কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

যৌনজীবীর সন্তানের ভবিষ্যত কী

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪
যৌনজীবীর সন্তানের ভবিষ্যত কী
  • মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

দেশের যৌনজীবী নারীরা দীর্ঘকাল ধরে নানা সমস্যায় জর্জরিত। দেশের বিভিন্ন পতিতালয়ে ওরা মানবেতর জীবনযাপন করে আসছে। সেখানে সুস্থ জীবন কাটানোর কোন অনুকূল পরিবেশ নেই। অস্বাস্থ্যকর এক ঘিঞ্জি পরিবেশে ছোট ছোট খুপরিতে ওদের বসবাস। সেখানে আলো-বাতাস চলাচল করে না। রয়েছে পানীয় জলের অভাব। পাশাপাশি টাউট, চাঁদাবাজ, মাস্তানদের উৎপাত। দালালদের বখরা, পতিতা সর্দারানীর জুলুম, নির্যাতন ওদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এমনকি খদ্দেরদের প্রতারণা তো রয়েছেই। আশপাশের প্রভাবশালীদের মন যোগাতেও হিমহিম খেতে হয় এ দেশের যৌনপল্লীর বাসিন্দাদের। ভাসমান যৌনজীবীদের অবস্থা আরও করুণ। রাস্তাঘাটে, ফুটপাথে,পার্কে, রেলস্টেশনে যেখানেই ওরা যায় খপ্পরে পড়ে টাউটদের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতেও হেনস্তা হতে হয় । রাতে জোরজুলুম করে দেহভোগ আর টাকা পয়সা ছিনিয়ে নেয়া ওদের জন্য নিত্যদিনের ঘটনা। সমাজের একটা শ্রেণী ওদের ব্যবহার করে নির্বিচারে। পতিতাপল্লীতে প্রতিকূল পরিবেশের মাঝে দীর্ঘকাল বসবাসকারী যৌনজীবীদের শরীরের ওপর অত্যাচার-অনাচারের ফলে পতিতাদের নানা জটিল রোগব্যাধিতে প্রায়ই আক্রান্ত হতে হয়। অথচ ওদের সুচিকিৎসার তেমন কোন সুযোগ নেই। যৌনজীবী নারীর জন্য যেমন নেই কোন বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র তেমনি লোকলজ্জার কারণে সাধারণ হাসপাতালে ওরা চিকিৎসা নিতে পারে না। ফলে রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে পতিতাবৃত্তি চালিয়ে যাওয়াও আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। আয়ের পথ হয়ে যায় রুদ্ধ।

যৌনজীবী নারীর সবচেয়ে বড় সমস্যা ওদের সন্তান। এ পেশায় জড়িত নারী সাধারণত সন্তান চায় না। তারপরও অনেক সময়ই ওরা অনাকাক্সিক্ষতভাবে সন্তান ধারণ করে ফেলে। সন্তানসম্ভবা হলেই বিপদ এসে ভর করে ওদের জীবনে। এ সময় বন্ধ হয়ে যায় অর্থ উপার্জনের পথ। অথচ এ সময়ে চিকিৎসা, ওষুধের জন্য আরও বেশি অর্থের প্রয়োজন হয়। সন্তান জন্ম দেয়ার পর শুরু হয় সমস্যার নতুন অধ্যায়। যৌনজীবীরা পড়ে ভীষণ বিপাকে। আমাদের সমাজে পিতৃপরিচয়হীন সন্তানের কোন ঠাঁই নেই। স্বাভাবিক জীবনযাপনে ওদের সর্বত্র বাধা। ওদের জন্য আলাদা কোন স্কুল নেই। অন্য শিশুদের সঙ্গে দেশের শিক্ষায়তনে ওদের লেখাপড়ারও নেই কোন ব্যবস্থা। যৌনজীবী নারীদের কন্যাসন্তানের চেয়ে পুত্রসন্তান হলেই বেশি ঝামেলায় পড়তে হয়। কন্যাসন্তান হলে মা অথবা অন্য যৌনজীবী নারীদের সঙ্গে থেকে এক সময় মায়ের পেশাকেই গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু পুত্রসন্তান হলে সে সুযোগটুকু থাকে না। একটু বড় হলেই পতিতাদের পুত্রসন্তানরা আশ্রয়হীনের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। এক সময় ওরা বখাটে ও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে মিশে অপরাধ জগতের হয়ে যায় বাসিন্দা। আরও দুঃখজনক ব্যাপার, পতিতাদের মৃত্যু হলে ওদের কেউ জানাজা পড়াতে চায় না। নির্ধরিত গোরস্থানে ওদের জায়গাও হয় না। এমনকি ধর্মীয় রীতিনীতি না মেনে দাফন না করে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়।

যৌনজীবী নারীদের নানা সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন সময়ে দাবি উত্থাপিত হয়েছে। সম্মেলনও করেছে যৌনজীবী নারীরা।এ ধরনের এক বিশাল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে। সেখানে যৌনকর্মীদের চারশ’ সন্তান উপস্থিত ছিল। পতিতাদের সন্তানের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণসহ ১১ দফা দাবি পেশ করা হয়েছিল। পতিতারা তাদের জীবনের নিরাপত্তা ও সন্তানদের পুনর্বাসনের নিশ্চয়তা পেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ব্যাকুলতা প্রকাশ করে।

যৌনজীবী নারীরা আমাদের সমাজের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ওদের পুনর্বাসন ছাড়া যৌনজীবী নারী ও তাদের সন্তানের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ওদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম চাহিদা পূরণ, স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা প্রদান জরুরি। যৌনজীবী নারীদের সন্তানরাও সুযোগ পেলে দেশের জন্য হতে পারে সম্পদ। আর এ জন্য প্রয়োজন পতিতাদের সন্তানের উপযুক্ত শিক্ষাদানের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধি আর যথাযথ কর্মসংস্থান। তা হলে যৌনজীবী নারী ও তাদের সন্তানদের নিয়ে বিরাজমান সামাজিক সমস্যার সমাধান হতে পারে। আর এ জন্য সরকারী ও বেসরকারী সংস্থার উদ্যোগ এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই।

প্রকাশিত : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪

২৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: