মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ওবামার ভারত সফর বাণিজ্যে বসতি

প্রকাশিত : ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
ওবামার ভারত সফর  বাণিজ্যে বসতি
  • আরিফুর সবুজ

চায়ের কাপে ঝড় উঠছে। কথার খেলায় মেতেছে সবাই একজনকে ঘিরে। জপছে সবাই তাঁর কথা। অহোরাত্রি। সর্বক্ষণ। কে সেই মানুষ, যাকে নিয়ে পুরো ভারতজুড়ে এত কথা, এত উন্মাদনা, এত আলোচনা? কে সে? তিনি আর কেউ নয়, তিনি মার্কিন দ-মু-ের কর্তা প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা। ভারতে প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে তিন দিনের সফর করেছেন তিনি। আর তা নিয়েই এত হৈচৈ, এত আলোচনা। তাঁর সফর থেকে ভারত কী পেল, কী পাওয়ার কথা ছিল ইত্যাকার নানা বিষয় নিয়ে জমে উঠেছে আড্ডা, তর্ক। যদিও প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক রয়েছে, তবু দু’দেশের মাঝে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কটি বাণিজ্যিক তথা অর্থনৈতিক। এ কারণেই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে বাণিজ্যসংক্রান্ত প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিষয়টি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সব প্রটোকল ভেঙে বারাক ওবামাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সেই দৃশ্যটিই বলে দিচ্ছে আগামী দিনে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে। আরও ভালও যাবে। দেবযানি ঘোবড়াগাড়কে কেন্দ্র করে দু’দেশের মাঝে যে শীতল সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটাকে মোদি গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে উষ্ণ করে এসেছেন। এখন ওবামার ভারত সফরের মধ্যে দিয়ে সে সম্পর্ককে আরও বেশি ঝালাই করে নেয়া হয়েছে।

২০১৩ সালে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩.৭ বিলিয়ন ডলার বাণিজ্য হয়েছিল, যা এর আগের বছরের চেয়ে ১.৭% বেশি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ভারতে ৩ হাজার ৯১৪ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রফতানি করছে। আর ভারত যুক্তরাষ্ট্রে ২ হাজার ২৫০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করছে। এক হিসেবে দেখা যায়, আমদানি-রফতানি মিলিয়ে বর্তমানে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বছরে দশ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়। এই বাণিজ্যর পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার জন্য দু’দেশ কাজ করছে। গত সেপ্টেম্বরে নরেন্দ্র মোদির যুক্তরাষ্ট্রের সফরকালীন এই লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর অক্টোবরে ওয়াশিংটনে এবং নবেম্বরে নয়াদিল্লীতে দু’দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি এবং বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির বিষয় বৈঠকগুলোতে প্রাধান্য পেয়েছে। নরেন্দ্র মোদির সেই যুক্তরাষ্ট্র সফর ভারত-আমেরিকার বাণিজ্য ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। এখন ওবামার এই ভারত সফর ৫০ হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্যে লক্ষ্য পূরণে কয়েক ধাপ এগিয়ে যেতে সাহায্যে করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

নরেন্দ্র মোদি দেশের অর্থনীতিকে সুসংহত করতে বদ্ধপরিকর। গত বছরের মে মাসে ক্ষমতায় বসেই বাণিজ্য বৃদ্ধিতে তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। কর ব্যবস্থায় সংস্কার ও পরিবর্তন আনেন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দাবি বিবেচনায় নিয়ে। ভারতে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে সহজে ব্যবসা করতে পারে, সে জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতেও কাজ শুরু করেন। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ভারতে বানাও’ কর্মসূচির আওতায় অনেক বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে মোদি সরকার। এজন্য বিদেশী বিনিয়োগের প্রতি তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। বিশেষ করে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের প্রতি তিনি অধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। বারাক ওবামার এই সফর আমেরিকান বিনিয়োগকারীদের ভারতে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করবে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা। ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে আজমির, আহমেদাবাদ শহর আর বিশাখাপত্তম সমুদ্রবন্দর উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র বিনিয়োগ করবে। সেইসঙ্গে ভারতের ছোট ছোট পাঁচ শ‘ শহরে ‘সোলার এনার্জি’ চালু করবে যুক্তরাষ্ট্র।

এবারের সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিমঘরে চলে যাওয়া ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তিটির উদ্ধার। গত চার মাস ধরে এই চুক্তি নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলোচনা-পর্যালোচনার পর অবশেষে ওবামার ভারত সফরের মধ্যে দিয়ে এর জট খোলা হয়। মনমোহন সিং এই চুক্তি করে ব্যাপক প্রশংসিত হলেও, অভ্যন্তরীণ চাপে চুক্তিটি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি সব চাপ উপেক্ষা করে চুক্তিটিকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। এই চুক্তিটি পরিবর্তন,পরিমার্জন করা হয়েছে নরেন্দ্র মোদির মেক ইন ইন্ডিয়া নীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। চুক্তির ফলে মার্কিন বিনিয়োগে ভারতে বড় মাপের পারমাণবিক চুল্লি স্থাপিত হবে। ফলে জ্বালানি তেলের ওপর বিদেশী নির্ভরশীলতা কমে যাবে। সেই সঙ্গে শিল্পের প্রসার ঘটবে। বাড়বে কর্মসংস্থান।

ওবামার এই সফরে দু’দেশের মধ্যে যে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তাকে ভারতের জন্য আর্শীবাদ বলা যেতে পারে। এতদিন পর্যন্ত ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুধু অস্ত্রই কিনেছে। কিন্তু এখন থেকে দু’দেশ যৌথভাবে অস্ত্র উৎপাদন করবে। চুক্তি অনুযায়ী আগামী দশ বছর দু’দেশ একসঙ্গে অস্ত্র নিয়ে গবেষণা ও নির্মাণ করবে। আমেরিকা ভারতকে প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে সহযোগিতা করবে। নিজেরাই উৎপাদনে যাওয়ায় ভারতকে অস্ত্র আমদানির পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হবে না। বরং বিদেশে অস্ত্র রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হবে।

ওবামার সঙ্গে সফরে আমেরিকার ত্রিশটি বড় বড় কোম্পানির কর্ণধাররাও ভারতে এসেছেন। ওবামা ও মোদির উপস্থিতিতে ভারতীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে তারা দু’দফায় তথা ইন্দো- ইউএসএ সিও ফোরাম এবং ইন্দো-ইউএসএ বিজনেস সামিটে মিলিত হন। এই মিটিংগুলোতে আমেরিকার কোম্পানিগুলোকে ভারতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন করানোতে রাজি করানো হয়, যা মোদির মেক ইন ইন্ডিয়া নীতিকে ত্বরান্বিত করবে। ভারতের কর আইন, জমির ব্যবহার, প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো, মেধাস্বত্ব আইন, বিদ্যুৎ ইত্যাদি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। সেই উদ্যোগ দূর করতেই নেয়া হচ্ছে দ্বিপাক্ষিক বিনিয়োগ চুক্তি। আর ভারত চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক সুরক্ষা কর ও ভিসার জটিলতা থেকে রেহাই পেতে। এ বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে ওবামা ও মোদির মধ্যে।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব ইকোনমিক এ্যানালাইসিসের তথ্য মতে, যুক্তরাষ্ট্র ভারতে সরাসরি ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। আর ভারতের অফিসিয়াল পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০০০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ প্রবাহ ১৩.৯ বিলিয়ন ডলার, যা যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতে ষষ্ঠতম বিদেশী বিনিয়োগের উৎসে পরিণত করেছে। আবার ৬৫টির বেশি ভারতীয় কোম্পানি বিশেষ করে রিলায়েন্স ইন্ড্রাস্ট্রি, এসার আমেরিকা, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিস, উইপ্রো, পিরামাল ইত্যাদি কোম্পানি আমেরিকায় ১৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। দু’দেশের কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগে আরও উৎসাহিত করার জন্য এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

বিভিন্ন টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে চলে আসা গত এক দশকের মার্কিন-ভারত সম্পর্কে এক নতুন মাত্রা সৃষ্টি হয়েছে নরেন্দ্র মোদির যুক্তরাষ্ট্র সফর আর বারাক ওবামার ভারত সফরের মধ্যে দিয়ে। দু’দেশের মাঝে অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এই সফরের মধ্যে দিয়ে বৃদ্ধি পাবে বলে বিশ্লেষকরা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।

ওবামার ভারত সফর নিয়ে শুধু ভারতবাসীই হিসেব কষেছে, এমনটি নয়। আমরাও হিসেব কষতে বসেছি। এর কারণ বন্ধুপ্রতিম দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আমাদেরও প্রভাবিত করে। বেশ কিছু দিন যাবত আমাদের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ভাল যাচ্ছে না। ওবামা প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারেও সফর করেছেন। কিন্তু এদেশে তিনি সফর করেননি। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট কিংবা সেক্রেটারি অব স্টেটের বাংলাদেশ সফরও তাদের কার্যতালিকায় নেই। এটি দুঃখজনক। তবে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের যে উন্নয়ন ঘটছে, তাতে আশা করা যাচ্ছে আমাদের সঙ্গেও আমেরিকার সম্পর্কের হিম কেটে গিয়ে উষ্ণ হবে। জিএসপি সুবিধাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা ফিরে পাব আমরা। যদিও এর জন্য বেশ কাঠখর পোহাতে হবে, তবু আশা করতে তো দোষ নেই।

প্রকাশিত : ১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: