মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বছর শেষে আদালতপাড়ায় উত্তেজনা

প্রকাশিত : ১ জানুয়ারী ২০১৫
  • আরাফাত মুন্না

২০১৪ সাল। উচ্চ আদালত, নিম্ন আদালত ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বছরের শুরু থেকে আলোচিত অনেক মামলাই ছিল শুনানি গ্রহণ পর্যায়ে। এ কারণে আদালতগুলোতে তেমন কোন আলোচনা ছিল না। বছরের শেষের দিকে আলোচিত মামলাগুলোর একের পর এক রায় প্রদান শুরু হলে আদালতপাড়ায় শুরু হয় উত্তেজনা। তাই সবার দৃষ্টি ফিরে এদিকেই। সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অল্পসময়ের ব্যবধানে হয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায়। হয়েছে রিভিউ নিয়ে দীর্ঘ দিনের বিতর্কের অবসান।

এর মধ্যে জামায়াতের নায়েবে আমীর দেইল্লা রাজাকারখ্যাত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ-ের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ- দেন সুপ্রীমকোর্ট। আরেক যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ-াদেশ বহাল রেখেছেন উচ্চ আদালত। এছাড়া জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করে বিভিন্ন মন্তব্য করেন আপীল বিভাগের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। অন্যদিকে, গত বছর মামলা জট নিরসনে সুপ্রীমকোর্টের নির্দেশে সারা দেশের আদালতগুলোতে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বছরের শেষ তিন মাসে হয়েছে যুদ্ধাপরাধের মামলার পাঁচটি রায়। যার প্রত্যেকটিতেই অভিযুক্তরা পেয়েছেন সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদ-। গত বছরই প্রথমবারের মতো যুদ্ধাপরাধের মামলার কোন রায় উৎসর্গ করা হয়েছে একাত্তরের বীরাঙ্গনা নারী ও যুদ্ধাশিশুদের প্রতি। নিম্ন আদালতেও বছরের শেষের দিকেই উত্তেজনা শুরু হয়। বিশেষ করে দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করার শুনানিকে কেন্দ্র করেই নিম্ন আদালতে উত্তেজনা বেশি হয়।

এছাড়াও সকল প্রকার ইংরেজি বিজ্ঞাপন বন্ধে তথ্য মন্ত্রণালয়কে হাইকোর্টের নির্দেশ। বিরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানে রুল জারি, হাসপাতালগুলোকে ধূমপানমুক্ত করতে রুল, প্রাইভেট গাড়িগুলোকে কালগ্লাস মুক্ত করতে আদেশ, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে সেশনচার্জ আদায়ে নীতিমালা করার বিষয়ে রুল, খাদ্য ভেজালমুক্ত করতে ফরমালিন পরীক্ষার যন্ত্র পরীক্ষা করার নির্দেশ, খাদ্যদ্রব্যের প্যাকেজিংয়ে প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধে রুল জারিসহ সারা বছরই বিভিন্ন গুরুত্বপূূর্ণ আদেশ দিয়েছেন হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চ।

সাঈদীর আমৃত্যু কারাদ-

সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগে নিষ্পত্তি হওয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার মধ্যে যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলাটি অন্যতম। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপীল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ একাত্তরে দেইল্লা রাজাকারখ্যাত এই যুদ্ধাপরাধীকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ-ের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছেন। এর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের দ্বিতীয় আপীল নিষ্পত্তি হয় সুপ্রীমকোর্টে। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।

কামারুজ্জামানের মৃত্যুদ- বহাল

গত বছরের ৩ নবেম্বর সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায়ে একাত্তরে সোহাগপুর গণহত্যার খলনায়ক কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ-ই বহাল রাখেন। ওইদিন আপীল বিভাগের জ্যেষ্ঠ্য বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপীল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে এ মৃত্যুদ-ের রায় দেন। বেঞ্চের অন্য তিন বিচারপতি হলেন- বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষের শুনানি শেষে রায়টি সিএভি (রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ) রেখেছিলেন সুপ্রীমকোর্ট। এ মামলাটি নিষ্পত্তির মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের তৃতীয় আপীল নিষ্পত্তি হয় সুপ্রীমকোর্টে।

যুদ্ধাপরাধ মামলায় রিভিউর সুযোগ

গত বছর সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগে যুদ্ধাপরাধের দুটি আপীলের নিষ্পত্তির পাশাপশি অবসান হয়েছে রিভিউ বিতর্কের। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার আপীল নিষ্পত্তির পর এ বিতর্কের শুরু হয়। কাদের মোল্লার মামলাটিই ছিল যুদ্ধাপরাধের প্রথম আপীল। গত বছরের ২৫ নবেম্বর কাদের মোল্লার রিভিউ সংক্রান্ত দুটি আবেদনের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করে সুপ্রীমকোর্ট। ওই পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত আপীল মামলার রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবে উভয়পক্ষই (আসামি পক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষ)। তবে এ আবেদন দাখিল করতে তারা সময় পাবেন পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর থেকে ১৫ দিন। ওই রায়ে বলা হয়, রিভিউ কখনই আপীলের সমকক্ষ হবে না। এছাড়া এই রিভিউ আবেদন দ্রুততার সঙ্গে শুনানি করে নিষ্পত্তি করতে হবে। সংবিধানে যুদ্ধাপরাধের মামলায় রিভিউ আবেদন দাখিল নিয়ে জটিলতা থাকলেও সুপ্রীমকোর্ট তাদের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা বলে রিভিউর সুযোগ দিয়েছেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।

এই রায়ে আরও বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধের দ- কার্যকরে জেল কোডের ৭ দিন অথবা ২১ দিনের বিধানও প্রযোজ্য হবে না। তবে মৃত্যুপরোয়ানা জারির পর দ-প্রাপ্ত আসামি রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ পাবেন। এর আগে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপীল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ এই রায় দিয়েছিলেন। প্রায় ১১ মাস পর ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশের মাধ্যমে চূড়ান্ত সমাপ্ত হলো রিভিউ বিতর্কের।

২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রীমকোর্টের চূড়ান্ত রায়ে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- হওয়ার পর থেকেই রিভিউ নিয়ে বিতর্কের শুরু হয়। এর পর আরেক যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে সুপ্রীমকোর্টের রায়ে আমৃত্যু কারাদ- দেয়ার পরও একই বিতর্ক সামনে আসে। সর্বশেষ যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জামানকে সুপ্রীমকোর্ট থেকে মৃত্যুদ- দেয়ার পরও সেই একই বিতর্ক নতুন করে শুরু হয়।

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়ে রুল

গত বছরের ৯ নবেম্বর বিচারপতি অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে দিতে করা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী কেন অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করা হবে নাÑ তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। ওই দিন এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মোঃ আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন। এর আগে গত ৫ নবেম্বর নয় আইনজীবীর পক্ষে এ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ এই রিট আবেদন করেন।

মনজিল মোরসেদ বলেন, একটি রিট মামলার রায়ে সুপ্রীমকোর্ট মার্শাল ল’ অর্ডিন্যান্স বাতিল করলেও, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদের বিচারক অপসারণ সংক্রান্ত সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান সংরক্ষণ করা হয়েছে। পুনঃমুদ্রিত সংবিধানে তা অন্তর্ভুক্তও করা হয়। তিনি বলেন, কিন্তু হঠাৎ করে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আইন ২০১৪ পাস হয় এবং গত ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। রিটকারীরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে আদালত অবমাননা আইন, সংশোধিত দুদক আইনের অংশ বিশেষ হাইকোর্ট বাতিল করায় এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় আদালত আসামিদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়ায় প্রশাসন ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণœ করতে’ এ সংশোধনী এনে থাকতে পারে।

নারায়ণগঞ্জের সাত খুন : হাইকোর্টের ভূমিকা

গত বছরের ২৭ এপ্রিল একসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার এবং তার ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম অপহৃত হন। পরদিন ২৮ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন নজরুল ইসলামের স্ত্রী। কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান করে মামলায় আসামি করা হয় মোট ১২ জনকে। ৩০ এপ্রিল বিকেলে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এর পর গত ৩ মে নূর হোসেনের সিদ্ধিরগঞ্জের বাসায় অভিযান চালিয়ে পুলিশ ১৬ জনকে গ্রেফতার এবং রক্তমাখা মাইক্রোবাস জব্দ করে। এরপর গ্রেফতার করা হয় আরও ৩ জনকে। এ হত্যাকা-ের ঘটনায় র‌্যাব-১১-এর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন নিহত প্যানেল মেয়র নজরুলের পরিবারের সদস্যরা। এ অভিযোগের পর র‌্যাব-১১-এর তৎকালীন সিও লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মাহমুদ, মেজর আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম এম রানাকে চাকরিচ্যুত করা হয় গত ৬ মে। এর পর হাইকোর্টের নির্দেশে তাদের গ্রেফতারও করা হয়েছে। বর্তমানে তারা কারাগারে রয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের ৫ ফাঁসির রায়

নিজামী : দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর ঘোষণা করা হয় যুদ্ধাপরাধের মামলার দশম রায়। এটিই ছিল গত বছরের প্রথম রায়। ট্রাইব্যুনাল-১-এর সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর অবসরে যাওয়ায় দীর্ঘদিনের জটে পড়ে থাকার পর জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা করে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। পরে দ- থেকে খালাস চেয়ে সুপ্রীমকোর্টে আপীল করেছে নিজামী।

মীর কাশেম : নিজামীর রায় ঘোষণার মাত্র তিন দিন পর যুদ্ধাপরাধের একাদশতম এবং গত বছরের দ্বিতীয় রায়টি আসে ২ নবেম্বর, তার তিন দিন আগেই দশম রায়টি হয়েছিল। জামায়াতে ইসলামীর অর্থ যোগানদাতা হিসেবে পরিচিত নেতা মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। দ- থেকে খালাস চেয়ে সুপ্রীমকোর্টে আপীল আবেদন করেছেন এই যুদ্ধাপরাধী।

খোকন রাজাকার : যুদ্ধাপরাধ মামলার দ্বাদশতম এবং গত বছরের তৃতীয় রায়টি ঘোষণা করা হয় গত ১৩ নবেম্বর। ওই দিন ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র ও বিএনপি নেতা পলাতক জাহিদ হোসেন খোকন ওরফে খোকন রাজাকারের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। পলাতক থাকায় আপীলের সুযোগ হারিয়েছে এই যুদ্ধাপরাধী।

মোবারক হোসেন : যুদ্ধাপরাধের ত্রয়োদশ এবং গত বছরের চতুর্থ রায়টি আসে ২৪ নবেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে। ওইদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজাকার কমান্ডার ও আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা মোবারক হোসেনকে মৃত্যুদ- দেয়া হয় রায়ে। রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে আপীলও করেছেন তিনি।

সৈয়দ কায়সার : গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর যুদ্ধাপরাধের মামলার চতুর্দশ ও গত বছরের পঞ্চম রায়টি ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ওই রায়ে প্রসিকিউশনের আনা ১৬টি অভিযোগের মধ্যে ১৪টি প্রমাণিত হওয়ায় সাবেক মুসলিম লীগ নেতা সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারকে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদ- দিয়েছে, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণের মতো যুদ্ধাপরাধে জড়িত ছিলেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীমকোর্টে আপীল করবেন বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী।

বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের প্রতি রায় উৎসর্গ

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের এই প্রথম বারের মতো অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি ধর্ষণের দায়ে কোন যুদ্ধাপরাধীকে ফাঁসির দ-াদেশ প্রদান করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২৩ ডিসেম্বর সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারকে মৃত্যুদ- দিয়ে দেয়া রায়ের পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল বলেন, যে যুদ্ধশিশু জন্ম থেকে সামাজিক নিগ্রহ, ধিক্কার, গঞ্জনা বা বঞ্চনা নিয়ে বড় হচ্ছে তারা সাহসী নারী। তাদের আমরা স্যালুট জানাই। বুলেটের আঘাতের চেয়েও ধর্ষণের আঘাত অনেক যন্ত্রণাদায়ক, ভয়ঙ্কর। একাত্তর সালে শত্রুর গুলিতে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন তাঁদের থেকেও যন্ত্রণাদায়ক হলো যাঁরা একাত্তর সালে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের যন্ত্রণা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। সামাজিকভাবেও এ যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। এ জন্য আদালত বলেছে, একাত্তরে যুদ্ধশিশু, ধর্ষিত নারী ও যাঁরা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাঁদের তালিকা করে পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের ‘ওয়ার হিরো’ উল্লেখ করে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তাদের প্রাপ্য সম্মান দেয়া, সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধ ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দেখা উচিত।

এ দিকে এ রায়কে একাত্তরের বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের প্রতি উৎসর্গ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। রায়ের পর প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ বলেন, ‘এ রায় একটি বিরাট অর্জন। এ রায় আমরা একাত্তরের বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের প্রতি উৎসর্গ করছি।’

খালেদার বিচার চলছে নিম্ন আদালতে

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বিচার চলছে ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতে। গত ১৯ মার্চ ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক বাসুদেব রায়ের আদালত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় অভিযোগ গঠন করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিচার শুরু করে। এরপর সময়ের আবেদনের কারণে কয়েক দফা তারিখ পিছিয়ে গত ২২ সেপ্টেম্বর বিএনপি সমর্থক আইনজীবীদের হট্টগোলের মধ্যে খালেদার অনুপস্থিতিতেই অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এ দুটি দুর্নীতি মামলা বাতিলে উচ্চ আদালতে গিয়ে বিফল হওয়ার পর বাসুদেব রায়ের নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাইকোর্টে গিয়েছিলেন খালেদার আইনজীবীরা। কিন্তু সব আবেদন খারিজ হয়ে যাওয়ায় বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হওয়ার পরও বিভিন্ন আবেদন করতে থাকেন তারা। খালেদার আইনজীবীরা এ পর্যন্ত হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালত মিলিয়ে ৪৫টিরও বেশি আবেদন করেছেন।

গত ১৭ ডিসেম্বর এই মামলায় সর্বশেষ শুনানি গ্রহণ করেন অভিযোগ গঠনকারী বিচারক ঢাকার বিশেষ জজ বাসুদেব রায়। তাকে সরকার সম্প্রতি বদলি করলে খালেদার মামলার দায়িত্ব পান আবু আহমেদ জমাদার। বাসুদেব রায়কে নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসা বিএনপি বিচারক বদল নিয়েও প্রশ্ন তুলে বলে, এটা বিচারের ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তারের শামিল।

প্রকাশিত : ১ জানুয়ারী ২০১৫

০১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: