মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দেশে রাজনীতিতে এখন মৌলবাদ হুঙ্কার দিচ্ছে ॥ গাফ্ফার চৌধুরী

প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪
দেশে রাজনীতিতে এখন মৌলবাদ হুঙ্কার দিচ্ছে ॥ গাফ্ফার চৌধুরী
  • পিআইবি-সোহেল সামাদ স্মৃতি পুরস্কারে সম্মান জানানো হলো বরেণ্য এই ব্যক্তিত্বকে

স্টাফ রিপোর্টার ॥ পাকিস্তানী তমসা মোচন করে সুরের আশ্রয়ে বায়ান্নর একুশেতে বাঙালীর জাগরণের সূচনা করেছিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ভাষাশহীদদের নিবেদন করে লিখেছিলেন আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। সেই থেকে বাঙালীর জাতীয় চেতনা বিকাশের প্রতিটি সংগ্রাম ও উত্থানে কলমের শক্তিতে রেখেছেন অনন্য ভূমিকা। অমর একুশের গানের রচয়িতা এই প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিককে প্রদান করা হলো পিআইবি-সোহেল সামাদ স্মৃতি পুরস্কার ২০১৪। এই প্রথম উপ-সম্পাদকীয় বা কলাম লেখার ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এ পুরস্কার প্রদান করা হলো। রবিবার সকালে রাজধানীর পিআইবি মিলনায়তনের লেখকের হাতে এ সম্মাননা তুলে দেয়া হয়।

পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি ব্যক্ত করে আবদুর গাফ্্ফার চৌধুরী বলেন, এ পুরস্কার বা সম্মাননা পেয়ে আমি গৌরবান্বিত। আমার ছেলের বয়সী অসম্ভব মেধাসম্পন্ন এক তরুণের নামে প্রবর্তিত পুরস্কারটি আমার কাছে নোবেল সমতুল্য। দেশে চলমান সাংবাদিকতার ধারা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা প্রয়োজন। আমরা যখন সাংবাদিকতা করেছি তখন সেটা ছিল আদর্শভিত্তিক। এখন তা বাণিজ্যিক সাংবাদিকতায় পরিণত হয়েছে। এখনকার সাংবাদিকরা টাকাকেই বড় করে দেখছেন। প্রযুক্তিসহ বৈষয়িক উন্নতি হলেও মানবিক ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছে। কিন্তু এ পেশায় শুধু অর্থের দিকে ধাবিত হলে প্রকৃত দায়িত্ব পালন হয় না। চিকিৎসা ও সাংবাদিকতা এমন কিছু পেশা আছে যা কিনা মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধকেই ভিত্তি করে এগিয়ে চলে। তাই এ পেশায় শুধু অর্থকে বড় করে দেখলে মর্যাদা রক্ষা করা যাবে না। পঞ্চাশের দশকের সাংবাদিকতার নৈতিক মূল্যবোধকে ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি সম্পাদকদের আহ্বান জানান। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা আবার মধ্যযুগীয় বর্বর সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থায় ফিরে গেছি। দেশে রাজনীতিতে এখন মৌলবাদ হুঙ্কার দিচ্ছে। আইন ও অস্ত্র দিয়ে এই অপশক্তিকে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক আদর্শ ও দর্শন দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে। ছয় দশকের সাংবাদিকতার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, এখন আর আমার সমসাময়িক কাউকে খুঁজে পাই না। আজিমপুর কিংবা বনানী কবরস্থানে গেলে যেদিকে চোখ যায় দেখি শুধু বন্ধুদের নাম। মনে হয় সবাই মিলে যেন ডেকে বলছে, আসো আমরা আড্ডা দেই। আমার বন্ধুদের মধ্যে কামাল লোহানী ও তোয়াব খান ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই।

আপন সাংবাদিকতা ও লেখালেখি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তোফাজ্জ্ল হোসেন মানিক মিয়া আমার সাংবাদিকতার শিক্ষাগুরু। অনেকেই ভাবেন আমি লন্ডনে বসে কেমন করে দেশের নানা বিষয়ে লিখি। এক্ষেত্রে আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেন মোনায়েম সরকার। তাঁর মাধ্যমে আমি বাংলাদেশের রাজনীতিসহ খুঁটিনাটি সব বিষয়েই তথ্য পাই।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) মহাপরিচালক শাহ আলমগীর। প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও তথ্য সচিব মরতুজা আহমদ। এছাড়া বক্তব্য রাখেন সোহেল সামাদের বড় ভাই ডাঃ বেলাল সামাদ। সভাপতিত্ব করেন পিআইবি পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান মিলন। আবদুল গাফ্্ফার চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পাঠ করেন পিআইবির সহকারী সম্পাদক শাহেলা আক্তার।

আয়োজনের শুরুতেই পিআইবির পক্ষ থেকে গাফ্্ফার চৌধুরীকে ফুল দিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানো হয়। এরপর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করে পালন করা হয় এক মিনিটের নীরবতা। অনুষ্ঠানে গাফ্্ফার চৌধুরীর হাতে পুরস্কারের স্মারক, ৫০ হাজার টাকার চেক, সম্মাননাপত্র ও সনদপত্র তুলে দেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন রাকা চৌধুরী। একইভাবে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয় সঙ্গীত পরিবেশনার মাধ্যমে। শেষ পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করেন হিমাংশু গোস্বামী।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাসানুল হক ইনু বলেন, একটা যুগ ও কালের মানুষ গাফ্্ফার চৌধুরী। কর্মের মাধ্যমে তিনি কালোত্তীর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। একইসঙ্গে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চা করা কঠিন হলেও তিনি সেটা পেরেছেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনÑ এই তিন দাগে বাঁধা বাংলাদেশ আর প্রতিটি দাগের সাক্ষী তিনি। যখন কেউ এই দাগ মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে কিংবা বিভ্রান্ত হয়েছে তখনই তিনি লেখনীর মাধ্যমে দাগ তিনটিকে স্পষ্টকরণের কাজটি করেছেন। লক্ষ্যভ্রষ্ট মানুষের জন্য তিনি ধ্রুবতারার মতো। তিনি গণমানুষের বিবেক। লেখনীর মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও গণতান্ত্রিক সুরমূর্ছনায় মানুষকে জাগ্রত করেন। মাধ্যমে চলমান দুনিয়ার সঙ্গে ইতিহাসের সংযোগ ঘটান। পোষা বাঘ যেমন বাঘ নয়, তেমনি পোষা সাংবাদিকও কোন সাংবাদিক নয় আর তিনি কোন পোষা সাংবাদিক না হওয়ায় অনেকেই অস্বস্তিতে ভোগেন।

কামাল লোহানী বলেন, ক্লান্তিহীন পথচলা ও অনুকরণীয় লেখনী শক্তির কারণে গাফ্্ফার চৌধুরী ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন। তাঁর শব্দচয়ন ও বাক্য রচনায় পাওয়া যায় অসাধারণ দক্ষতার ছাপ। যতদিন বাঙালী জাতি ও বাংলা ভাষা থাকবে ততদিন তাঁর একুশের গানটিও বাঁচবে এবং তিনিও বেঁচে থাকবেন। দেশে যতদিন নষ্ট রাজনীতি প্রচলনের কৌশল চলবে ততদিনই সেটার বিরুদ্ধে লিখে যাবেন গাফ্ফার চৌধুরীÑ এমনটাই আমাদের কামনা।

ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, সাংবাদিক হিসেবে তিনি একজন মহীরুহ। এক্ষেত্রে তিনি কেবল শিক্ষাগুরুই নন, তিনি আমাদের গর্বের। তাঁর লেখা থেকে উৎসাহ নেয়ার পাশাপাশি শিক্ষা নেয়ার চেষ্টা করি। আমি আশা করি, ভবিষ্যতে তিনি বরিশাল থেকে লন্ডন এই শিরোনামে আত্মজীবনী লিখবেন।

গোলাম সারওয়ার বলেন, গাফ্্ফার চৌধুরী আমাদের প্রেরণার অশেষ উৎস। তাঁর ¯েœহের পরশে আমরা এগোতে পেরেছি। আমি গর্ববোধ করি যে আমার সম্পাদিত দু’টি পত্রিকায় তিনি কলাম লিখেছেন আর তাঁর কলাম এখনও সর্বাধিক পঠিত। লাখ লাখ পাঠক অধীর আগ্রহে তাঁর কলাম পড়েন। এমনকি তাঁর রাজনৈতিক আদর্শকে যাঁরা পছন্দ করেন না তাঁরাও আগ্রহভরে কলামটি পড়ে থাকেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, গাফ্্ফার চৌধুরী যেন শতায়ু হন এবং শেষ দিনটি পর্যন্ত লিখে যেতে পারেন।

প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৪

১৫/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: