মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এবারের বিজয় দিবস ভিন্ন আঙ্গিক

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪
  • শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী

বিজয়ের আনন্দ আমার জীবনে উপভোগ করা কখনও হয়নি। ষোল ডিসেম্বরের আগে আসে চৌদ্দ ও পনের ডিসেম্বর। ওই দু’দিন বহুবার বিভিন্ন মাধ্যমে আলীমকে বদরবাহিনীর ধরে নেয়া, নির্যাতন করে হত্যা করা, রায়েরবাজারের বধ্যভূমি থেকে ওর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার, আজিমপুর গোরস্তানে দাফনÑ এসব নিয়ে সাক্ষাতকার দিতে হয়। সব সময় কান্না রোধ করা যায় না। এর রেশ কাটিয়ে উঠতেও সময় লাগে।

এরই মধ্যে পার হয়ে যায় বিজয় দিবস। কিন্তু বড় ভালবাসি আমি এ দিনটিকে। পাটভাঙ্গা পতাকাবাঁশের মাথায় যখন ওড়ে গর্বে আমার বুক ভরে যায়। আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষটির রক্তেও দাগ দেখতে পাই ওই পতাকায়। উপলব্ধি করি বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষের মধ্যে, এ দেশের প্রতি ধূলিকনায় আলীম মিশে আছেন যেমন রয়েছেন আর সব শহীদ বুদ্ধিজীবী। ত্রিশ লাখ শহীদ তিন লাখ মা-বোনের অত্যুজ্জ্বল ত্যাগের মহিমা। আঠারো ডিসেম্বর পাওয়া আলীমের রক্তমাখা দেহ চোখের সামনে থেকে কখনও সরে না। তবে এবার ওই ছবির পাশে ঝুলছে কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসিতে ঝোলানো প্রাণহীন দেহ। ট্রাইব্যুনালে যখন ওর বিচার চলছিল তখন লোকজন পরিবেষ্টিত হয়ে সহাস্যমুখে দম্ভভরে দু’আঙ্গুলে ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে ঢুকতো, বেরোতো। ওকে দেখলেই কবি মেহেরুন্নিসার রক্তমাখা মুখ, মাথার লম্বাচুল চলন্ত ফ্যানের সঙ্গে বাঁধা, দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন সে মাথা– এসব দৃশ্য ভিড় করত চোখের সামনে। ওই খুনির হাতে জবাই হয়ে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের আর্তচিৎকার মিরপুরের ইথারে ভাসে এখনও।

বাঙালী হত্যার নীলনকশা প্রণয়নকারী গোলাম আযম বিদায় নিয়েছে যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্ত আসামির কলঙ্ক মাথায় নিয়ে। বেঁচে থাকাকালীন যতই সে আস্ফালন করুক, যতই সে তেইশ তরকারি দিয়ে আহারের বিলাসিতা করুক পৃথিবীর ইতিহাসে থেকে গেল ওর নাম খুনীদের গুরু হিসেবে। হিটলারের মতো ঘৃণাভরে উচ্চারিত হবে ওর নাম। ওর সন্তানরা বংশপরম্পরায় পরিচিত হবে খুনীর বংশধর হিসেবে। ভবিষ্যতে আর কোন মা-বাব পুত্রসন্তানের নাম গোলাম আযম রাখবেন না। ওর কৃতকর্মের যথাযোগ্য প্রতিদান। ফাঁসির আদেশ মাথায় নিয়ে নির্দিষ্ট সেলে দিন গুনছে নিজামী। ওর নির্দেশেই আলীম সবসহ সব বৃদ্ধিজীবীদের আলবদররা অপহরণ করেছিল এবং নৃশংস অত্যাচারের পর হত্যা করেছে বধ্যভূমিতে নিয়ে। আমি ওর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছি ট্রাইব্যুনালে। আসামির কাঠগড়ায় খুব আয়েস করে বসেছিল নিজামী। ভাবখানা এই ওরা আমার কিছুই করতে পারবে না, এই বিচারের প্রহসনে (নিজামীদের ভাষায়) ওর সাজাতো দূরের কথা। মহামান্য আদালতে সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যখন বলেছিলাম নিজামীর নির্দেশেই আমার স্বামীকে আলবদর বাহিনী বাসা থেকে জোর করে তুলে নিয়ে অত্যাচার করে হত্যা করেছে তখন অস্থিরতা লক্ষ্য করা গেছে নিজামীর। হ্যাঁচকা টানে মাথায় টুপি খুলে ফেলেছে। বার বার এদিক-ওদিক করছিল। দর্শক সারিতে থাকা কেউ কেউ তা দেখেছেন। সত্যের উচ্চারণে ওর অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে হয়ত।

আরও অনেক প্রত্যক্ষদর্শী নিজামীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। ওর ফাঁসি কার্যকর হলে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিজন, ওর হাতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দুঃখ কমবে, নিহতের আত্ম শান্তি পাবে। মুজাদিহ, কামারুজ্জামান, সালাহউদ্দিন কাদেরসহ যারা বিচারের দ- মাথায় নিয়ে রায় কার্যকরের অপেক্ষায় আছে তাদের জন্যও একই অনুভূতি জনসাধারণের।

সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীরা কতখানি ভয়ঙ্কর এবং পাশবিক আমাদের চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না। আমরা স্বচক্ষে দেখেছি প্রিয়জনের সে নির্মম অত্যাচারের চিহ্ন। আজ পর্যন্ত সে দৃশ্য আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আমৃত্যু তা আমাদের পীড়া দেবে। আমার মেয়ে নীপা, শম্পা তিন বছর, দু’বছরের ছিল। বাবার রক্তাক্ত ছিন্নভিন্ন দেহটি কেউ তাদের দেখতে দিতে চায়নি। তবুও কে যেন শম্পাকে নিয়ে দেখিয়েছিল। ও আলীমের ছবিতে বিভিন্ন জায়গায় আঙ্গুল দিয়ে দেখত আর বলত ‘এখানে রক্ত, ওখানে রক্ত’। আজ এত বছর পরও সে স্মৃতি ভুলেনি শম্পা। কোন অনুষ্ঠান বা টকশোতে বাবা সম্পর্কে বলতে গেলে ওর গলা ধরে যায়। দু’চোখ বেয়ে নামে জলের ধারা। শুধু শম্পা নয় সব শহীদ বুদ্ধিজীবী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও স্বজনদের এমনটিই হয়। কত সন্তান বাবার মৃত্যুর পর জন্ম নিয়েছে। এমনি একজন নিশান। যখন ওর বাবা ডাঃ আযহারুল হককে আলবদররা হত্যা করে তখন নিশানের মা অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানের জননী হওয়ার আনন্দ তিনি লাভ করেননি। নবজাতকের মুখ দেখে আকুল কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন। তাঁর সে কান্না আজও থামেনি। আমার সন্তানদের মতো নিশানও জানে না পিতৃস্নেহ কী।

আমাদের এই সীমাহীন দুঃখের মাত্রা আরও বেড়েছে যখন দেখেছি খুনী নিজামী, মুজাহিদ, আলবদর কমান্ডার মৌলানা মান্নানরা মন্ত্রিত্ব পেয়েছে। গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে শহীদ সন্তানদের গায়ে ধুলো ছিটিয়ে পথ দিয়ে গেছে। ধুলোর মলিনতার চেয়েও ওদের মনের আঘাত হাজারগুণ বেড়েছে। যুদ্ধাপরাধীরা এভাবেই বার বার অপমান করেছে শহীদদের আত্মত্যাগকে। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ অন্তহীন বেদনায় আমাদের মূক করে দিয়েছে। একে তো বিচারহীনতার অবমাননা তার ওপর যুদ্ধাপরাধীদের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠান। তখন শুধু শহীদদের উদ্দেশে আমাদের একটা কথাই বলার ছিলÑ তোমাদের যা বলার ছিল বলেছে কি তা বাংলাদেশ?

জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া শহীদ পরিবার মুক্তিযোদ্ধা ও সম্ভ্রমহারা নারীদের মর্মবেদনা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন অথবা বুঝতে চাননি। দাঁড়াননি তাদের পাশে। উপরন্তু নানান লাঞ্ছনা-গঞ্জনা দিয়ে জীবন অতিষ্ঠ করেছেন। শহীদ পরিবারের কষ্ট-যন্ত্রণা দিয়ে শহীদদের আত্মাকেই কষ্ট দিয়েছেন। তাঁরা হয়ত বিশ্বাস করেন নাÑ শহীদদের মৃত্যু নেই। পরিবার পরিজন কষ্টে থাকলে শহীদরাও কষ্ট পান।

এ কথা বুঝেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি আমাদের বুকে টেনে নিয়েছিলেন। যাঁরা দেশ স্বাধীন করতে জীবন দিয়েছেন তাঁদের প্রতি ঋণ স্বীকার করে তাঁদের স্বজনদের সাহায্য করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও শুরু করেছিলেন। ওই কারণে ঘাতকরা তাঁর পিছু নিয়েছিল। সপরিবারে হত্যা করেছিল তাঁকে। আবার তাঁরই কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে পিতার মতোই দাঁড়িয়েছেন শহীদদের আত্মাকে যথাযোগ্য সম্মান দিতে। হিমালয়সম দৃঢ়তা নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে অনমনীয় থেকে এ বিচারকাজ শেষ করার ব্যবস্থা নিয়েছেন।

আজ দ-িত আসামিদের এক এক করে সাজা হচ্ছে। আমরা কাক্সিক্ষত বিচার পাচ্ছি। আর কোন চাওয়া আমাদের ছিল না। আহার বাসস্থানের জন্য দ্বারে দ্বারে আমরা ঘুরিনি তার আগেই বঙ্গবন্ধু ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। সেটাকে আরও পোক্ত করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এখন তিনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে দেশকে কলঙ্কমুক্ত করবেন। আমরা শান্তি পাব। আমাদের শহীদ স্বজনদের আত্মও শান্তি পাবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমাদের অসীম কৃতজ্ঞতা। শহীদের বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় শুধু তাঁকেই মানায়। আর কাউকে নয়। এ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে এবারের বিজয় দিবস এনেছে অন্যরকম সুখানুভূূতি। বিশেষ করে আমাদের জন্য। গত তেতাল্লিশ বছরে এমন সুপ্রভাত আমরা দেখিনি।

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪

১৬/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন



ব্রেকিং নিউজ: