মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

দৃঢ় হোক পারিবারিক বন্ধন

প্রকাশিত : ৯ মার্চ ২০১৫

উগ্র ভোগবাদী জীবনচেতনা মানুষকে ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে। আধুনিকতার নামে ব্যস্ততার মোড়কে নিজেকে আবৃত মানুষ আজ আত্মসাধনায় মগ্ন। দেশ কিংবা সমাজে কি হচ্ছে তা ভাববার সময় কই। দিনে একবার পত্রিকার পাতায় চোখ বুলিয়েই দেশের খবর রাখা দায়সারা হলো। তাই কোন খবরই এখন আর ঠিক খবর হয়ে ওঠে না। ছেলের হাতে পিতা খুন, যৌতুকের জন্য গৃহবধূ হত্যা, সহপাঠী দ্বারা যৌন নির্যাতন, ছাত্রের হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিত, ইয়াবায় বুঁদ শিশু-কিশোর-তরুণÑ এ রকম নানা অরাধের খবরও আমাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। দিনের পর দিন এসব খবরে যেন অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে সকলে। এসব ঘটনা শুধু খবর নয়, বরং সামাজিক অবক্ষয়ের বার্তা এমনটা ভাবেন না কেউ। অভিভাবকরা শিশুকে দামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পাঠিয়ে ভাবে এবার মানুষ হবে। কিন্তু নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবার যে প্রধান ভূমিকা রাখে সেটা হয়ত অনেক অভিভাবক খেয়াল করেন না। শুধুমাত্র নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষার অভাবই শিশুকে বিপথগামী করে তুলতে পারে। আর তার সঙ্গে বিপথগামী হতে পারে সমাজ।

মানুষ সামাজিক জীব এ কথা নতুন করে জানানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু মানুষকে নিয়ে যে সমাজ তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত পরিবার। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না-ব্যক্তিচরিত্র সুগঠিত হলেই সমাজ শৃঙ্খলা বজায় থাকে। কেননা সমাজ জীবনে ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন পড়তে বাধ্য। পরিবার হচ্ছে মানব সভ্যতার সূতিকাগার। শিশুর প্রথম পাঠশালা প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র। জন্মের পর একটি শিশু তার জীবনের প্রথম আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক যে কোন শিক্ষার পাঠ পরিবার থেকেই গ্রহণ করে। পারিবারিক পরিম-ল থেকেই শিশু চরিত্র গঠন ও বুদ্ধিবৃত্তিরও পাঠ নেয়। ভাষা শিক্ষা থেকে শুরু করে আচার-আচরণ, শিষ্টাচার শিশু তার নিকটজনের কাছ থেকে শিখে। শিশুর চরিত্র গঠনে পরিবারের প্রভাব সবচেয়ে বেশি একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

শিশুরা পরিবারে বড়দের আচরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়। তাই পিতামাতা যদি সদাচারী, সত্যভাষী ও সহনশীল হন তাহলে পরিবারের শিশুরাও সেগুলো অনুসরণ করে। মৌখিক উপদেশ আর জ্ঞানগর্ব ভাষণে নয়, শিষ্টাচারের শিক্ষা শিশু পরিবারের বড়দের আচরণ থেকেই শিখে। শুধু তাই নয়, নৈতিক মূল্যবোধ, ন্যায়-অন্যায় বোধটাও গুরুজনের কাছ থেকেই শিশু শিখবে।

সমকালীন সমাজ প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বলা যায় পরিবার ও পারিবারিক সম্পর্ক অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে পতিত হচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন যৌথ পরিবারে শিশুরা দাদা-দাদি, চাচা-চাচি ও চাচাত ভাই-বোনদের মাঝে বড় হতো। পারিবারিক বন্ধন ও দায়বদ্ধতা থেকেই সামাজিক বন্ধন ও দায়বদ্ধতার শিক্ষা পেত। বর্তমানে খুব কম দেশেই যৌথ পরিবার ব্যবস্থা টিকে আছে। আমাদের দেশেও যৌথ পরিবার ইতিহাস হতে চলেছে। অথচ যৌথ পরিবারে শিশুরা পরিমিত শিষ্টাচার, সহানুভূতি ও সহমর্মিতার ভাল শিক্ষা পেত। ক্ষুদ্র একক পরিবারে মতো শিশুরা আজ ক্ষুদ্র জগতের বাসিন্দা হয়ে বেড়ে উঠছে। তার শিক্ষা আর বিনোদনের জায়গায় শিক্ষকের ভূমিকায় এখন কম্পিউটার আর ইন্টারনেট। মুক্ত সংস্কৃতির যুগে অপসংস্কৃতির কবলে ধ্বংস হচ্ছে শিশুর মানবিকতা আর নৈতিকতা। পরিবারের একটু অবহেলায় তার মন থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে সহানুভূতি আর সহমর্মিতা। আত্মকেন্দ্রিক এই বেড়ে ওঠাই শিশুকে করছে অপরাধমুখী। যার মাসুল দিতে হচ্ছে সমাজকে। শিশুদের সার্বিক ও মানসিক চিন্তা চেতনার বিকাশে পরিবারকে সুযোগ করে দিতে হবে। মা-বাবা, ভাইবোনসহ তার নিকটজনকেই সে ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তৃতীয় প্রজন্মের ভাষায় প্রত্যেক বাবা-মাকেই তার সন্তানকে কোয়ালিটি টাইম দিতে হবে। সন্তান যাতে নিজেকে একাকী মনে না করে। ক্ষুদ্র একক পরিবারে মা-বাবার ব্যস্ততা সন্তান আত্মকেন্দ্রিক করে তোলে। এমনটা যেন না হয় সেদিকে পিতামাতার খেয়াল রাখা বেশি জরুরী। সৃজনশীল কাজে সন্তানকে আগ্রহী করতে হবে। এগুলো শিশুকে অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখে। বাবা-মা একসঙ্গে সময় না দিতে পারলেও যে কোন একজন সন্তানকে আলাদা করে সময় দিতে হবে। তাতে তার একাকীত্ব ঘুচবে। সবচেয়ে বড় কথা সন্তানকে তার নিজের চিন্তাভাবনা শেয়ার করার সুযোগ দিতে হবে। তার অবসর বিনোদনের জন্য সৃজনশীল বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। যাতে করে সে এসব থেকে আনন্দের পাশাপশি শিক্ষাও গ্রহণ করতে পারে। সন্তানকে নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষাদানে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। পরিবারের সকলকে তাই নিজ পরিবারকে আদর্শ শিক্ষাকেন্দ্র করে গড়ে তুলতে মনোযোগী হতে হবে। এতে শুধু পারিবারিক বন্ধনই দৃঢ় হবে না দৃঢ় হবে সামাজিক বন্ধনও। আর শক্তিশালী সামাজিক বন্ধনই অন্যায় অপরাধ আর অত্যাচার প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তাই আসুন দৃঢ় করি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন।

তাহমিনা মিলি

প্রকাশিত : ৯ মার্চ ২০১৫

০৯/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: