মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সংরক্ষণ না করায় পাবনার বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো নিশ্চিহ্ন হচ্ছে

প্রকাশিত : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪

কৃষ্ণ ভৌমিক, পাবনা থেকে ॥ দেশের স্বাধীনতা অর্জনে নিজের জীবন উৎসর্গ করতে যাঁরা পিছ পা হননিÑ সেসব শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার ৪৩ বছরে যথাযথ মর্যাদা পায়নি। পাবনা জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেসব বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী সাধারণ মানুষের গণকবর, কবরস্থান আর বধ্যভূমি। সারা বছর অযতœ অবহেলায় পড়ে থাকে সকলেরই দৃষ্টি সীমার বাইরে। এসব গণকবরগুলোর বেশ ক’টি বর্তমানে গো-চারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার দীর্ঘ বছর পেরিয়ে গেলেও কোন সরকার শহীদদের স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান দেখায়নি। সেসব স্থানে কোন স্মৃতিসৌধ, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের সরকার। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত ও শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মাননা জানিয়ে আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাবে এবং উজ্জীবিত করবে বর্তমান সরকার। পাশাপাশি অবহেলিত ওই সকল গণকবর, বধ্যভূমি সরকারীভাবে রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেবে এমন আশাও করছেন স্বজনহারা মানুষ।

সদর উপজেলার বাবুর বাগান গণকবর : পাবনা সদর উপজেলার দাপুনিয়া ইউনিয়নের নাজিরপুর বাবুর বাগান (স্থানীয়ভাবে লিচু বাগান হিসেবে পরিচিত)। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাবনার শান্তি কমিটির প্রধান রাজাকার আল-বদর মাওলানা আবদুস সুবহানের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ইঙ্গিতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ওই বাগানে গর্ত করে পাবনার মহররমসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাসীকে গুলি করে ও বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে ফেলে রেখে যায়। পরে স্থানীয় গ্রামবাসী ওই বাগানের কয়েকটি স্থানে তাদের গণকবর দিয়ে মাটি চাপা দেয়।

টেবুনিয়া কৃষি খামারে গণকবর : দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাবনার টেবুনিয়া কৃষি খামার। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে পাবনা শহরের নূরপুর ডাকবাংলো থেকে রাজাকার ও পিস কমিটির চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুস সুবহানের খবরের ভিত্তিতে আকবর হোসেন আকু, হাসান খাঁ, দুলাল, হায়দার আলী, পুলিশ সিহাহী আল্লা রাখা, মন্টু মিয়া ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জনৈক শিক্ষকসহ ২০ জনকে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী কালো কাপড়ে চোখ ও মুুখ বেঁধে নিয়ে যায় টেবুনিয়া ডাল ও তৈল বীজ খামারের শেষ প্রান্তের জঙ্গলের মধ্যে। পাকবাহিনী নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে ওই ২০ জনকে গুলি করে ও বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে।

আটঘরিয়া উপজেলার বংশীপাড়া গণকবর : পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার মাজপাড়া বংশীপাড়া ঘাট (শহীদ কালামনগর)। ৬ নবেম্বর মুক্তিযোদ্ধা, গ্রামবাসীর সঙ্গে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে ১২ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ মোট ৪৩ জন সাধারণ গ্রামবাসী শহীদ হন। দীর্ঘদিন অযতœ, অবহেলায় গো-চারণ ভূমিতে পরিণত ছিল ওই স্থান। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে সেখানে কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে। যথাযথ পরিচর্যা আর অবহেলায় পড়ে আছে স্মৃতি সৌধস্থান।

সাঁথিয়া উপজেলার ধুলাউড়ি গণকবর : পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার ধুলাউড়ি গণহত্যা চালায় ১৯৭১ সালের ২৭ নবেম্বর। জেলার অন্যস্থানের একদল মুক্তিযোদ্ধা ধুলাউড়ি গ্রামে আশ্রয় নেয় এবং একই দিন ওই গ্রামে পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন সময় তৎকালীন আল-বদর, আল-শামস প্রধান মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ নির্দেশে এবং তাদের সহযোগিতায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ওই গ্রামের চারদিক ঘিরে ফেলে মুক্তিযোদ্ধাদের এ্যাম্বুস করে করে হত্যা করে। এখানে পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধাসহ অর্ধশত গ্রামবাসী শহীদ হয়। গণকবরটি ইট দিয়ে বাঁধানো এবং গ্রামবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ শুরু হলেও এখনও শেষ হয়নি। সীমানা প্রাচীর দিয়ে গণকবরটি ঘিরে দেয়া হলেও চুনকাম না করায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

ডেমড়া-বাউশগাড়ী গণকবর : পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার শেষ সীমানা এবং বনওয়ারী নগর ফরিদপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা ডেমড়া। এলাকাটি নিরাপদ ভেবে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে হিন্দু মুসলমান ধণাঢ্য ব্যবসায়ীরা এ গ্রামে আশ্রয় নেয়। ৩০ বৈশাখ শুক্রবার তৎকালীন আল-বদর, আল-শামস প্রধান মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় এবং নির্দেশে তার স্থানীয় দোসর আসাদ রাজাকারের নেতৃত্বে এ গ্রামে ২৫০ জন হিন্দু ধনাঢ্য ব্যবসায়ীসহ প্রায় সাড়ে আটশ’ মুক্তিযোদ্ধা এবং স্থানীয় গ্রামবাসীকে নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী। সেই সঙ্গে তারা এই এলাকায় ব্যাপক লুটতরাজ ও নারী ধর্ষণ করে। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহৎ গণহত্যা চালায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এই ডেমড়া গ্রামে।

শহীদনগর ডাব বাগান গণকবর : রাজধানীর ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার শহীদনগর ডাব বাগান। এ স্থানে ১৯৭১ সালের ১৯ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধা, স্থানীয় গ্রামবাসীর সঙ্গে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে ১৯ জন ইপিআরসহ প্রায় ২ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা, হিন্দু ব্যবসায়ী ও নিরীহ গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করে এ দেশীয় দোসরদের সহযোগিতায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর। ডাব বাগানের এ যুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখতে এ গ্রামকে শহীদনগর নামকরণ করা হয়েছে। শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধার্থে তৎকালীন আওয়ামী লীগের তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানদের আর্থিক সহযোগিতায় ‘বীরবাঙালী’ নামে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে এর কাজ এখনও শেষ করা সম্ভব হয়নি। অবহেলা আর অযতেœ স্মৃতিসৌধটি গো-চারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় গ্রামবাসীর দাবি অসমাপ্ত ‘বীরবাঙালীর’ কাজ সমাপ্ত করে শহীদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবে বর্তমান সরকার।

প্রকাশিত : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৪

১৩/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: