মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

রিম ঝিম খৈয়াছড়া ঝর্ণা

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

ঝুম বৃষ্টিতে ঝর্ণা দেখব, কিন্তু হাতে সময় মাত্র এক দিন। বন্ধুদের নিয়ে আলোচনা হলো, কোন দিকটায় যাওয়া যায়। মোস্তাক ও কবির আবদার করল, বন্ধু খৈয়াছড়া চল। আমি রাজি হতেই দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের দশ বন্ধু পুরো প্রস্তুতি নিয়ে নেই। দিন তারিখ সময় গাড়ি সব রেডি। যাওয়ার দেড় দিন আগে মীরসরাইর সহনীয় পাক্ষিক খবরিকা পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান পলাশ ভাই ফোন দেন, জাভেদ ভাই ভ্রমণ তারিখ পরিবর্তন করুন। কারণ জানতেই বলেন মীরসরাইতে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। ঝর্ণায় যাওয়ার পথ খুবই রিস্কি। ওমা বলে কি! আরে ভাই ঝুম বৃষ্টিই তো আমরা কামনা করি। ওকে ডান, আপনারা পারলে আমার সমস্যা নেই। শুক্রবার ভোর ৫টায় গাড়ি ছাড়ে। দাউদকান্দির পর হতেই শুরু হয়ে যায় যানজটের তেলেসমাতি, মাঝে নাস্তা আর জুমা নামাজের বিরতি, দুপুরের খাবারে ভাতের বদলে সমুচা খেয়ে সময় সাশ্রয় করার পরও মীরসরাই বাজারে পৌঁছাতে বেলা বাজে তিনটা, সকাল এগারটা থেকে অপেক্ষায় থাকা মীরসরাইর অকুতোভয় সাংবাদিক দৈনিক জনকণ্ঠের রাজিব মজুমদার হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে আমাদের বরণ করেন।

কালবিলম্ব না করে স্থানীয় এক তরুণকে আমাদের সঙ্গে দিয়ে দেন। মাইক্রো বড়তাকিয়া গিয়ে বামে মোচড় নেয়। রেললাইন পর্যন্ত গিয়ে গাড়ি থামে। এবার হেঁটে যেতে হবে, প্রায় তিন কিলোমিটার। চারপাশে যে নৈসর্গিক দৃশ্য-তাতে ত্রিশ মাইল হাঁটলেও গায়ে লাগবে না। গ্রামের মেঠোপথ ও বাড়ির উঠান ক্ষেতের আইল ধরে হাঁটি, একটা সময় পাহাড় আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে সূর্য লুকায়। দ্রুত ঘড়ি দেখি, না এখনও দিন ফুরোনোর সময় রয়েছে আরও বাকি। নব উদ্যোমে পা দুটোকে আরও বেশি সচল করি, নতুন কিছু দেখতে পাব, এই আশায় বুক বেঁধে এগিয়ে যাই। এক সময় পেয়ে যাই ঝিরি। এখন ট্রেইল হবে ভিন্নরকম মুলিবাঁশের সাঁকো। ঝিরির ঠা-া পানি আবার কখনও বা হাঁটু পর্যন্ত দেবে যাওয়া রসালো কাদা মাড়ানো পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাই কাঙ্খিত লক্ষ্যে। দীর্ঘদিন ভ্রমণপিপাসুদের চোখের অন্তরালে থাকা রিমঝিম শব্দ তুলে আপন গতিতে গড়িয়ে পড়া খৈয়াছড়া ঝর্ণা। ওহ্! আল্লাহ্ কত সুন্দর তোমার মহিমা! চারপাশে ঘন সবুজ অরণ্য, তার মাঝে মনেতে রঙ ধরান খৈয়াছড়া। কিছুটা সময় অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রই। প্রায় আশি ফুট উচ্চতা থেকে বিশ থেকে পঁিচশ ফুট ব্যাসার্ধ নিয়ে তীব্র গতিতে পানি পড়ে।

হতাশার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া যে কোন মানুষই খৈয়াছড়ার রূপ-লাবণ্যে মুগ্ধ হয়ে নিজেকে নতুন করে সাজাবে নিঃসন্দেহে! পানির ক্ষিপ্রতায় ঝর্ণার সামনে ব্যসিন সৃষ্টি হয়েছে। সেই হিম হিম ঠা-া পানিতে জসিমের কি যে ফুর্তি আর দে দে-ছুটের নিজস্ব ফটোগ্রাফার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া ইফতেখার ভবিষ্যতে আরও বড় মাপের আলোক চিত্রকার হবে, সেই বাসনায় ডিএসএলআরের বাটন টিপতে টিপতেই অস্থির। ঝর্ণার উপচে পড়া যৌবনের শীতল পানিতে দীর্ঘ সময় গোসল করি, যেন ভেজার শখ মিটে না! যে কোন ঝর্ণার আসল রূপ সৌন্দর্য দেখার সুবর্ণ সময় হলো আগস্ট ও সেপ্টেম্বর। খৈয়াছড়া ঝর্ণার আশেপাশে আরও বেশ কয়েকটি ছোট ছোট ঝর্ণা আছে। সম্পূর্ণ বুনো পরিবেশে খৈয়াছড়া ঝর্ণার অবস্থান। দেশের বিশেষ কয়েকটি ঝর্ণার মধ্যে খৈয়াছড়া ঝর্ণার ভৌগলিক সৌন্দর্য বর্ণনাতিত। ইচ্ছে করলে জোৎস্না রাতে ক্যাম্প করে জম্পেশ আড্ডা জমিয়ে রাত কাটানো যাবে। যতদূর জানা যায় দূরদূরান্ত হতে আগত প্রকৃতিপ্রেমীরা রাত কিংবা দিন নিরাপদে সময় কাটাতে পারবে। কান পাতলেই শুনতে পাবে মায়া হরিণের ডাক। গান শুনতে চাইলে একটু বনের ভিতর ঢুকলেই শুনতে পাবে নাম না জানা পাখির মিষ্টি সুরেলা আওয়াজ।

খৈয়াছড়া ঝর্ণার মোট নয়টি ধাপ। বেশির ভাগ ভ্রমণপিপাসুরা প্রথমটি দেখেই আত্মতৃপ্তিতে ভোগে কিন্তু আমরা তো আর তেমনটি নই। সদ্য মোটরবাইকে আহত মোস্তাক পরের ধাপগুলো দেখার জন্য বায়না ধরে। ওঠতে শুরু করি পিচ্ছিল খাড়া পাহাড় বেয়ে। রিস্কি ট্রাকিংয়ে মোতাহেরকে দারুণ মিস করি। সময়ের অভাবে সব ধাপ দেখতে না পেলেও দ্বিতীয় ধাপটি বেশ চমৎকার, আরও বেশি আকর্ষণীয় অথচ রয়েছে কতটা অবহেলায়। খৈয়াছড়া ঝর্ণার অবস্থান- আকৃতি-পরিধি-প্রাকৃতিক নৈস্বর্র্গিক সৌন্দর্য-রোমাঞ্চকর ট্রেইল সব কিছু মিলিয়ে প্রকৃতির এক অনন্য সুন্দর লীলাখেলা। সরকার যদি খৈয়াছড়া ঝর্ণার অবকাঠামোর প্রতি নজর দেন তাহলে বাংলাদেশের মধ্যে অন্যান্য বৃহদাকার প্রাকৃতিক জলপ্রপাত হতে খৈয়াছড়া ঝর্ণাই হবে দূরুত্বের দিক থেকে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সব চাইতে নিকটতম আকর্ষণীয় ঝর্ণা।

যোগাযোগ

ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়ে রোডের পাশে বড় তাকিয়া এলাকায় গিয়ে বাম পাশের গ্রামের রাস্তা ধরে এগোতে হবে। বাস থেকে নামতে হবে মীরসরাই বাজার অথবা বাড়িহাট। রিজার্ভ কিংবা নিজস্ব বাহনে গেলে খৈয়াছড়া ঝর্ণার তিন কিলোমিটার আগে রেললাইনের পর্যন্ত যাওয়া যাবে, খরচ জনপ্রতি ২৫০০ টাকা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের রাতের বাসে অথবা মাইক্রোতে গিয়ে দিনে দিনে ঘুরে আসা যাবে। মীরসরাই বাজার হতে ঝিরি পর্যন্ত সিএনজি যায়। গাইড হিসেবে ৩শ থেকে ৫শ‘ টাকার বিনিময়ে রেললাইনের পাশের দোকানগুলো হতে গ্রামের কিশোর-তরুণদের সঙ্গে নেয়া যাবে।

টিপস

* খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসের কারণে যেন প্রকৃতির কোন ক্ষতি না হয়।

* সঙ্গে নেয়া খাবারের পলি প্যাকেট সঙ্গে নিয়েই ফিরুন।

* ঝর্ণার পানিতে গোসলের জন্য অতিরিক্ত কাপড় সঙ্গে নিন।

* অশালীন পোশাক পরিহার করুন।

* যত খুশি দু’নয়ন দিয়ে দেখুন, মন ভরে উপভোগ করুন। আর মনে মনে বলুন আমি দেখছি, ভবিষ্যত প্রজম্মকেও দেখাব। সুতরাং প্রকৃতির দেয়া সম্পদ ধ্বংস না করব না।

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: