আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঐতিহ্য অনুসন্ধানী সেলিম আল দীন

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫
  • স্বকৃত নোমান

সেলিম আল দীন মূলত ঐতিহ্য অনুসন্ধানী নাট্যকার। বঙ্গ-ভারতের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে কেন্দ্রে রেখেই তাঁর নাটকের ভিত্তিভূমি রচিত। বেদ থেকে শুরু করে রামায়ণ-মহাভারত হয়ে মধ্যযুগের সাহিত্য তাঁর বিচরণভূমি। অতীতের শিক্ষাকে তিনি বর্তমানের সঙ্গে একাঙ্গীভূত করেছেন। ঐতিহ্যের সূত্র ধরে সমকালকে ধরবার চেষ্টা ছিল তাঁর। তাঁর প্রায় সব নাটকেই ঐতিহ্যের অনুসন্ধান প্রবল। তাঁর প্রাচ্য নাট্য এ নিবন্ধের বিষয়। এই একটি মাত্র নাট্যের মাধ্যতে তাঁর ঐতিহ্য অনুসন্ধানের ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

মহাভারত এই প্রাচ্য ভূমিরই অন্যতম মহাকাব্য। এর শিক্ষা বহুমুখী। তবে ক্ষমা, জীবপ্রেম ও অলঙ্ঘনীয় জাগতিক নিয়মকে শান্তচিত্তে মেনে নেয়াÑ এই হচ্ছে মহাকাব্যটির অন্যতম শিক্ষা। দুর্যোধন মহাভারতের প্রতিনায়ক এবং পাপী। অথচ দেখা যায় যুধিষ্ঠির স্বর্গে যাবার আগেই দুর্যোধন চলে গেছেন! এ আবার কেমন বিধান? তিনি যদি পাপীই হয়ে থাকেন তবে তাঁর স্থান তো নরকে হওয়ার কথা। যুধিষ্ঠির দুর্যোধনকে স্বর্গে দেখে ক্রুব্ধ হলে নারদ তাকে প্রবোধ দিয়ে বললেন, ‘দুর্যোধন ক্ষাত্রধর্মানুসারে যুদ্ধে নিজ দেহ উৎসর্গ করে বীরলোক লাভ করেছেন, মহাভয় উপস্থিত হলেও তিনি কখনও ভীত হননি। কেউ যুদ্ধে মরলে আজীবন কে কী করেছে, তা ধর্তব্য নয়।’

এখানেই পাপ-পুণ্য একাকার। যে কোন ছল-ছুতোয় ক্ষমার বিষয়টি প্রধান্য পায় মহাভারতে। শেষ পর্যন্ত যুধিষ্ঠিরও দুর্যোধনকে ক্ষমা করে একই সঙ্গে একই স্বর্গে বসবাসের মনস্থির করে। এ হলো মহাভারতের ক্ষমার দিক। যদি বলি সেলিম আল দীনের প্রাচ্য নাট্যে মহাভারতীয় দর্শনটির কথাই বলা হয়েছে, তবে এর নামকরণের একটা প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাওয়া যায়।

কিংবা যদি বলা হয় প্রাচ্যে ক্ষমা নয়, জীবপ্রেমের বৈশিষ্ট্যই উক্ত হয়েছে, তাও ভুল হবে না। মহাভারত জীবপ্রেমকেও মহৎ বলে ঘোষণা দেয়। মহাপ্রস্থানিকপর্বে যুধিষ্ঠিরকে স্বর্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য ইন্দ্র এলেন রথ নিয়ে। কিন্তু যুুধিষ্ঠির ভক্ত কুকুরকে ছাড়া স্বর্গে যেতে রাজি নয়। ইন্দ্র বার বার বললেন, ‘কুকুরের দৃষ্টি পড়লে যজ্ঞ-দান-হোম প্রভৃতি নষ্ট হয়। ভাতৃগণ ও প্রিয়া পতœীকে ত্যাগ করে তুমি নিজ কর্মের প্রভাবে স্বর্গলোক লাভ করেছ, এখন মোহবশে কুকুরকে ছাড়তে চাও না কেন?’ যুধিষ্ঠির বললেন, ‘মৃতজনকে জীবিত করা যায় না, তাদের সঙ্গে কোন সম্বন্ধ থাকে না। তাই আমার ভাতৃগণ ও প্রিয়া পতœীকে ত্যাগ করেছি। কিন্তু এই কুকুর জীবিত। আমি তাকে ছাড়তে পারি না কিছুতেই।’ এখানে যুধিষ্ঠিরের জীবপ্রেম প্রকাশ পায়। এছাড়া মহাভারত যে অলঙ্ঘনীয় জাগতিক নিয়মকে শান্তচিত্তে মেনে নেয়ার কথা বলেছে সে-কথা সর্বজনবিদিত।

মহাভারতের এই তিন বৈশিষ্ট্যের সূত্র ধরে যদি প্রাচ্য নামের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজতে যাওয়া হয়, তাহলে এর নামকরণটা অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হয় না। ক্ষমা, জীবপ্রম ও জাগতিক নিয়মকে মেনে নেয়াÑ রূপক গল্পের মাধ্যমে সেলিম আল দীন সম্ভবত এই প্রাচ্য দর্শনেরই পুনরাবৃত্তি করেছেন। যুধিষ্ঠিরের নিকট যেমন তাঁর মৃত ভ্রাতৃগণ ও প্রিয় স্ত্রী গৌণ আর জীবিত কুকুর মুখ্য, তেমনি সয়ফরচানের কাছেও মৃত নোলক গৌণ, মুখ্য জীবিত সেই জীব, যার সৌন্দর্য তার ভিতরে সম্ভ্রম জাগায়। নোলককে দংশন করে সাপ তার স্বাভাবিক আচরণ করেছে। এটা তার অধিকার। এই অধিকার হরণ করা জাগতিক নীতি-বহির্ভূত। তাই সয়ফরচান প্রাকৃতিক নিয়মকেই শান্তচিত্তে মেনে নেয়।

এছাড়া বুদ্ধ ধর্ম-দর্শনও কিন্তু ক্ষমা ও জীবপ্রেমকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। প্রাচ্যের অন্যতম ধর্মগ্রন্থ কোরআনও ক্ষমার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ঈশ্বরকেও এখানে ‘মহা ক্ষমাশীল’ বলে গুণান্বিত করা হয়েছে। প্রাচ্যের মানুষরা স্বভাবগতভাবেই সয়ফরচানের মতো অদৃষ্টবাদী। পঞ্চবেদ এবং কোরআনেও অদৃষ্টবাদের কথা উক্ত হয়েছে। তো সেলিম আল দীন মূলত সেই ঐতিহ্যিক ভিত্তি ভূমিতে দাঁড়িয়েই নতুন করে পুরনো প্রসঙ্গটিকে হাজির করেছেন তাঁর প্রাচ্যে। প্রাচ্যকে ঐতিহ্যিক ভিত্তি ভূমিতে দাঁড় করালে এর নামকরণের জটিলতা উতরিয়ে ওঠা সম্ভব। সমকালীনতাকে দিয়ে প্রাচ্যের মূল বার্তা খুঁজতে গেলেই বোধহয় ঝামেলাটা বাঁধে। তত্ত্বগতভাবেই প্রাচ্য পুরাণ নির্ভর আর পুরাণকে যুক্তি দিয়ে বিচার চলে না। পুরাণের মানদ-ে বিচার করলেই প্রাচ্যের নামকরণের প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রাচ্য মূলত একটি লৌকিক গল্প ছাড়া আর কিছু নয়। লৌকিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিষয়গুলোই এখানে প্রাধান্য পেয়েছে। নাট্যকারও প্রাচ্যের কথাপুচ্ছে বলেছেন, প্রাচ্য মূলত মনসাপুরাণের উল্টা দিকটা কী রকম এমন ভাবনা থেকেই লিখিত। প্রাচ্যের লৌকিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা যায়। লৌকিক প্রবাদ আছে যে, প্রতি বাড়িতেই একটি করে সাপ থাকে। সেটা বাস্তুসাপ। তার ভয়ে বাড়িতে অন্য কোন সাপ প্রবেশ করতে পারে না। তাই ওটাকে মারতে নেই। মারলে অমঙ্গল হয়, নানা বিষাক্ত সাপ এসে বাড়িতে প্রবেশ করে, অধিবাসীদের অনিষ্ট করে তারা। কিন্তু বাস্তুসাপ কারও ক্ষতি করে না। তাই সয়ফরচান যখন সাপটিকে হত্যার উদ্দেশ্যে ছেনি ঘোরাবে এমন সময় তার দাদির হাত এসে খপ করে তার ছেনি বাগানো হাত ধরে ফেলেÑ ‘না, এইটা বাস্তুসাপ। খবদ্দার।’

নাট্যের মধ্যভাগেও দেখা যায়, এ সাপটিই একদিন ঘুমন্ত দাদির বুকের উপর ফণা তুলে বসে আছে। তাহলে সে নোলকের অন্বিষ্ট করল কেন? এর একটা লৌকিক কার্যকারণ দিয়েছেন লেখক। সাপটির আবাসে পড়েছিল নোলকের পা। ফলে নিরাপত্তা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কায় সে দংশনে বাধ্য হয়।

সর্বোতভাবে প্রাচ্যে মূলত মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের কথাই ব্যক্ত হয়েছে। ‘কোনটা তবে কি থেকে পৃথক হবে’Ñ এটি প্রাচ্যের একটি উক্তি। উক্তিটি নাট্যনায়ক সয়ফরচানের। ঠিক তারও নয়, বলা চলে নাট্যকারেরই বর্ণনা। এই উক্তির মাধ্যমে আমরা মুখোমুখি হই একটি দর্শনের, ‘কোনটা তবে কী থেকে পৃথক হবে।’ এই এক কঠিন জিজ্ঞাসা। মানুষ ও প্রকৃতি এক ঐক্যে এসে মিলিত হয় এখানে। একটি মাত্র লাইনেই যেন প্রকৃতি ও মানুষের অস্তিত্বের গূঢ় দর্শন নিহিত।

মনুষ্যতের জয়গান গাইতে গিয়ে মানুষ একমাত্র মানুষ ছাড়া আর সবকিছুকে মূল্যহীন ভাবতে শুরু করে। ভাবল, পৃথিবীতে একমাত্র মানুষই সত্য। অন্য কিছু থাকুক না থাকুক তাতে মানুষের কিছু যায় আসে না। সমুদ্র শুকিয়ে যাক, হিমালয় গলে যাক, বন-জঙ্গল উজাড় হোক, নদী মরে যাক, প্রাণীকুল বিলুপ্ত হোক, একমাত্র বেঁচে থাকুক মানুষ। এখানেই মানুষের মাহাত্ম, এই হচ্ছে মানবতার জয়।

ভুলটা এখানেই। প্রকৃতিকে ধ্বংস করা মানে মনুষ্যত্বের জয় নয়। এর মধ্য দিয়ে নিজেরাই নিজেদের অকাল ধ্বংস ডেকে আনছে মানুষ। মানুষ কোন একক প্রাণী নয়, এককভাবে বাঁচতে পারে না মানুষ। তার জন্য অনেক কিছুর দরকার হয়। সাগর, নদী, হিমালয়, বৃক্ষ, প্রাণী, চন্দ্র, সূর্য সবই মানব অস্তিত্বের সহায়ক শক্তি। আমরা যদি এগুলোকে বাদ দিয়ে একা বাঁচতে চাই, তবে বিপন্ন হবে আমাদের অস্তিত্ব। কিন্তু এ সত্যটি আমরা উপলব্ধি করতে পারি না সহজে। সয়ফরচান পেরেছিল। প্রাচ্যের অন্তপর্বে লেখা, ‘সয়ফর ছেনি হাতড়ে নেয়। সাপটি তার দিকে তাকিয়ে সতর্ক হয়। ফণা নামাতে গিয়ে আবার সাঁই করে লকলকে জিভে বুকে ভর দেয়। সেই ভর দেড় হাত উঁচুর কম নয়। একবার ডানে একবার বামে নড়ে নড়ে ফণার প্রতাপ দেখায়। প্রতাপ না সৌন্দর্য রাঙা বাহার। ফাল্গুনের ভোরের রাঙা মেঘাবলী বিচিত্রিত কমলাবর্ণের ফণা। সে উদ্ভিদ। মাটি ভেদ করে উঠেছে। বৃক্ষরাও ভূমিভেদী বিচিত্র ফণা। সে ফণা দোলে চিকন বাতাসে। কোনটা তবে কি থেকে পৃথক হবে। হায় সয়ফর দ্বিখ-িত হয়। তবে কে কার মতো।’

‘হায় সয়ফর দ্বিখ-িত হয়’। সাপ নয়, দ্বিখ-িত হয় সয়ফর নিজেই। বাহ্যিক অনৈক্যের মধ্যে ঐক্যের সন্ধান পেয়ে সে নিজের কাছে পরাজিত হয়। এই যে ঐক্য, বৃক্ষ ও সাপে ভেদ নেই, মূলত এ ঐক্যই প্রাচ্যের মূল সুর। বৃক্ষ মানুষের জন্য অনিবার্য। প্র্রয়োজন সাপেরও। কারণ সাপও বৃক্ষের মতো ভূমিভেদী, প্রকৃতির অংশ। প্রকৃতিকে বিচ্ছিন্ন করে মানব-অস্তিত্ব অসম্ভব। মানুষ ও প্রকৃতি কোনটাই কোনটা থেকে পৃথক নয়, একে অন্যের পরিপূরক। সাপটি প্রকৃতির সৌন্দর্য। তারও বেঁচে থাকার অধিকার আছে ঠিক মানুষের মতো করেই। সাপ থাকবে তার অন্ধকার আবাসে আর মানুষ মানুষের আবাসে। পরস্পরের সীমানা লঙ্ঘন করলেই প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দপতন ঘটে। নোলকের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। তার পা সীমানা ডিঙিয়ে সাপের সীমানায় পড়েছিল বলে সাপ স্বীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই দংশনে বাধ্য হয়। এ হচ্ছে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। সয়ফর এ নিয়মকেই শান্তচিত্তে মেনে নেয়। এই হচ্ছে প্রাচ্যের মূল সুর।

সুতরাং প্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাখ্যার দিকে না গিয়ে প্রাকৃতিক ব্যাখ্যাটাই বোধহয় যুক্তিসঙ্গত। প্রাচ্য সম্পূর্ণতই একটি প্রাকৃতিক উপাখ্যান। বেদ পুরানে যেমন প্রকৃতিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, প্রাচ্যের ধর্মশাস্ত্র ও কাব্যে যেমন জীবপ্রেমকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, প্রাচ্যেও তাই। তাই এর নাম প্রাচ্য।

প্রকাশিত : ৯ জানুয়ারী ২০১৫

০৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: