কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দ্বীপবাসী

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫
  • সাজ্জাদ কবীর

গল্প

মজুমদার সাহেবের এয়ারকুলার জিনিসটা খুব একটা পছন্দ না। তাঁর অফিসের ঠাণ্ডা যন্ত্রটা বেশিরভাগ সময় বন্ধই থাকে। এমডি সাহেবের ঘরে বেশিক্ষণ কাজ করতে হলে তাঁর আসলে অস্বস্তিই হয়। নিজের ঘরে ফিরে অবশ্য কিছুক্ষণ গরমটা একটু বেশি লাগে। একটু পরেই আবার সব ঠিক। গরমের তীব্রতা তাঁকে কখনোই ছোঁয় না। এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টরের ঘরে ঢুকে অনেকেই বেশ অবাক হয়। ‘আরে আপনার ঘরের এসি নষ্ট নাকি?’

তিনি একটু হেসে জবাব দেন, ‘নষ্ট না ঠিকই আছে। ফ্যান চলছে তো, সমস্যা কোথায়?’ কথাটা বলেই তিনি কাজের কথায় চলে যান। কারও কিছু বলার সুযোগ হয় না।

মজুমদার সাহেবের বাসা সেগুনবাগিচায়। বেশ পুরনো একটা বাড়ি। সেটার দোতলায় খোলামেলা একটা বাসা। তিন তলায় থাকেন এক ভদ্রলোক, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করেন। নিচের তলায় বাড়িওয়ালা। সামনে লন, ফুলের বাগান, গাছপালা। তারপর বাউন্ডারি দেয়াল দেয়া বেশ উঁচু করে। বাড়িওয়ালা মাঝে মাঝে বাগানে বসে তাঁদের সঙ্গে চা খেতে খেতে গল্প করতেন, ‘এইখানে বসে বাউন্ডারির ওপর দিয়ে দেখতাম সামনের রাস্তা। মাঝে মাঝে দুই একটা গাড়ি চলে যেত। এখন রাস্তায় এত ভিড় যে বাধ্য হয়ে বাউন্ডারির দেয়াল উঁচু করতে হয়েছে।’

তিন তলার ভদ্রলোক চায়ে চুমুক দিয়ে বলেন, ‘ঢাকা শহরটাই পাল্টে যাচ্ছে।’

বাড়িওয়ালা বলেন, ‘হ্যাঁ আগে আমাদের এখানকার মেয়েরা বিকেল হলে সামনের রাস্তায় হেঁটে হেঁটে গল্প করত। আর এখন তাদের আড়াল করার জন্য উঁচু দেয়ালের পাশে বড় বড় গাছ লাগাতে হয়েছে।’

বাড়িওয়ালা সরকারী চাকুরে ছিলেন। ছেলে দু’জন এখন বিদেশে। একমাত্র মেয়ে স্বামীর সঙ্গে থাকে চট্টগ্রাম। এই বাড়ি তিনি বানিয়েছিলেন চাকরি ছাড়ার কিছুদিন আগে। সেও তো আজ কত দিন হয়ে গেল। এখানেই বাকি জীবনটা সবাইকে নিয়ে কাটিয়ে দেয়ার কথা। কিন্তু কী হলো! সবাই তাকে ছেড়ে চলে গেল।

বাড়ির সীমানা বরাবর আগে থেকে নারকেল গাছ, আম গাছ ছিলই। এখন বাইরে থেকে বাড়িটাকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য মাঝখানে মাঝখানে ঝাউ জাতীয় গাছ লাগাতে হয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মজুমদার সাহেব বলেন, ‘চেনা শহরটা কেমন যেন অচেনা হয়ে যাচ্ছে।’

তবে এই আপাত শান্তির নিলয় ছেড়ে যেতে হলো মজুমদার সাহেবদের। একদিন অফিস থেকে ফিরে শুনলেন বাড়িওয়ালা নিচে ডেকেছেন চা খেতে। চা যখন প্রায় শেষ হয়েছে তখন তিনি যেন খুব মরিয়া হয়ে কিছু বলছেন তেমন করে কথা বলে ওঠেন, ‘আর বোধ হয় আপনাদের রাখা গেল না।’

সঙ্গে সঙ্গেই দু’জনে বুঝলেন বাসার কথাই হচ্ছে। বাড়িওয়ালা ঠিক করেছেন জায়গাটা ডেভেলপারকে দিয়ে দেবেন। যা ঝামেলা পোহানোর তারাই পোহাবে। সেই চুক্তি গতকাল চূড়ান্ত হয়ে গেছে।

মজুমদার সাহেব কিছুদিনের মধ্যেই একটা বাসা ভাড়া নিয়ে চলে গেলেন। প্রথম ক’দিন সবারই খুব মন খারাপ ছিল। বিশেষ করে মজুমদার সাহেবের মেয়ে দুটোর। তাদের জন্ম ঐ বাড়িতেই। তারা বলতে গেলে বড় হয়েছে বাড়িওয়ালা আর বাড়িওয়ালির কাছেই। মজুমদার সাহেবের স্ত্রী ব্যাংকে চাকরি করেন। আর সেই জন্য মেয়েদের দেখাশোনা করার বেশ সমস্যা ছিল। মেয়েদের টানটা আসলে সেই কারণে অনেক বেশি, অনেক গভীর। তাদের মন খারাপ কিছুতেই ঠিক হচ্ছিল না। তবে সময়ই বন্ধুর মতো সব দুঃখ শোষণ করে নেয় এক সময়। ব্যথার তীব্রতা কমে আসে সবার। তারপরও কোথায় একটা খচখচানি থেকেই যায়।

একদিন অফিস থেকে ফিরে শাহানা মানে মজুমদার সাহেবের স্ত্রীকে বেশ খুশি খুশি দেখায়। সাধারণত মজুমদার সাহেব আসার আগেই শাহানা ফিরে আসে। বড় মেয়ে আর ছোট মেয়ে বাসায় চলে এসেছে। মজুমদার সাহেব ছোট মেয়েকেই জিজ্ঞেস করেনÑ ‘বিষয় কি, আজ তোমার মাকে খুব খুশি খুশি লাগছে!’

রিমি মানে ছোট মেয়ে একটু অবাক হয়, ‘তাই! আমি তো খেয়াল করিনি।’

বড় মেয়ে এসে বলে, ‘একটা কী নাকি সুখবর আছে। তোমাকে আগে বলবে বলে আমাকে বলেনি।’

চায়ের টেবিলে তথ্যটা জানা হয়। মজুমদার সাহেবের স্ত্রী সবার দিকে নাস্তার প্লেট এগিয়ে দিতে দিতে বলেন, ‘আমি ব্যাংক থেকে বাড়ির জন্য লোন পাচ্ছি।’

‘আচ্ছা একটা কাজ করলে কেমন হয়?’

‘কী কাজ?’ মজুমদার সাহেব বুঝে যান নিশ্চয়ই বাড়ি সংক্রান্ত কিছু হবে। স্ত্রী চোখ বড় বড় করে বলতে থাকেন, ‘আমাদের পুরনো ভাড়া বাড়িটা তো ফ্ল্যাট হবে। ওখানে কিনলে কেমন হয়?’

ওখানে দাম একটু বেশি। তবে স্ত্রী আর দুই মেয়ের খুব শখ ওখানে কেনার। তিনিও কাগজ-পত্র ঠিক-ঠাক করতে শুরু করলেন। আর বাড়তি পয়সাটা এদিক সেদিক থেকে ম্যানেজ করে ফ্ল্যাটটা কিনেই ফেললেন।

পাঁচতলায় বাম দিকের ফ্ল্যাট। ডান দিকেরটা একটা ব্যবসায়ী কিনেছেন আর মাঝেরটা কিনেছেন এক উকিল। ফ্ল্যাট কেনার কারণে বেশ কয়েকদিন যেতে হয়েছে মজুমদার সাহেবকে। স্বভাবতই তিনি প্রতিবেশীদের একটু খোঁজ খবর করেছেন। ব্যবসায়ী এবং উকিল দু’জনেই তাঁর চেয়ে বয়েসে অনেক ছোট। তাছাড়া আলাপ চালাবার মতো মানসিকতা বোধ হয় নেই তাদের। ফলে মজুমদার সাহেবের সঙ্গে তেমন জমেনি। তিনি বিশেষ করে আশ্চর্য হয়েছেন উকিলকে দেখে। উকিলরা তো কথা বেচেই খায়, অথচ একে দেখে অবাক হতে হয়। কিভাবে আয় করে খায় কে জানে! ব্যবসায়ী ভদ্রলোককেও তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন কিসের ব্যবসা। উত্তরটা কেমন যেন গোঁজামিল ধরনের। যখন যেটা সুবিধা হয় সেই ব্যবসাই নাকি করে। মজুমদার সাহেবের মাথায় ঢোকেনি। শুধু এটুকু বুঝেছেন কর্মজীবনের এই সময়ের মধ্যেই ফ্ল্যাট কেনার মতো পয়সা তারা পেয়ে গেছে।

মজুমদার সাহেবরা আবার ফিরে আসায় বাড়িওয়ালা আর ওনার স্ত্রী দু’জনেই বেশ খুশি হয়। ইতোমধ্যে বাড়িওয়ালারা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই অনেক নরম হয়ে গেছে। একা একা থাকা বেশ ঝামেলার হয়ে যায়। অসুখ-বিসুখ তো এখন লেগেই থাকে। চট্টগ্রাম থেকে মেয়ে এসেছিল বাপের বাড়িতে। তাদের দুরবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত দিয়ে যায় চট্টগ্রাম নিয়ে যাওয়ার।

মজুমদার সাহেবদের আশা পূরণ হয়েও হলো না। তারপরও পুরনো জায়গা, আশপাশের অনেক কিছু চেনা। তাই কি! সে রকমই চেনা আছে কি! মজুমদার সাহেব অফিস থেকে ফেরার সময় মাঝে মাঝে তোপখানা থেকে গাড়ি ছেড়ে দেন। সেখান থেকে টুক-টাক কিছু কিনে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি ফেরেন। গলিতে ঢুকে নাক টেনে সেই আগের গন্ধটা নেয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু কিছুতেই পান না। পুরো গলিটাই অচেনা লাগে। এই দুই বছরে তাদেরটার মতো আরও কয়েকটা ফ্ল্যাট বাড়ি উঠেছে। সেগুলোর সামনে বিশাল গেট। সে সব গেটে উর্দি পরা দারোয়ান। ভিতরে ঢুকতে হলে এদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাই যেতে হয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের দেখা হওয়ার কত বাধা। কত জটিলতায় বাঁধানো সে পথ। অতি পরিচিতের হাসি মুখটা দেখতে কত রকমের চোখ রাঙানি পার হয়ে তাই যেতে হয়। অনেক সময় সেসব পার হয়ে আমরা যা দেখি তা কতখানি সত্য আর কতখানি মেকি হাসি তা কে বলতে পারে।

ঘরে ঢুকে মজুমদার সাহেব জানালা খুলে পরদা সরিয়ে দেন। তাদের ফ্ল্যাটের ডিজাইনটা ভালোই বলতে হবে। আলো-বাতাস মোটামুটি সব ঘরেই চলাচল করে। মেয়েরা যে যার ঘরে। শাহানা আসেনি। শুধু ইমু তাঁর বড় মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করে চা কি এখানেই দিয়ে যাবে কি না। তিনি ঘরেই চা দিতে বলেন। মেয়েরাও যেন পরিস্থিতির সঙ্গে কেমন বদলে যাচ্ছে। চা খেতে খেতে সন্ধ্যা নেমে যায়। তিনি একটা বই হাতে নিয়ে বসেন। ছোট মেয়ে এসে হঠাৎ পাশে বসে পড়ে। মজুমদার সাহেব বুঝতে পারেন কিছু একটা প্রয়োজন আছে। তা না হলে এমন করে তার পাশে বসার কারণ নেই। তিনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকান মেয়ের দিকে। মেয়ে বাবাকে বই থেকে মুখ তুলতে দেখে বলে, ‘বাবা আমাদের ঘরে এসি না লাগালে থাকা যাচ্ছে না।’

তিনি একটু চোখ কুঁচকে তাকান, ‘হঠাৎ?’

‘কেমন গরম পড়েছে দেখ।’

‘গরমকালে একটু তো গরম পড়বেই। সেটুকু সহ্য করতেই হয়।’

এর মধ্যে বড় মেয়ে এসে হাজির। বোঝা গেল পরামর্শ করেই এসেছে দু’জন। বড় মেয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে, ‘আগে তো আমরা এসব নিয়ে কোন কমপ্লেন করিনি বাবা।’

‘তাহলে?’

‘এখন আর আগের মতো খোলামেলা নেই। ঠিক মতো বাতাস চলে না।’

মজুমদার সাহেবের মনে পড়ে এই জায়গার পুরনো বাড়িটার কথা। বিদ্যুত চলে গেলে তাঁরা সবাই নিচে লনে এসে বসতেন। খোলা জায়গায় বসে শরীর মন জুড়িয়ে যেত। এখন একটার গা ঘেঁষে আরেকটা বাড়ি। বাতাস থমকে দাঁড়ায়। ছুটতে গিয়ে দেয়ালে দেয়ালে বাড়ি খেয়ে ফিরে যায়। ঢুকে পড়ার কোন জানালা খুঁজে পায় না। তারপরও তিনি গলায় জোর এনে মেয়েদের বোঝাতে যান, ‘কি বলো! আমার তো তেমন গরম লাগছে না। জানালা দিয়ে বেশ বাতাস ঢুকছে। পাখা চালিয়ে দিলে কোন সমস্যা থাকার কথা না।’

‘তোমার ঘরে বাতাস ঢোকে, কিন্তু আমাদের ঘরে ঢোকে না। আগে ঢুকতো, কিন্তু পিছনের বাড়ি দুটো হওয়ার পর আর ঢোকে না।’

তিনিও দেখেছেন পিছনের বাড়ি দুটো প্রায় কোন জায়গা না ছেড়েই বানিয়েছে।

এর পরও তিনি কিছুদিন ওভাবেই কাটিয়ে দেন। মেয়েরাও দেখা গেল ও নিয়ে আর তেমন কোন হইচই করছে না। বোধ হয় হুজুগ উঠেছিল, থেমে গেছে। কিন্তু একদিন শাহানা নিজেই টাকা বের করে দেয়। মজুমদার সাহেব একটু অবাক হয়। স্ত্রী জানায় মেয়েদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে, তাই এসি না কিনলেই না। মজুমদার সাহেব ভেবেছিলেন স্ত্রী হয়ত নিজের ঘরেও লাগাবার কথা বলবে। সম্ভবত টাকায় কুলায়নি বলে সেটা আর হয় না। খুশিই হলেন মজুমদার সাহেব, অন্তত তিনি এখনও প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধনটা ঠিক রাখতে পারছেন।

নগরজীবন বোধহয় মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে চায়। কুঠরির ভিতরের কুঠরিতে ঢুকিয়ে ফেলে। ভুলিয়ে দিতে চায় নীল আকাশের ঠিকানা। মজুমদার সাহেব একদিন ঘরে ফিরতেই স্ত্রী জানায়, আরেকটা ঠা া-যন্ত্র না কিনলেই না। কারণটা ঘরে ঢুকেই টের পেলেন তিনি। স্ত্রীই দেখিয়ে দেয়, পাশের ফ্ল্যাটে এসি লাগিয়েছে। আর সেই এসির গরম বাতাস পুরোটাই তাদের জানালার দিকে ধেয়ে আসছে। ঘরের বাতাস গরম হয়ে যাচ্ছে। প্রথমটায় তিনিও দিশেহারা হয়ে যান। এবার বুঝি তার ঘরের উন্মুক্ত বাতাস বন্ধ হয়ে যায়। চিন্তিত মুখে জানালার দিকে তাকিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন। স্ত্রী জানায়, ওভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কোন লাভ হবে না। গরম বাতাস যেভাবে ঢুকছে তাতে রাতে কোনভাবেই ঘুমানো যাবে না। মজুমদার সাহেব বলে তুমি চিন্তা করো না ব্যবস্থা করছি। একটা কার্ডবোর্ড লাগিয়ে দিলেন তিনি বাতাসের গতিপথ বরাবর। বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দৃষ্টিপথও অনেকটা ঢেকে গেল। খি ত প্রকৃতি নিয়ে মজুমদার সাহেব তখনও স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন দেখেন তিনি গভীর অরণ্যের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। বিচিত্র সব গাছের মেলা চারপাশে। মাঝে মাঝে পথ কেটে চলে যায় ছোট ছোট ঝোরা। এমনকি তিনি পায়ে ঠা া পানির স্পর্শও অনুভব করেন।

তবে অত সহজে নগর তাঁকে নিষ্কৃতি দেয় না। মাসখানেক পর তিনি একদিন ঘরে ফিরে দেখেন তাঁর ঠিক উল্টোদিকের ফ্ল্যাটে এসি লাগানো হয়েছে। এবারে পাশ থেকে না, সরাসরি তাদের জানালা নিশানা করে গরম বাতাস ছুটে আসবে।

সে রাতে গরম ছিল বেশ। স্ত্রী ঘরে ফিরে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় অন্যদিকে মন দিতে পারেনি। কিন্তু শোয়ার সময় জানালা দিয়ে হু হু করে গরম বাতাস ঢুকতে দেখে চোখ কপালে উঠে যায়। দৌড়ে চলে যায় জানালার কাছে। তারপর অবাক হয়ে স্বামীর দিকে ফিরে বলেন, ‘তুমি দেখনি এটা?’

‘দেখেছি।’

‘তাহলে বলোনি কেন?’

একটু অস্বস্তি নিয়ে তিনি বলেন, ‘কি বলবো?’

‘এরকম একটা সর্বনাশ হয়ে আছে আর তুমি কিছুই বলবে না!’

সেই রাতে আরেক জনের এয়ারকুলার নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি চলে অনেকক্ষণ। তবে মূল আঘাতটা আসে পরের দিন সকালে অফিস যাওয়ার আগে। স্ত্রী সাফ জানিয়ে দেয় যে করে হোক তাদের ঘরে এসি লাগাতে হবে। মজুমদার সাহেব না বলতে পারেন না।

দু’দিনের মধ্যেই ঘরে এসি লেগে যায়। রাতে ঘরে ঢুকে মজুমদার সাহেবের মনে হয় তাঁর দ্বীপান্তর হয়েছে। আত্মীয়সজন, বন্ধুবান্ধব সবাই আজ অনেক দূরে। চেনা জগতটা যেন হঠাৎ করে তাঁর চোখের সামনে থেকে হারিয়ে গেছে। কৃত্রিম বাতাসে নিশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হয়। শুয়ে শুয়ে তিনি ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। খোলা আকাশ দেখার জন্য বুকটা হাঁসফাঁস করে ওঠে। মনে পড়ে আগের সেই পুরনো বাড়িটার কথা। একদিন তিনি একা ছিলেন বাড়িতে। দুই মেয়ে মায়ের সঙ্গে গেছে নানার বাড়ি বেড়াতে। তখনও শীত পুরো যায়নি। ঘরের জানালা সব বন্ধ করা। আগের দিনের কাঠের পাল্লার জানালা বলে ঘরে কোন আলো ঢোকে না বাইরে থেকে। সেদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে কেন যেন খুব হাঁসফাঁস লাগছিল। যদিও শীত লাগছিল, তারপরও তিনি একটা জানালা খুলে দিলেন। কি আশ্চর্য হুড়োহুড়ি করে জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ে চাঁদের আলো। ওরা যেন জানালার পাশেই তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল। আলো কিছুটা এসেছিল জানালার ওপাশের শিশু গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে। ছোট ছোট গোল গোল আলোর টুকরো হুটোপুটি করতে থাকে তাঁর ঘরের মেঝেয়। অনেক দিন পর মাঠে নামার অনুমতি পাওয়া ছোট বাচ্চার মতো তারা ছোটাছুটি করতে থাকে ঘরময়। আজ সেই কথা মনে হতেই তাঁর দমটা আবারো কেমন বন্ধ হয়ে আসতে চায়। তিনি ঘুমন্ত স্ত্রীর পাশ থেকে সাবধানে উঠে চলে যান বসার ঘরে। অনেক রাত পর্যন্ত বসে থাকেন ওখানে।

সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার আনন্দটা মজুমদার সাহেবের অনেকখানি ফিকে হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকেই সেই দম বন্ধ পরিবেশ। তিনটে বেডরুমই বসার ঘরের সংলগ্ন। সেটাতে বসাও এখন সমস্যার। আরেকটা কোন ফ্ল্যাটের এসির হাওয়া ঢুকে সেটাও গরম হয়ে থাকে। সেখানে বসে তাদের চায়ের আড্ডা প্রায় বন্ধই। তিনি একটু সময় বসেন একা একা। অন্যরা যে যার ঘরে দরজা বন্ধ করে এসি ছেড়ে বসে থাকে। প্রায়ই এদিক সেদিক সময় কাটিয়ে দেরি করে ফেরেন তিনি।

সেদিন বাসায় ফিরে দেখেন বিদ্যুৎ নেই। শুনলেন দুপুর বারোটায় গেছে এখনও আসেনি। এখন বুঝতে পারেন কেন জেনারেটর চলছে না। আশপাশে দুই একটা বাসায় আলো দেখা যাচ্ছে। সম্ভবত চার্জার লাইটের আলো। কারণ কোন জেনারেটরই চলছে না। সারাদিন চলে চলে বোধহয় তেল শেষ করে ফেলেছে। জামা-কাপড় ছাড়তে ছাড়তে মজুমদার সাহেবের মনে কেন যেন খুব আনন্দ হয়। আর তখনই চোখে পড়ে তার ঘরের জানালাটা খোলা। তিনি বড় বড় শ্বাস নেন। বুক তার ফুলে ওঠে অনেকটা। এক এক নিশ্বাসে তিনি যেন সমস্ত বায়ুম লটা বুকের ভিতরে নিয়ে নিতে চান। অদ্ভুত ভাল লাগায় মন ভরে ওঠে তাঁর। মোমবাতির আলোর মায়াবি পরিবেশে গায়ে তার শিহরণ জাগে। হারিয়ে যাওয়া কোন এক রোমাঞ্চ ফিরে ফিরে আসে। ছোট মেয়ের গলা শুনতে পান, গান গাইছে, ‘চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙেছে...।’

তিনি অবাক হয়ে ভাবেন কিভাবে সম্ভব। হাসি তো এখন আর বাঁধ ভাঙে না। সবই মাপা, সবই বিনিময়ের নিক্তিতে ওজন করা। যদিও চাঁদ তার আলো একটুও কমায়নি, কিন্তু তাও তার দেখা পাওয়া ভার। শহরের নানা ঝিকিমিকিতে ম

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫

৩০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: