কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঘুরে এলাম পর্তুগাল

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫
  • ফকির আলমগীর

সেই ১৯৮১ সাল থেকে ইউরোপ সফর করেছি। তৎকালীন সংস্কৃতি সচিব প্রখ্যাত নাট্যকার সাঈদ আহমদের নেতৃত্বে একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হয়ে সেটাই ছিল আমার প্রথম ইউরোপ সফর। সে যাত্রায় আমার সৌভাগ্য হয়েছিল সঙ্গীত পরিবেশনার পাশাপাশি আমার পছন্দের স্ক্যানডেনেভিয়ান দেশ সুইডেন, ডেনমার্কের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য স্বচোক্ষে দেখার। যন্ত্রশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী সমন্বয়ে গঠিত সাংস্কৃতিক দলের সদস্যের সঙ্গে সেই আনন্দ ভ্রমণের স্মৃতির কথা আমার অনেকদিন মনে থাকবে। তারপর অনেকবার ইউরোপ সফর করেছি, তবে এবারের সফরটি ছিল অনেক ব্যতিক্রম এবং সম্মানের। গেল ২৯ মে শুক্রবার সন্ধ্যায় দেশ ছাড়ি ৩০-৩১ মে পর্র্তুগালে অনুষ্ঠিত অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশনের (আয়েবা) দ্বিতীয় কনভেনশনে যোগদানের উদ্দেশে। ইউরোপে এক নতুন ধারার ব্যতিক্রর্র্মী সংগঠনের নাম ‘আয়েবা’ বা অল ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ এ্যাসোসিয়েশন। প্রায় এক মিলিয়ন বাংলাদেশী অধ্যুষিত ইউরোপে এটাই প্রথম কোন আন্তঃদেশীয়, অরাজনৈতিক ও অলাভজনক সংগঠন। ‘আয়েবা’ ইউরোপের ৩০টি দেশের প্রবাসী বাংলাদেশীদের সম্মিলিত সংগঠন হলেও আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ থেকেই এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই সংগঠনের আত্মপ্রকাশের পর সাংগঠনিক পথ পরিক্রমায় ডিসেম্বর ২০১২ তে গ্রীসের এথেন্সে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম সম্মেলন। যদিও আমার সৌভাগ্য হয়নি সেসময় গ্রীসের এথেন্সে অনুষ্ঠিত প্রথম কনভেনশনে যোগ দেয়ার। তবে এবার হয়েছে।

দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের আইবেরীয় উপদ্বীপের পশ্চিম দিকে পর্র্তুগাল অবস্থিত। পর্তুগালের পশ্চিম এবং দক্ষিণে আটলান্টিক মহাসাগর এবং উত্তর ও পূর্বে সে পথের সীমান্ত। আটলান্টিক মহাসাগরে দেশটির দীর্ঘ উপকূল রয়েছে। এছাড়াও দুটি স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপপুঞ্জ পর্তুগালের নিয়ন্ত্রনাধীন। এগুলো হলোÑ আসোরেস দ্বীপপুঞ্জ এবং মাদেইরা দ্বীপপুঞ্জ, যারা উভয়ই আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত। পর্তুগাল খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীতে রোমান সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। দৌরু নদীর মোহনায় অবস্থিত রোমান বসতি পোর্তুস কালে থেকে পর্তুগাল নামটি এসেছে। খ্রিস্টীয় ৫ম শতকে রোমান শাসনের অবসানের পর ইউরোপীয় অভ্যন্তর ভাগ থেকে জার্মানিয়া জাতির লোকেরা এসে পর্তুগাল শাসন করে। এরপর উত্তর আফ্রিকা থেকে মুসলমানেরা এসে দেশটি দখল করেন। এরপর এলাকাটি স্পেনীয় রাজাদের অধীনে আসে। ১২ শতকে পর্তুগাল একটি স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়। ১৫ শতকে পর্তুগাল ইউরোপের প্রধান সমুদ্রাভিযান কেন্দ্রে পরিণত হয়। পরবর্তীতে প্রায় ১০০ বছর পর্র্তুগীজ নাবিকরা বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে যান এবং বিশ্বের সমুদ্রবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন। এই নাবিকদের সহায়তায় পর্তুগাল ইউরোপের প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে একটি বৃহৎ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। ১৯১০ সাল পর্যন্ত পর্তুগালে রাজতন্ত্র প্রচলিত ছিল। ১৯৭৬ সালে প্রণীত নতুন সংবিধানে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন থেকে পর্তুগাল ইউরোপের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করেছে এবং অর্থনীতির আধুনিকায়নে জোর দিয়েছে। ভাস্কো ডা গামার পর্তুগাল দেখার ইচ্ছে বহুদিনের। সেই ইচ্ছে পূরণ হলো আয়েবার সম্মেলনে যোগ দিয়ে।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার অভিবাসী সাগরে সলিল সমাধির শিকার হওয়ার প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টিকে সবার কাছে তুলে ধরতেই এবারের আয়েবা গ্র্যান্ড কনভেনশনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘সেফ মাইগ্রেশন এ্যান্ড হিউম্যানিটি’ তথা নিরাপদ অভিবাসন ও মানবিকতা। যা হোক, এমিরেটাস এয়ারলাইন্সে দুবাই হয়ে আমি পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে পৌঁছাই। মঈন ও ফারুক আমাকে সংগঠনের পক্ষে লিসবন বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানায়। তারপর পর্তুগালে রানা ভাই, প্যারিসের স্বপন আমাকে আইএফআইএস হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে জিনিসপত্র রাখার পর তারা কনভেনশন স্থলে যাওয়ায় জন্য অনুরোধ জানায়। স্যানামেলোয়া নামের এক পাঁচতারা হোটেলের কনফারেন্স রুমে আয়েবার বিশেষ সেমিনার চলছিল। একদিকে দীর্ঘ বিমানভ্রমণে ক্লান্ত ছিলাম, ভীষণ ঘুম পাচ্ছিল, তবু তাদের অনুরোধ উপেক্ষা না করে বাংলাদেশীদের মিলনমেলায় উপস্থিত হই। কারণ দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত আয়েবার সম্মেলনের প্রতিটি মুহূর্তই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সেমিনারের বিরতিতে দেখা হয় সারা ইউরোপের গণ্যমান্য সব ব্যক্তিত্বের সঙ্গে, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, কূটনৈতিক, ব্যবসায়ীসহ আয়েবার কর্মকর্তাদের সঙ্গে।

অনেকের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং ছবি তোলা হয়। এদিন সেমিনারের পাশাপাশি আয়েবা এ্যাওয়ার্ড-২০১৫ প্রদান করা হয় বিশিষ্ট কমিউনিটি ব্যক্তিত্বদের মাঝে। এবারে ছয় বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে আয়েবা এ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করা হয়। এরা হলেনÑ বেলজিয়ামস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মিসেস ইসমত জাহান, সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং ইউনেসকোর সাবেক ডিজি, বারোনেস মনজিলা পোলাউদ্দিন লন্ডনের হাউস অব লর্ডসের মেম্বার, বীর মুক্তিযোদ্ধা মঈদ ফারুক, ফ্রান্সের বন্ধু প্রয়াত শহিদুল আলম মানিক ও ইতালি প্রবাসী শিল্পী সফিকুল কবির চন্দন। আটলান্টিকের পাড়ে অনুষ্ঠিত আয়েবার দুই দিনব্যাপী সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের অভিবাসীরা। যেমন লন্ডন থেকে প্রতিনিধি এসেছিলেন তেমনি এসেছিলেন, স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলো থেকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে অনেক অভিবাসী এ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এছাড়া শ্বাসরুদ্ধকর আলাপ-আলোচনার মধ্যে দিয়ে আগামী দুই বছরের জন্য কমিটি নির্বাচিত হয়। ইঞ্জিনিয়ার ড. জয়নুল আবেদীন ও কাজী এনায়েতউল্লাহ প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। তারপর সবাই অপেক্ষা করে ৩১ মে সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কেবল আমি বাংলাদেশ থেকে অংশগ্রহণ করি। এছাড়া ফ্রান্স থেকে শিল্পী আরিফ রানা, শিল্পী কুমকুম, রাশিয়া থেকে শিল্পী হৃদি শেখসহ অনেকে অংশগ্রহণ করেন। বিশেষ করে লিসবনে বসবাসরত বাংলাদেশী শিল্পীরা অনুষ্ঠানের আকর্ষণ বহুগুণে বাড়িয়ে তোলেন।

আয়েবার দ্বিতীয় সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পর্তুগালের এক কিশোরী শিল্পী বাঁশিতে জাতীয় সঙ্গীতের সুর তোলেন, তাকে সহযোগিতা করেন লিসবনে বসবাসরত বাংলাদেশী শিল্পীরা। সারা মিলনায়তন তখন দেশপ্রেমের আবেগে উদ্ভাসিত হয়। সন্ধ্যায় মূল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও পর্তুগালের শিল্পীরা বিপুল উৎসাহের সঙ্গে বাংলাদেশী শিল্পীদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করে অনুষ্ঠানে নতুন মাত্রা যোগ করেন। এক্ষেত্রে লিসবনে বসবাসরত তরুণ নৃত্য প্রতিভা মঈনের অবদান রয়েছে। এরপর রাশিয়া থেকে আগত শিল্পী হৃদি শেখের নৃত্যের ছন্দে সবাই মুগ্ধ হন। পরিশেষে আসে আমার একক পরিবেশনার সময়। পর্তুগালস্থ বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ইমতিয়াজ আহমেদ সস্ত্রীক উপস্থিত ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। এছাড়া আয়েবার কর্মকর্র্তাসহ বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী এই বর্ণিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। আয়েবার সাংস্কৃতিক সম্পাদক স্বপন ও মহিলা বিষয়ক যুগ্ম সম্পাদিকা বিউটির নান্দনিক উপস্থাপনায় ‘আমার বাঁশি’ পরিবেশনার মধ্যে শুরু হয় আমার সঙ্গীত পরিবেশনা। প্রথমেই ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’ গানটি পরিবেশনার শেষ মুহূর্তে আমার সঙ্গে পতাকা তুলে ধরতে মঞ্চে উঠে আসেন রাষ্ট্রদূতসহ আয়েবার কর্মকর্তাবৃন্দ।

মিলনায়তন ভর্তি দর্শক তখন দাঁড়িয়ে জাতীয় পতাকাকে সম্মান প্রদর্শন করেন। দলমত নির্বিশেষে সবাই যখন একজন গণসঙ্গীত শিল্পীর কথা এবং গানে উন্মাতাল হচ্ছে, আবেগ-আপ্লুত হচ্ছে তা স্বচোখে দেখে শিল্পী হিসেবে আমি গর্ববোধ করি। আমি বিশ্বাস করি, বহুধাবিভক্ত ইউরোপের বাংলাদেশী কমিউনিটিকে ইউনিটি ও একতার পতাকা তলে সমবেত করতে হবে। এবং তা সম্ভব একমাত্র সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের মাধ্যমে। সংস্কৃতি এক বহুতা নদী। অন্যদিকে শল্পীর কোন দল নেই, জাত নেই, ভৌগোলিক সীমারেখা নেই। সকল মত ও ধর্মবর্ণের উর্ধে উঠে সে তুলে ধরতে পারে একটি জনপদের আবেগ-আকাক্সক্ষা আর বিজয়কে। সেই কথাটিই আমি সেদিন গানে গানে আমার সঙ্গীতানুষ্ঠানে তুলে ধরেছিলাম। সবচেয়ে ভাল লেগেছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের স্বীকৃতি। তিনি বলেছিলেন, শিল্পীই হচ্ছে একটি দেশের প্রকৃত রাষ্ট্রদূত। এমনি আনন্দ, উত্তেজনা, শুভেচ্ছা আর ভালবাসার গান-গল্পের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল সে দিনের সেই সঙ্গীতানুষ্ঠান। একই সঙ্গে ভেঙ্গেছিল আটলান্টিক সাগরের পাড়ে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত আয়েবার মিলনমেলা। ওই রাতেই অনেকে সড়ক পথে পর্তুগাল ছাড়েন। আমরা অবশ্য হোটেলে অবস্থান নেই। পরের দিন পর্তুগালের রাজধানী লিসবন ঘুরে দেখার প্রচ- আগ্রহ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে ব্রেকফাস্ট করে দ্রুত ছুটে যাই ১৪০০ খ্রিস্টাব্দের পর্তুগীজ অভিযাত্রীদের স্মৃতিসৌধে। নাবিকদের অভিযাত্রার স্মৃতিসৌধ দেখার সাধ ছিল বহুদিনের। অবশেষে আয়েবার সম্মেলন সে সুযোগ করে দেয়। (চলবে)

লেখক : গণসঙ্গীত শিল্পী

প্রকাশিত : ৩ জুলাই ২০১৫

০৩/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: