কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রো ড টু মে ল বো র্ন

প্রকাশিত : ৭ জানুয়ারী ২০১৫

চতুর্থ বিশ্বকাপ : ইংল্যান্ড ১৯৮৭

‘আন্ডারডগ’ অস্ট্রেলিয়ার চমক

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের চতুর্থ আসর বসে ১৯৮৭ সালে। প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল ‘ক্রিকেটের জনক’ ইংল্যান্ড। এবারে আর তাদের আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হলো না। ফুটবলের মতো ক্রিকেটকেও বিশ্বায়ন করার লক্ষ্যে আইসিসি ইংল্যান্ডের বাইরে চতুর্থ বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। আয়োজকের দাবিদার অকেই ছিল, কিন্তু আইসিসি ভারতের সঙ্গে সহ-আযোজক হিসেবে পাকিস্তানকে চতুর্থ বিশ্বকাপ আয়োজনের ভার দেয়। এবারে ভারতের রিল্যায়েন্স কোম্পানি চতুর্থ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের স্পন্সর হতে আগ্রহ প্রকাশ করে। আর তাই চতুর্থ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের নামকরণ করা হয় ‘রিল্যায়েন্স কাপ’। এবারের বিশ্বকাপে ৬০ ওভার করে খেলার পরিবর্তে করা হয় প্রতি ইনিংসে ৫০ ওভার করে। এবারের বিশ্বকাপেও মোট ২৭টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। আইসিসির পূর্ণসদস্য ৭টি দল ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে তৃতীয় আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন জিম্বাবুইয়ে আবারও ৮ম দল হিসেবে চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পায়।

এবারেও অংশগ্রহণকারী ৮টি দলকে দুই গ্রুপে ভাগ করা হয়। এ গ্রুপে স্বাগতিক ভারত, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও জিম্বাবুইয়ে এবং ‘বি’ গ্রুপে আরেক স্বাগতিক পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা অংশগ্রহণ করে। এবারেও গ্রুপ পর্বে প্রত্যেক দলকে ২ বার করে একে অপরের মোকাবেলা করতে হয়। ইউরোপের বাইরে বিশ্বকাপ হওয়ায় ও এশিয়ায় খেলতে আসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এবং অনেকে বয়সের কারণে চতুর্থ বিশ্বকাপ ক্রিকেট শুরুর আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্লাইভ লয়েড, ব্যাকার্স, জেফরি ডুজন, ল্যারি গোমস, উইনস্টন ডেভিস, ড্যানিয়েল, জোয়েল গার্নার, মাইকেল হোল্ডিং, ম্যালকম মার্শাল, এ্যান্ডি রবার্টস ইংল্যান্ডের বব উইলিসিস, ডেভিড গাওয়ার, ইয়ান বোথাম, এ্যালট, হেয়ার্নস, মার্কস, গোল্ড আস্ট্রেলিয়ার কিম হিউজ, আয়ান চ্যাপেল, হগ, থমসন, উড, ম্যাকলে, ইয়ালপ নিউজিল্যান্ডের হাওয়ার্থ, জন রাইট, কেয়ার্নস, রিচার্ড হ্যাডলি, কোনিরা অবসর নেয়ায় এবং কেউ কেউ ক্যারি প্যাকার সিরিজে নাম লেখানোর কারণে অনেকে ভেবেছিলেন এবারে বিশ্বকাপ আয়োজনই করতে পারবে না আইসিসি। সে রকম একটা শংকা যে ছিল না তা নয়। কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বেশ ঘটা করেই শুরু হয় চতুর্থ বিশ্বকাপ।

এবারও অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি ‘আন্ডার ডগ’ দল কাপ জিতবে এটা বিশ্বকাপ শুরুর আগে একজন মানুষও ভেবেছিলেন কিনা সন্দেহ। তৃতীয় বিশ্বকাপে যে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ মিশন শেষ হয় গ্রুপ পর্বে তারাই এবারে কাপ জিতে ক্রিকেটবিশ্বকে আরও একবার চমকে দেয়। তা ছাড়া বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রেলিয়ার সব নামীদামী তারকা কিম হিউজ, চ্যাপেল, হগ, থমসন, উড, হোগান, হুকস, রডনি মার্শ, জেফ লসন, ডেনিস লিলি, ম্যাকলে, ইয়ালপরা দল থেকে সরে দাঁড়ালে অপেক্ষাকৃত তরুণ এ্যালান বর্ডারের নেতৃত্বে বিশ্বকাপে একটি আনকোরা নতুন দল পাঠায় অস্ট্রেলিয়া। অনেকে ভেবেছিল, অস্ট্রেলিয়ার জয় নয় অংশগ্রহণই বড় কথা। কিন্তু তারাই যে শেষ পর্যন্ত কাপ নিয়ে ঘরে ফিরবে সেটা তখন কেউ ভাবেনি।

৮ অক্টোবর ১৯৮৭ চতুর্থ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী দিনে একটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। চতুর্থ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের অভিষেক ম্যাচে সিন্ধুতে স্বাগতিক পাকিস্তান শ্রীলঙ্কার মোকাবেলা করে। পাকিস্তানের ৫০ ওভারে ৬ উইকেটে ২৭৬ রানের জবাবে ৪ বল বাকি থাকতেই শ্রীলঙ্কার ইনিংস শেষ হয় ২৫২ রানে। পাকিস্তান উদ্বোধনী ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে ১৫ রানে হারিয়ে জয় পায়। পাকিস্তানের জাভেদ মিয়াঁদাদ ১০৩ রানের একটি দৃষ্টিনন্দন শতরান করেন। পরদিন ৯ অক্টোবর ইংল্যান্ড ২ উইকেটে হারায় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। এ বিশ্বকাপে ক্যারিবিয়ানদেরও অবস্থা ছিল নাজুক। দলের সব স্টার তারকা অবসর নেয়ায় ভিভকে একটি ভাঙ্গাচোরা দল নিয়ে লড়তে হয়।

‘এ’ গ্রুপ থেকে স্বাগতিক ভারত একটি ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার কাছে মাত্র ১ রানে হেরে বাকি ৫ ম্যাচে জিতে ১০ পয়েন্ট পেয়ে ‘এ’ গ্রুপে শীর্ষস্থান পায়। গ্রুপের অপর দল অস্ট্রেলিয়াও রবিন লিগের ফিরতি ম্যাচে ভারতের কাছে ৫৬ রানে হেরে বাকি সব ম্যাচ জিতে ১০ পয়েন্ট পেয়ে ‘এ’ গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান পেয়ে সেমি-ফাইনাল নিশ্চিত করে।

ইংল্যান্ডও নিউজিল্যান্ডের কাছে একটি মাত্র ম্যাচে পাকিস্তান ৩ ম্যাচে জিতে ও ৩ ম্যাচ হেরে ১২ পয়েন্ট নিয়ে আবারও সেমি-ফাইনাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গী হয়।

‘বি’ গ্রুপ থেকে আরেক স্বাগতিক পাকিস্তান লিগের শেষ ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ২৭ রানে হেরে এবং বাকি ৫ ম্যাচে জিতে ১০ পয়েন্ট পেয়ে ‘বি’ গ্রুপে শীর্ষস্থান পায়। গ্রুপের অপর দল ইংল্যান্ড পাকিস্তানের কাছে ২ বার ম্যাচে হেরে বাকি ৪ ম্যাচ জিতে ৮ পয়েন্ট পেয়ে এ গ্রুপে দ্বিতীয় স্থান পেয়ে সেমি-ফাইনাল নিশ্চিত করে।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে তিনবারের ফাইনালিস্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবার গ্রুপ পর্বের দেয়াল ডিঙাতেই পারেনি।

পাকিস্তানের লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে প্রথম সেমি-ফাইনালে স্বাগতিক পাকিস্তান এক ওভার বাকি থাকতেই (৪৯ ওভারে ২৪৯/১০ রান) ১৮ রানে অস্ট্রেলিয়ার (৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৬৭ রান) কাছে হেরে বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে। ভারতের মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড় স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় সেমি-ফাইনালে এশিয়ার প্রতিনিধি আরেক স্বাগতিক ভারত ২৭ বল বাকি থাকতেই (৪৫.৩ ওভারে ৮ উইকেটে ২১৯ রান) ইংল্যান্ডের (৫০ ওভারে ৬ উইকেটে ২৫৪ রান) কাছে ৩৫ রানে হেরে ফাইনাল বিশ্বকাপ মিশন শেষ করে। ফলে এশিয়ায় বিশ্বকাপের আসর বসলেও ফাইনালে এশিয়ার কোন প্রতিনিধি থাকল না। ৮ নভেম্বর কলকাতার ইডেন গার্ডেনের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া আগে ব্যাট করে ৫০ ওভারে ৫ উইহেট হারিয়ে ২৫৩ রানের একটা সম্মানজনক ইনিংস গড়ে। ডেভিড বুন করেন ৭৫ ও মাইক ভেলেটা করেন ৪৫ রান। জবাবে ইংল্যান্ড ১ রানে উইকেট খুইয়ে পিছিয়ে পড়ে। তারপরও লড়ে যায়। শেষপর্যন্ত তারা ৫০ ওভার খেলে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৪৬ রানে তাদের ইনিংস শেষ করে। ইংরেজরা হারে মাত্র ৭ রানে। বিল এ্যাথি ৫৮ ও মাইক গ্যাটিং ৪১ রান করলেও তাতে ইংরেজদের কাপ জেতা হয়নি। ঘটে গেল ক্রিকেট ইতিহাসের একটি অঘটন। স্বপ্নভঙ্গ হলো ইংল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তানের। যে অস্ট্রেলিয়াকে কেউ সেমি-ফাইনালিস্ট বলেই ভাবেনি শেষ পর্যন্ত তারাই কাপ জিতল। এরই নাম ক্রিকেট।

ইংল্যান্ডের গ্রাহাম গুচ ৮ মাচে ৫৮.৮৭ গড়ে সর্বাধিক ৪৭১ রান ও অস্ট্রেলিয়ার ডেভিড বুন ৮ মাচে ৫৫.৮৭ গড়ে সর্বাধিক ৪৪৭ রান করেন ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রেইগ ম্যাকডরমট ৮ ম্যাচে ১৮.৯৪ গড়ে সর্বাধিক ১৮টি ও পাকিস্তানের ইমরান খান ৬ ম্যাচে ১৩.০৫ গড়ে সর্বাধিক ১৭টি উইকেট নেন। চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া দলের নেতৃত্ব দেন এ্যালান বর্ডার এবং রানার্স আপ ইংল্যান্ডের মাইক গ্যাটিং। চতুর্থ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনা করেন পাকিস্তানের মেহবুব শাহ এবং ভারতের রামবাবু গুপ্ত। চতুর্থ বিশ্বকাপেও যে যোগ্য দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়া কাপ জয় করেছিল এ কথা অনেকেই মানবেন না। অনেকটা ভালো খেলা, অনেকটা ভাগ্য সহায় হওয়ার কারণে তারা কাপ জিতেছে বলে অনেকে মনে করেন। কেননা এ বিশ্বকাপে পাকিস্তান, ভারত, ইংল্যান্ড ছিল অনেকটাই ব্যালান্সড দল। তারপরও তারা কাপ পায়নি। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপ জিতেছে এটাই সত্যি, এটাই লেখা থাকবে ক্রিকেটবুকে। (চলবে)

e-mail : syedmayharulparvey@gmail.com

প্রকাশিত : ৭ জানুয়ারী ২০১৫

০৭/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: