকে হলুদ রঙের একপ্যাঁচে শাড়িতে সেজেছে মেয়েরা। পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ছেলেরাও সাজগোজ করে ফিটফাট। যেন এক একজন খাঁটি বাঙালী একেবারে। নাচ হলো। অপূর্ব সে নাচ। সেইসঙ্গে জুটি মিলিয়ে নাচলো চাঁদনি, বৃষ্টি এবং আরও অনেকে। ছেলেদের মধ্যে রুমির ছেলে অনিক, বন্ধু আখতারের ছেলে আকিবের নাচও ছিল চমৎকার। বাঙালীর আনন্দ উৎসবের সব অনুষ্ঠানেই সেখানে দেশীয় রুচিকর খাবারের আয়োজনের পাশাপাশি বাঙালী ঐতিহ্যের সাজপোশাকে ছেলেমেয়েদের নাচগানের ব্যবস্থা হতেও বেশ দেখেছি।

হলুদের পর বর বিয়ে করতে যাবে কনের বাড়ি। নাহ! বাড়ি কেন হবে। হোটেল। তাও ফাইভ স্টার হোটেল। সারা-প্রান্তিকের বিয়ে অনুষ্ঠান চেরি ব্লুসম বুকেইয়ের বিলাসবহুল মনোরম পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর সেখানে আচকান পরে, পায়ে নাগরা আর মাথায় পাগড়ি চড়িয়ে বিয়ে করতে যাবে , নাকি নামী-দামী ব্র্যান্ডের গাড়ি হাঁকিয়ে! না, তাও না। কলাগাছ, কুঁড়েঘর যখন হয়েছে. এবার একটি চৌকস ঘোড়ার গাড়ি চাইই চাই। তাই বিয়ে বাড়িতে যেতে বরের একটি ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করা হলো। কিন্তু আমেরিকার হাইওয়ের হাজার হাজার গাড়ি চলাচলের মধ্যে তা তো চালানো সম্ভব নয়। সেফটি সিক্যুরিটির গুরুতর ব্যাপারস্যাপার আছে। অনেক ভাবনা-চিন্তা করে সেটিরও একটি অন্যরকম ব্যবস্থা করা হলো। চৌকস একটি ঘোড়ার গাড়ি এল ফ্রেডরিকসবার্গ থেকে। বড় একটি ইউ হাউলয়ের মতো দশাসই কভার্ড বাহনে চড়ে। গামবুট আর রাজকীয় ইউনিফর্ম পরা, সঙ্গে দুজন শ্বেতাঙ্গ চালক-চালিকা। হাইওয়ে ছেড়ে সামনেই আভিজাত্যর উর্দি চাপিয়ে চমৎকার বিয়ে বাড়ির হোটেলটি। প্রাকৃতিক পরিবেশে সবুজ বৃক্ষের সমারোহ চারদিকে। নিচেও বইছে ফুলের বন্যা। উদ্যান জুড়ে প্রশস্ত সব ওয়াকওয়ে। তারই ওপর দিয়ে হয়ে গেল কয়েক রাউন্ড বরযাত্রীর মিছিল। অভিবাসী এক সৌখিন শিখ যুবক কড়াতালে ঢোলক বাজালো, সঙ্গে ছিল শানাইও। মনে আছে বিয়ের এমন দৃশ্য দেখতে আশপাশে অনেক শ্বেতাঙ্গ দর্শকও সেদিন দাঁড়িয়ে গিয়েছিল কৌতূহল ভরে। প্রবাস জীবনের ভূখ-ে সেটি একটি খ- চিত্র হলেও ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে এই বরযাত্রীর মিছিল ছিল যেন সেদিন এক অসাধ্য সাধন।

সে সময় একটি তথ্য পাওয়া গেল। নিউইয়র্ক সিটিতে যে ঘোড়াগুলো কাজ করে অর্থাৎ ভাড়ায় খাটে, আটঘণ্টা কাজ করতে পারে এরা। তার বেশি নয়। ৯০ ডিগ্রী তাপমাত্রায় তাদের দিয়ে কাজ করানো যাবে না। বছরে এরা পাঁচ সপ্তাহ পূর্ণ ছুটিতে থাকবে। এখানে আর্লিংটনে কোন ঘোড়ার গাড়ি নেই। তবে ম্যানহাটনে ১৮২টি ঘোড়ার গাড়ি আছে। শুনেছি আমেরিকার ঘোড়ার গাড়িগুলোর বাৎসরিক আয় নাকি ১৯ মিলিয়ন ডলার। সেখানে রুমির দিতে হলো আধঘণ্টার বরযাত্রীর মিছিলে মাত্র এক হাজার ডলার যা বাংলাদেশী টাকার সত্তর-আশি হাজার টাকা। আমি একটি ঢোক গিললাম মাত্র!

বিয়ের শেষ অনুষ্ঠানটির কথা বলে এবারে আমার আমেরিকা আসার কাহিনী শেষ করি। শেষ অনুষ্ঠানটি হয়েছিল ওয়াশিংটনের উপকণ্ঠে হলিডে ইনের রোজালিন বলরুমে। এটি আমেরিকান আভিজাত্যর এক অনন্য প্রতীক। অভ্যন্তরে তখন বাঙালী পরিবেশের ভিন্ন দ্যুতিতে উদ্ভাসিত আরেক চিত্র।

নবপরিণীতা বরবধূকে ঘিরে অতিথি অভ্যাগতদের ভিড়। বাঙালীর রসনাতৃপ্ত খাবারের আয়োজন হয়েছে প্রচুর। শিশিরের গিটার, সমির কিবোর্ডের সুরের ঝঙ্কারে বাঙালীর প্রিয় গানগুলো বাজান হচ্ছে। ঢোলকের তালে তালে ছেলেমেয়েদের এখানেও নৃত্যগীত তৎপর। যেন পেছনে ফেলে আসা মাতৃভূমির ভেতর থেকে জেগে উঠছে উৎসবমুখর এক বাংলাদেশ!

প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৫

১৩/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: