কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘ক্যামেরা কম থাকায় দারুণ খুশি ছিলাম’

প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারী ২০১৫
  • মোঃ মামুন রশীদ

বর্তমান সময়টা প্রযুক্তির জয়-জয়কার। প্রযুক্তি ডামাডোল বাজাতে বাজাতে বড় পরিবর্তনের হাওয়া এনেছে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেটেও। প্রযুক্তির কল্যাণে ক্রিকেট আরও মজাদার, চমকপ্রদ আর আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। মাঠে অনুপস্থিত থেকেও ক্রিকেট ভক্ত-সমর্থকরা যেন আরও বেশি উপভোগ করতে পারেন ক্রিকেটের মজাটা। মাঠের বাইরের ক্যামেরা এখন মাঠেও থাকে। স্পাইডারক্যাম ঘুরে বেড়ায় মাঠের সবপ্রান্তে, দুই প্রান্তের স্টাম্পেও থাকে ক্যামেরা প্রতিটি সূক্ষ্ম ঘটনা ধারণ করতে। পরিস্থিতি যত রূঢ়, কারও ক্ষেত্রে যত মর্মান্তিক ঘটনাই ঘটুক ক্রিকেট মাঠে তা ঘরে বসেও বেশ ভালভাবে জানতে পারেন এখন ক্রিকেটপ্রেমীরা। প্রযুক্তির এই অগাধ ব্যবহার একবিংশ শতাব্দীতে প্রসার ঘটেছে ব্যাপক। আশি বা নব্বইয়ের দশকেও এত ক্যামেরা ছিল না, এমনকি মাঠের ভেতরেও ব্যবহার ছিল না। ওই সময়গুলোতে স্বর্ণযুগ কেটেছে বিশ্ব ক্রিকেটে সবেমাত্র পা রেখে নিজেকে চেনানো ‘ভারতীয় ক্রিকেট ঈশ্বর’ আর বিশ্বব্যাপী ‘লিটল মাস্টার’ নামে খ্যাতি পাওয়া শচীন টেন্ডুলকর। অনেক ভাল মুহূর্তই হয়ত ধারণ করা নেই। তবুও দারুণ খুশি ছিলেন টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বাধিক সেঞ্চুরির মালিক। বিশেষ করে ক্যারিয়ারে প্রথম নিউজিল্যান্ড সফরে তো ক্যামেরা বেশি না থাকার কারণে এখন অনেক বেশি আনন্দ প্রকাশ করেছেন তিনি। নিজের লেখা আত্মজীবনীতে সেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন এভাবেÑ ‘আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছিলাম ক্যামেরা কম ছিল বলে।’ কেন এত খুশি ছিলেন শচীন? কারণটা জানা যাক তাঁর আত্মজীবনী ঘেঁটে পাওয়া স্মৃতি থেকেই।

অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড সম্পূর্ণই ভিন্ন পরিবেশ। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে খেলা আর নিউজিল্যান্ডে খেলা একটু ভিন্নরকম সফরকারী দলের জন্য। এশিয়ার বাইরের দেশগুলোর জন্য তবু কিছুটা সুবিধাজনক এজন্য যে নিউজিল্যান্ডেও উইকেটগুলো দ্রুতগতির এবং পেস সহায়ক। কিন্তু এশিয়ার দলগুলোর জন্য পুরোপুরি বিরূপ প্রান্তর এখানকার পরিবেশ। ইতিহাস সাক্ষী দেয় এ দুটি দেশে ভারত-পাকিস্তান আর শ্রীলঙ্কার মতো দুনিয়া কাঁপানো দলগুলোও ভিজে বিড়াল হয়ে যায়। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডের উইকেটগুলোর গতি-প্রকৃতি বুঝে ওঠা যেন জটিল এক ধাঁধার সমীকরণ বের করার মতো। পরিসংখ্যান ঘেঁটে কিংবা গণিতের সূক্ষ্ম হিসেবও এখানে কাজ করে না। কিউইদের মাঠগুলো ছোট হলেও উইকেটের বৈরী আচরণ এবং মাঠের কিম্ভূতকিমাকার আকৃতি বড় চ্যালেঞ্জ উপমহাদেশের সব দলের জন্য। সেই নিউজিল্যান্ডেই মাত্র ১৭ বছর বয়সের তরুণ, আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শিশু শচীন সফর করেছিলেন ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে। একেবারে আনাড়ি শচীনকে নভজোত সিং সিধু, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, মনোজ প্রভাকর, কপিল দেব, রবি শাস্ত্রী, কিরণ মোরে, উরকেরি রমনদের মতো বিশ্বজোড়া খ্যাতনামাদের ভিড়ে দলে নেয়া হয়েছিল। তখন মাত্র ৪ টেস্ট খেলা শচীনের দ্বিতীয় সফরে প্রতিপক্ষ কিউই দলে রিচার্ড হ্যাডলি, জন রাইট, মার্টিন ক্রো, মার্ক গ্রেটব্যাচ আর ড্যানি মরিসনদের মতো দাপুটে ক্রিকেটাররা। আসলে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই) নতুনদের কেতন উড়িয়ে ভবিষ্যতের দল সাজানোর দিকে ছিল মনোযোগী।

কৃষ্ণমাচারী শ্রীকান্তকে অধিনায়কের পদ থেকে সরিয়ে সবেমাত্র আজহারউদ্দিনের কাঁধে চাপানো হয়েছে গুরু দায়িত্বটা। আগের সফরেই বিসিসিআইয়ের সঙ্গে দলের বেশ কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটারের টানাপোড়েনটাই ছিল মূল কারণ। তাই দুই মাস আগে পাকিস্তান সফরে প্রথমবার সুযোগ করে নিয়েছিলেন শচীন। ওই সফরে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হওয়া শচীন দুটি হাফসেঞ্চুরি পাওয়ায় সুযোগটা পেলেন এবারও। যদিও বাজেভাবে আউট হওয়ার জন্য ‘বাচ্চাদের সঙ্গে খেল’ জাতীয় কটূক্তিও হজম করতে হয়েছিল তাঁকে। প্রথম টেস্টে কিউইদের বিরুদ্ধে ০ আর ২৪ করে একই বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়েছিল শচীনকে। তখনও তিনি কাঁদেননি। কাঁচা বয়েস, সবেমাত্র টেস্ট ক্রিকেটের মতো মর্যাদার ভুবনে পদযাত্রা শুরু। সব পরিস্থিতি সহ্য করাটা বেশ কঠিন। সেটাই যেন প্রমাণ হলো দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে। এবার আর ব্যর্থ হননি বিস্ময়কর এ প্রতিভা। ৮৮ রানে আউট হওয়ার পর অঝোরে কেঁদেছিলেন। সেঞ্চুরি হাতছাড়া হওয়ার কষ্টটা সইতে পারেননি। নেপিয়ারে ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া টেস্টে ছিল বৃষ্টির বাগড়া। সে কারণে প্রায় আড়াই দিন নষ্ট হয়েছিল। প্রথম দিন আর পঞ্চম দিন পুরোপুরি ভেসে গেছে বৃষ্টিতে। দ্বিতীয় দিনে স্বল্প সময় খেলা হওয়ার পর প্রথম ইনিংসে ভারতীয় দল তুলেছিল ২ উইকেটে ১২৬। তৃতীয় দিন ব্যাট করার সুযোগ পান শচীন। দিনশেষ করেন ক্যারিয়ারের তৃতীয় ফিফটি হাঁকিয়ে ৮০ রান নিয়ে অপরাজিত থেকে। তখন পর্যন্ত ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংস।

রাতে বেশ প্রশান্তি নিয়েই ঘুমাতে গেছেন আর স্বপ্ন ছিল চতুর্থ দিন সেঞ্চুরি করেই ছাড়বেন। ভয়ঙ্কর পেসার ড্যানি মরিসনের বলে চার হাঁকিয়ে ভালভাবেই শুরু করেছিলেন চতুর্থ দিন সকালে। মরিসনের পরের ওভারের প্রথম বলেই আরেকটি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে প্রথম ক্যারিয়ার শতকের কাছাকাছি চলে যান আরও। কিন্তু স্বপ্নটা পরের বলেই গুঁড়িয়ে গেছে। ২০০৫ সালে শচীন যখন বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলা একজন ক্রিকেটার সেই দলের কোচ হয়েছিলেন জন রাইট। তিনিই ছিলেন হন্তারক। পেসার মরিসনের শর্ট অব লেন্থে ফেলা বলে ক্যাচ ওঠার পর রাইট সেটাকে ছাড়েননি। ৮৮ রান করার পর শচীনকে ফিরে যেতে হয়েছিল হতাশ হয়ে মাথা নিচু করে। সারারাত ধরে যে স্বপ্ন বুনেছিলেন সেটা ভেঙ্গে গেল রাইটের বিশ্বস্ত হাতে বন্দী ধরা পড়ে। স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়াটা মানতে পারেননি একেবারেই। হৃদয় ভেঙ্গে খানখান হয়ে গিয়েছিল পরবর্র্তীতে টেস্ট ক্রিকেটে সর্বাধিক সেঞ্চুরির মালিক হওয়া এ প্রতিভাধর ব্যাটসম্যানের। সীমানার দড়ির কাছে এসে পুরোপুরি কেঁদে ফেলেন। ক্যারিয়ার শেষে যখন এই ঘটনা মনে করেছেন নিজেকে সেই আচরণের জন্য শিশুতোষই মনে হয়েছিল। মনে মনে ধন্যবাদ দিয়েছেন প্রযুক্তি কম ছিল বলে। অঝোর কান্নার উষ্ণ অশ্রুধারা তাঁর গাল চুইয়ে বুক ছুঁয়ে ফেলেছিল। কিন্তু ক্যামেরার ব্যবহার বেশি না থাকায় সেটাকে ধারণ করতে পারেননি কেউ। তাই এখন মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকেও ধন্যবাদ দেন। এ বিষয়ে শচীন নিজেই বলেছেন, ‘আমি অত্যন্ত খুশি যে খুব বেশি ক্যামেরা তখন ছিল না। তাই আমাকে ছেড়ে কিউইদের উল্লাস ধারণেই ব্যস্ত ছিল ক্যামেরাগুলো। এখনকার সময়ে বিরক্তিকর ওই পরিস্থিতিটা বারবার টিভিতে দেখা যেত এবং খুব ভালভাবেই ধারণ করা হতো দৃশ্যটা। আমি বেঁচে গেছি।’ পরে সাজঘরে ফিরেই সরাসরি বাথরুমে ছুটে গিয়ে আরও একচোট কেঁদেছেন শচীন। সেসব কেউ বুঝতে পারেনি। এ কারণেই ক্যামেরা কম থাকাকে ধন্যবাদ দিলেন সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান শচীন।

তথ্যসূত্র : শচীন টেন্ডুলকরের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’

প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারী ২০১৫

১৪/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: