আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

স্বাধীন কুর্দীস্তান কত দূর?

প্রকাশিত : ৪ মার্চ ২০১৫
  • এনামুল হক

কুর্দীস্তান কি স্বাধীন হতে চলেছে? হলে কবে হবে? প্রথম প্রশ্নের জবাবে ইরাকের ৬০ লাখ কুর্দীর বলতে গেলে সবাই জোরের সঙ্গে বলবে ‘হ্যাঁ’। তবে দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব কেউ জোর দিয়ে বলতে পারবে না। তেমনি বলতে পারবে না এই নতুন রষ্ট্রের সীমানা কেমন হবে। অবশ্য কুর্দীদের কিংবদন্তি নেতা মুস্তফা বারজানির পৌত্র সিরওয়ান বারজানি ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আমরা দু’বছরের মধ্যে স্বাধীন হব।’ আর তাঁর বাবা কুর্দী অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট মাসুদ বারজানি বলেছেন, কুর্দীরা স্বাধীনতার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে ক্ষমতাবান পুত্র নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সার্ভিসের প্রধান মাসরুর বারজানিও স্বাধীনতার পথে যাত্রা ত্বরান্বিত করতে আগ্রহী।

স্বাধীনতা লাভের বেশকিছু অনুকূল বৈশিষ্ট্য কুর্দীদের আছে। তারা সুনির্দিষ্ট জাতিসত্তা ও অভিন্ন ভাষার অধিকারী। তারা উদারপন্থী সুন্নী মুসলমান এবং তদের মধ্যে কোন ধর্মীয় সংঘাত নেই। তারা মনে করে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাদের ভূখ- ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এরা হলো তুরস্ক, ইরান, সিরিয়া (যে সময় ফ্রান্সের অধীন) এবং মেসোপটেমিয়া (সে সময় ব্রিটেন পরিচালিত, যা পরে হয় ইরাক)। এই ভাগবাটোয়ার প্রায় একশ’ বছর হয়ে গেছে। এখন সময় এসেছে স্বাধীন হওয়ার।

আরব বিশ্বের এই অঞ্চলটিতে ভাঙ্গাগড়ার প্রক্রিয়া চলছে, যার শুরু হয়েছে ইরাক যুদ্ধের সময় থেকে। ইরাক এখন এক ব্যর্থ রাষ্ট্র। এই অবস্থাটা কুর্দীদের স্বাধীনতা অর্জনের অনুকূলে। অন্যদিকে ইসলামিক স্টেট (আইএস)এর উত্থান এবং আরব রাষ্ট্রগুলোকে ভেঙ্গে খিলাফত প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ পরোক্ষভাবে কুর্দীদের স্বাধীনতার পথ সুগম করছে। তথাপি স্বাধীন কুর্দীস্তান খুব তাড়তাড়িই হবে বলে মনে করার কারণ নেই। কুর্দীস্তানের বাস্তববাদী প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট বারজানির ভ্রাতুষ্পুত্র নেচিরভান বারজানি মনে করেন যে, কুর্দীরা কূটনৈতিক চাতুর্যের পরিচয় দিতে পারলে পাঁচ কি ছয় বছরের মধ্যে স্বাধীনতা অর্জন করা যেতে পারে। তবে সেটা প্রতিবেশী দেশগুলোর, বিশেষত তুরস্কের সহযোগিতা এবং ইরাক সরকারের সম্মতিতেই শুধু হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। স্বাধীনতার কৌশল ও সময় নিয়ে অন্যান্য নেতৃস্থানীয় কুর্দীদের ভিন্নমত আছে। তবে তারা সবাই মনে করেন যে কুর্দীস্তানের স্বাধীন হওয়া উচিত এবং সেটা সম্ভব।

কুর্দীদের আশু অগ্রাধিকার হলো আইএসকে ঠেকানো। গত বছরের ৯-১০ জুন এদের হাতে ইরাকের মসুলনগরীর রাতারাতি পতন হলে কুর্দীস্তানজুড়ে বয়ে যায় আতঙ্কের শিহরণ । দক্ষিণ দিকে বাগদাদ অভিমুখে অগ্রসরমান জিহাদীরা অচিরেই কুর্দী সীমান্তের কাছে উপনীত হয়। পেশমার্গা নামে পরিচিত কুর্দী বাহিনীর প্রতিরোধ মোটেও তেমন কার্যকর ছিল না। মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন বাহিনীর ব্যাপক বোমাবর্ষণই আইএসকে সে সময় ঠেকিয়ে রেখেছিল। পরে অবশ্য কুর্দী বাহিনী শক্তি সংহত করে বেশকিছু শহর ও এলাকা পুনর্দখল করে নেয়। যেমন জুমার শহর, সীমান্তের রাবিয়া শহর, সিনজার শহর। পুনর্দখলকৃত জালাওয়া ও সাদিয়ার চারপাশে তারা শক্তি সংহত করেছে এবং গত গ্রীষ্মে ইরাকী বাহিনী পালিয়ে যাওয়ায় তাদের দখলে নেয়া কিরকুক শহর এবং তিকরিত প্রদেশের উত্তরের অধিকাংশে নিজেদের বজ্রমুষ্টি আরও কঠিন করেছে।

কুর্দীদের এখন স্ট্র্যাটেজি হলো, মসুল পুনর্দখলের চেষ্টায় ইরাকী বাহিনীকে সাহায্য করা। কিন্তু লড়াই শুরুর আগে বাগদাদ যে অবস্থানে ছিল, সে অবস্থান পুনর্প্রতিষ্ঠা করতে দেয়া নয়। তারা সিরিয়ার কুর্দীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায়। তুরস্কভিত্তিক কুর্দীস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির সঙ্গেও তাদের সমঝোতা হয়েছে। ফলে এই তিনটি দেশের কুর্দীদের একত্রে কাজ করার অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের এখন সবচেয়ে প্রয়োজন সামরিক সাহায্য। পাশ্চাত্যের বিমান ছত্রছায়া ছাড়াও, তাদের প্রয়োজন প্রশিক্ষণ ও সামরিক সরঞ্জাম বিশেষ করে ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী অস্ত্র এবং আর্টিলারি। পাশ্চাত্য সেই সাহায্য দিতে চায়Ñ তবে তা বাগদাদের হাত দিয়ে। তারা কুর্দীদের আইএসের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে এবং শক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখতে চায়, কিন্তু স্বাধীন হতে দিতে চায় না।

তাহলে কি হবে কুর্দীস্তানের? কুর্দীস্তান কি স্বাধীন হবে? বাহ্যত এটা অনিবার্য বলেই মনে হয়। প্রেসিডেন্ট বারজানি ইতোমধ্যে একটি নির্বাচন কমিটি গঠন করেছেন, যার কাজ হবে স্বাধীনতা প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠানের প্রস্তুতিমূলক কাজ সেরে রাখা। কিন্তু ইরাক রাষ্ট্রটি যেখানে এখন ভঙ্গুর প্রায় এবং কুর্দী বাহিনী বিভিন্ন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, সেখানে তারা সরাসরি বিচ্ছিন্ন হবার ঘোষণা না দিয়ে গণভোটের পথে যেতে চাইছে কেন? কারণ কুর্দীরা তাদের প্রতিবেশী দুইগোষ্ঠী শিয়া ও সুন্নীদের চেয়ে অনেক বিচক্ষণ। তারা বিচ্ছিন্ন হবার প্রক্রিয়া দুটো কারণে দীর্ঘায়িত করছে। প্রথমত তারা জানে এই বিচ্ছিন্নতা অনিবার্য। দ্বিতীয়ত এই মুহূর্তে বিচ্ছিন্ন হলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সঙ্কট আরও তীব্র রূপ নেবে। এই অঞ্চলের দেশগুলোর অস্তিরতা আরও বাড়বে, যা তাদের স্বাধীনতা অর্জনের পথে পাল্টা আঘাত হানবে। কুর্দীস্তান একটা স্থলবেষ্টিত অঞ্চল। চারপাশের দেশগুলো বৈরী থাকলে স্বাধীন কুর্দীস্তানের টিকে থাকা সম্ভব নয়। সেজন্য কুর্দীরা ইরাক, ইরান, সিরিয়া ও তুরস্ক সবার সহযোগিতা চাইছে তাদের স্বাধীনতার জন্য। একমাত্র তেমন অবস্থাতেই স্বাধীন কুর্দীস্তান বাস্তবসাধ্য হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সূত্র : দি ইকনোমিস্ট

প্রকাশিত : ৪ মার্চ ২০১৫

০৪/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: