আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শহীদ জননী ও শহীদ জায়া মাহেরা খাতুন রাষ্ট্রীয় সম্মান পাননি

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪

ইফতেখারুল অনুপম, টাঙ্গাইল থেকে ॥ শহীদ জননী মাহেরা খাতুন অতীতের স্মৃতি মনে করে এখনও কাঁদেন। ৭১ সালের সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা মনে হলে হৃদয় তাঁর বিষণœ হয়ে ওঠে। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী হত্যা করেছে তাঁর স্বামীকে। মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে শহীদ হয়েছেন তাঁর সন্তান। তারপরেও তার সান্ত¡না এই যে বাংলাদেশকে তার সন্তান এনে দিয়েছেন লাল সবুজের পতাকা। স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও মাহেরা খাতুন রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ জননীর সম্মান পাননি। তবুও কারও প্রতি তার কোন ক্ষোভ নেই।

সরেজমিন টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার শেষ প্রান্ত পাকুটিয়া ইউনিয়নের আগ তারাইল গ্রামে গিয়ে কথা হয় এই শহীদ জননীর সঙ্গে। তার নিজের বয়স সঠিক করে বলতে না পারলেও ধারণা করা যায় তার বয়স ৮৫ থেকে ৯০ বছর হবে। বয়সের কারণে ভাল করে কথা বলতে না পারলেও মুক্তিযুদ্ধের সব স্মৃতিই তার মনে আছে। তিনি বলেন, আমার তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে শহীদ আহসান উদ্দিন চৌধুরী ছিল দ্বিতীয় সন্তান। যুদ্ধের সময় ওর বয়স ছিল ১৮/২০। আহসানের বাবা দিদার আলী চৌধুরী চট্টগ্রাম টেলিফোন অফিসে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যুদ্ধ শুরু হলে আহসানের বাবা বাড়িতে চলে আসে। তখন অনেকেই তাকে বলে কর্মস্থলে না গেলে পরে তার চাকরি থাকবে না। সে ভরা যুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম চলে যায়। সেই যে গেল আর ফিরে এল না। শুনেছি পাকিস্তানী সৈন্যরা টেলিফোন অফিস থেকে তাকে ধরে নিয়ে হাতে এ্যাসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। টর্চারসেলে নিয়ে তাকে হত্যা করে। তার লাশও আমরা পাইনি।

ছয় সন্তান নিয়ে কিভাবে সংসার চালাব এ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। চার দিকে শুধু অন্ধকার দেখি। কোথাও বের হওয়ার উপায় নেই। চার দিকে শুধু গুলির আওয়াজ। কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। এক বেলা খেয়ে অন্যবেলা না খেয়ে দিন চলতে থাকে। সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে আহসান দুপুরে আমার কাছে এসে বলল মা ভাত দাও। একটা বিশেষ কাজে যাব। আমি ওর সাথে রাগ করে বললাম, ঘরে চাল নেই। ভাত দেব কোথা থেকে। যাহোক পরে ভাত রান্না করে ওকে খাবার দিলাম। খাবার শেষ করে কোথায় জানি না বলে চলে গেল। রাত গড়িয়ে সকাল হলো। ওর দেখা নেই। চার দিকে যুদ্ধ। ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলাম। কোথাও খুঁজতে যাব তার উপায় নেই। পরে জানতে পারলাম সে যুদ্ধে গেছে। পাশের বাড়ির অনু দেওয়ানের কাছে বলে গেছে আমি যুদ্ধে গেলাম, মা যেন আমার জন্য চিন্তা না করে। পাশের বাড়ির হাফিজ উদ্দিন তাকে যুদ্ধে নিয়ে গেছে। পরে জানতে পারি আহসান শহীদ হয়েছে। তার লাশও আমি দেখতে পারি নাই। কেদারপুরে অপর এক সহযোদ্ধার সাথে তাকে কবর দেয়া হয়। শহীদ আহসানের সহযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিনের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, বাড়ি থেকে বের হয়ে হাফিজ ও আহসান কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দেয়। একমাস প্রশিক্ষণ নিয়ে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। রবিউল আলম গেরিলা তাদের কমান্ডার ছিল।

এদিকে স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও শহীদ জননীর সম্মান পাননি মাহেরা খাতুন। টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে জেলার শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামফলকের তালিকায় শহীদ আহসান উদ্দিন চৌধুরীর নাম দুই নম্বরে থাকলেও টাঙ্গাইলে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার গেজেটে আহসান উদ্দিনের কোন নাম নেই। তার নাম রয়েছে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়। তার মুক্তি বার্তা নং- ০১১৮০৬০৩৫০। গেজেট নং- ৩৬৯২। নাগরপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুজায়েত হোসেন, স্থানীয় এমপি মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আব্দুল বাতেন শহীদ আহসান উদ্দিন চৌধুরীর নাম শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় গেজেটভুক্ত ও তার মা মাহেরা খাতুনের নামে রাষ্ট্রীয় সম্মানী ভাতার জন্য সুপারিশ করলেও কোন লাভ হয়নি।

প্রকাশিত : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৪

২৭/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: