কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

একজন দীনেশ স্যার মানুষ গড়ার কারিগর

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল, মুন্সীগঞ্জ থেকে ॥ দীনেশ চন্দ্র দত্ত। একজন আদর্শবান শিক্ষকের নাম। দীর্ঘ ৩৮ বছর ধরে যিনি মানুষ তৈরির কাজ করছেন অতি নীরবে। তাঁর নেশা শিক্ষার্থীদের যোগ্য করে গড়ে তোলা। শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়। ভাল মানুষ হওয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন তাই করছেন তিনি। সুশৃঙ্খলা, পরিবেশের প্রতি সচেতনা, দেশপ্রেম, ক্রীড়া ও দেশজ সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট এবং শিক্ষার্থীদের লাইব্রেরি ওয়ার্কের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টার কমতি নেই। তাই তাঁর দীক্ষাপ্রাপ্তরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন। আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। এসব কারণেই এই অঞ্চলের সকলের কাছে ‘দীনেশ স্যার’ সুপরিচিত। তিনি এখনও স্কুল শিক্ষক। কিন্তু তাঁর ছাত্রÑ আজ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কেউ বা আবার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও সাংবাদিকসহ নানা পেশায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। রাষ্ট্রের নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছেন তাঁর অসংখ্য ছাত্র। তিনি মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার সোনারং উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দীনেশ চন্দ্র দত্ত। ১৯৭৬ সাল থেকে আলোকিত মানুষ তৈরির ব্রত নিয়ে মহান এই পেশায় যোগ দেন ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টিতে। সোনারং উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই অবসর নিতে চাচ্ছেন। আগামী ৬ এপ্রিল তাঁর ৬০ বছর পূর্ণ হবে। বাকি একটি বছরও এই প্রিয় বিদ্যালয়টিতেই নিজেকে আত্মনিয়োগ করতে তাঁর প্রচেষ্টা এখন অনেক। অবসরের পর গ্রামে-গঞ্জে বই পড়ার অভ্যাস তৈরির জন্য তিনি কাজ করবেন। চেষ্টা করবেন প্রতি মহল্লায় লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জাগ্রত করতে।

১৯৫৬ সালের ৭ এপ্রিল টঙ্গীবাড়ি উপজেলার ঐতিহাসিক নাটেশ্বর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাবা মৃত বৃন্দাবন চন্দ্র দত্ত। মাতা মৃত শৈলবালা দত্ত। ছোটবেলা থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল মানুষের কল্যাণে নিজেকে আত্মনিয়োগ করা। তিনি মনে করেন সুশিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার চেয়ে কল্যাণকর কিছু হতে পারে না। আলো দিয়ে অন্ধকার দূর করার চেষ্টায় তাই তিনি নানা প্রতিকূলতায়ও কাজ করে যাচ্ছেন।

তাঁর স্ত্রী গীতা রানী দত্ত শিক্ষকতা করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে দীনেশ চন্দ্র দত্ত তিন সন্তানের জনক। বড় কন্যা মাম্পি দত্ত ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে ইংরেজী সাহিত্যে অনার্স মাস্টার্স করে এখন বাবার মতো শিক্ষকতা পেশায় যোগ দিয়েছেন। ছোট কন্যা প্রিয়াঙ্কা দত্ত একই কলেজে হিসাববিজ্ঞানে মাস্টার্স শ্রেণীতে অধ্যায়নরত। একমাত্র ছেলে হৃদয় দত্ত সোনারং উচ্চ বিদ্যালয়ে ১০ম শ্রেণীর ছাত্র।

প্রবীণ এই শিক্ষক মনে করেন শুধু পুঁথিগত বিদ্যায় শিক্ষিত হলে সেটাকে সুশিক্ষা বলা চলে না। প্রকৃত মানুষ হওয়ার জন্য তৈরি করা গেলেই সে সমাজের জন্য অবদান রাখতে পারবে। সমাজে আলোকিত মানুষের এখন অভাব। শিক্ষালয়গুলো যথাযথভাবে অবদান রাখতে পারলে এই অভাব দূর করা সহজ কাজ।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, যখন তিনি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন, তখন খুব অল্পসংখ্যক ছেলে-মেয়ে হাই স্কুলে পড়াশোনা করত।

আজ অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মানুষ শিক্ষামুখী হয়েছে। এখন অন্তত অর্থ সঙ্কটে পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার ঘটনা বিরল। এটা মহান মুক্তিযুদ্ধ তথা দেশের স্বাধীনতার একটি বড় অর্জন। দীনেশ চন্দ্র দত্ত বলেন, জীবনের মূল লক্ষ্য আদর্শবান ছাত্রছাত্রী গড়ে তোলার চেষ্টা তিনি আমৃত্যু চালিয়ে যাবেন। এ পর্যন্ত অসংখ্য দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষার প্রকৃত আলো ছড়িয়ে দিতে পেরে তৃপ্তি পচ্ছেন তিনি। এ কাজে যে ভাল লাগা তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।

তিনি তাঁর এই অর্জনের জন্য প্রয়াত শিক্ষক মৃত অমরেশ চন্দ্র দের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। বলেন, তাঁর অনুপ্রেরণা আমাকে এই স্থানে নিয়ে এসেছে।

চারদিকে আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রী। তাদের ভালবাসা আমাকে মুগ্ধ করে। আর আমার ছাত্রছাত্রীর সফলতা আমাকে আনন্দে উদ্বেলিত করে। এখন আমার জন্মভিটার লাগোয়া নাটেশ্বর দেউলে মাটিচাপা থাকা হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতা আবিষ্কারের পর যেন বিক্রমপুরের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তেমনি বিক্রমপুর তথা মুন্সীগঞ্জের ইতিহাসকে আরও সমুজ্জ্বল করতে প্রয়োজন এই অঞ্চলের শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন। প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন।

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০১৫

০৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: