আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিপর্যস্ত গ্রামীণ অর্থনীতি

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • নিতাই চন্দ্র রায়

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে কয়টি খাতের অবদান সবচেয়ে বেশি তার মধ্যে কৃষি অন্যতম। এখনও দেশের শতকরা ৭০ ভাগ লোক গ্রামে বাস করেন, যাদের জীবনজীবিকা কৃষির ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল। আমাদের অন্ন, বস্ত্র ও শিল্পের কাঁচামাল যোগায় কৃষি। কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে কৃষি আমাদের প্রধান অবলম্বন। কিন্তু গত দেড় মাসের রাজনৈতিক অস্থিরতায় সংকটাপন্ন অবস্থা কৃষির। সেই সঙ্গে স্থবির হয়ে পড়েছে গ্রামীণ অর্থনীতির ঘূর্ণায়মান চাকা। নতুন বছরের শুরু থেকে লাগাতার অবরোধ-হরতালে পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক। হাটবাজারে ক্রেতা না থাকায় ধান, আলু, শীতকালীন সবজি, দুধ, ফুল প্রভৃতির ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লাভ তো দূরের কথা, উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না তাঁরা।

দর পতনের ফলে নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, যশোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, বগুড়া, জয়পুরহাট, ও জামালপুরসহ দেশের সবজি উৎপাদনকারী এলাকার কৃষকরা পড়েছেন মহাবিপদে। বগুড়ার মহাস্থান, মোকামতলা ও ফাঁসিতলার অনেক কৃষক ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো ও বেগুনের চাষ করে লাভ তো দূরের কথা, এখন পর্যন্ত আসল টাকা ঘরে তুলতে পারেননি। এভাবে সারা দেশের হাজার হাজার কৃষক অবরোধের আগুনে পুড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। ঋণের দায়ে জর্জরিত হয়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন। দিনাজপুরের অকড়াবাড়ি এলাকার একজন কৃষক ক্ষেভের সঙ্গে বলেন, আগে আড়তদাররা এসে পুরো ক্ষেতের সবজি কিনে নিতেন। আর এখন বাজারে গিয়েও পাইকারের সন্ধান পাওয়া যায় না। মৌসুমের মাঝামাঝি সময়েও উত্তরাঞ্চলের বাজারগুলোয় ফুলকপি ও বাঁধাকপি ৮-১০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। এখন দুই/তিন টাকা দরেও বিক্রি করা যাচ্ছে না সেই সুস্বাদু শীতের সবজি। কোন কোন স্থানে ক্রেতা না থাকায় হাটেই সবজি ফেলে চলে যাচ্ছেন অসহায় কৃষক।

জানুয়ারি-ফব্রুয়ারি মাস হলো উত্তরাঞ্চলে আলু তোলার ভরা মৌসুম। অবরোধের কারণে আলুর বাজারে ধস নেমেছে। এক মাস আগে যে আলু বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ১০-১২ টাকা, এখন সেই আলু বিক্রি হচ্ছে ৫-৬ টাকা কেজিতে। তারপরও পাওয়া যাচ্ছে না ক্রেতা। অনেকে লোকসানের ভয়ে ক্ষেত থেকে আলু তুলতে সাহস পাচ্ছেন না। সময় মতো আলু না তোলার কারণে বিলম্বিত হচ্ছে বোরো ধানের আবাদ। এতে কৃষকরে সঙ্গে কৃষি শ্রমিকরাও হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত । কমে গেছে কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি।

টানা অবরোধ ও হরতালের ক্ষতি থেকে কৃষকদের বাঁচানোর জন্য সরকার রেলযোগে খুলনা থেকে ঢাকা এবং ঢাকা থেকে খুলনা রুটে শাক-সবজি, কাঁচামাল ও কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য একটি পার্সেল ট্রেন চালু করেছে। বিলম্বে হলেও এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। ট্রেনটি নোয়াপাড়া, যশোর, বারোবাজার, আনছারবাড়িয়া, দর্শনাহল্ট, চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা, পোড়াদহ, ভেড়ামারা, পাকশী, ঈশ্বরদী, মুলাডুলি, চাটমোহর, বড়ালব্রিজ, উল্লাপাড়া ও তেজগাঁও স্টেশনে মালামাল পরিহনের জন্য যাত্রা বিরতি করবে। এতে পশ্চিমাঞ্চল ও আংশিক উত্তরাঞ্চলের কৃষক এবং সবজি চাষীরা উপকৃত হবেন। পাশাপাশি রাজধানীবাসীরাও ন্যায্য দামে পাবেন শাক-সবজি। দেশের অন্যান্য সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকেও শাক-সবজি, ফলমূল, কাঁচামাল ও কৃষিপণ্য পরিবহনের জন্য পার্সেল ট্রেন চালু করা উচিত।

পরিবহন সংকটের কারণে চাল কল মালিকরা উৎপাদিত চাল দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে না পারায় বন্ধ হয়ে গেছে দেশের ৮০ শতাংশ চাল কল। ফলে ১৭ হাজার চাল কলের প্রায় ৭০ লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। চাল কল বন্ধ থাকার কারণে গ্রামের হাট-বাজারে একবারে কমে গেছে ধানের দাম। অবরোধের আগে যে ধান বিক্রি হয়েছে ৭২০-৭৫০ টাকা মণ দরে, সেই ধান এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০০-৬৫০ টাকা। টানা অবরোধের কারণে চলনবিল এলাকার ৯টি উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ৯ কোটি টাকার দুধ হচ্ছে নষ্ট । সে হিসেবে গত ৩০ দিনের হরতাল-অবরোধে দুগ্ধ খামারিদের ক্ষতি হয়েছে ২৭০ কোটি টাকা। এই অঞ্চলে প্রায় লক্ষাধিক খামারে ৫ লাখ লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত দুধ মিল্ক ভিটা, প্রাণ, আড়ং, আফতাব ও রংপুর ডেইরিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করে। হরতাল-অবরোধের কারণে গাড়ি না আসায় খামার মালিকদের লোকসান দিয়ে দুধ বিক্রি করতে হচ্ছে।

অনির্দিষ্টকালের অবরোধে সবজি চাষীদের মতো ব্যাপক লোকসানে পড়েছেন ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত যশোরের গদখালীর ফুল চাষীরা। রাজনৈতিক অস্থিরতায় পরিবহন সংকটের কারণে গদখালী থেকে ফুল সরবরাহ করা যাচ্ছে না ঢাকা, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে। যশোর জেলায় সাড়ে ৪ হাজার কৃষক ফুল চাষ করেন। এখান থেকে দেশের মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ ফুল সরবরাহ করা হয়। টানা অবরোধের কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সামান্য ফুল পাঠানো গেলেও সারা দেশে ফুল পাঠানো যাচ্ছে না। এতে বিপাকে পড়েছেন ফুল চাষীরা। উৎপাদিত ফুল ক্ষেতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ দিন ছাড়াও গদখালীতে প্রতিদিন ১০-১২ লাখ টাকার ফুল বেচাকেনা হতো। অবরোধের কারণে তা ১ থেকে ১.৫ লাখে নেমে এসেছে। অবরোধের আগে যে গোলাপ ফুল বিক্রি হয়েছে প্রতিটি তিন টাকা এখন সেই গোলাপ ফুল বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০ পয়সা দামে। এছাড়া রজনীগন্ধা, গ্লাডিউলাস ও জারবেরা ফুল অবরোধের আগের দামের চেয়ে চার ভাগের একভাগ দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে ফুল চাষীরা গভীর হতাশায় ভুগছেন।

লাগাতার অবরোধ ও হরতালের ফাঁদে পড়ে পোল্ট্রিশিল্প চরম আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ কোটি ডিম ও এক হাজার ৭০০ টন মুরগির মাংস উৎপাদিত হয়। প্রতি সপ্তাহে এক দিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদিত হয় প্রায় এক কোটি ১০ লাখ। কিন্তু অবরোধ ও হরতালের কারণে এসব ডিম, মাংস ও মুরগির বাচ্চা সরবরাহ করা যাচ্ছে না। ফলে ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতিতে পড়ছেন এখাতে নিয়োজিত মালিক-শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। পোল্ট্রি খামারিদের মতো দেশের মৎস্য চাষীরাও তাঁদের উৎপাদিত মাছ ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরে পাঠাতে না পেরে স্থানীয় বাজারে পানির দামে বিক্রি করে চরম ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। হাওড় এলাকার নেত্রকোনা ও মোহনগঞ্জে ক্রেতার অভাবে আড়তগুলোয় জমছে মাছের পাহাড়। সেখানে ১০০ টাকা কেজির পুঁটি মাছ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩০ টাকায়। মাছের ন্যায্য দাম না পেয়ে চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন হাওড় এলকার হাজার হাজার জেলে ও তাদের পরিবার পরিজন।

ইতোমধ্যে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়ে গেছে। এভাবে যদি চলতে থাকে, বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে গ্রামীণ অর্থনীতি। কৃষি অর্থনীতিকে করুণ পরিণতি বরণ করে নিতে হবে। এবং এর বিরূপ প্রভাব পড়বে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে।

মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), সেতাবগঞ্জ সুগারমিলস লি. সেতাবগঞ্জ, দিনাজপুর

netairoy18@yahoo.com

প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২২/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: