কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সঙ্কটে আবাসন ব্যবসা

প্রকাশিত : ২৮ জুন ২০১৫
  • পারভেজ হোসেন

গত দুই দশকে বাংলাদেশের নির্মাণ শিল্প এগিয়ে গেছে অনেক দূর। এই শিল্পের অগ্রযাত্রাকে কেন্দ্র করে দেশের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে আবাসন ব্যবসার। এবং তা অবদান রাখছে অর্থনীতিতে। পরিসংখ্যান বলছে, এ শিল্প দেশের জিডিপিতে ৯ দশমিক ১ শতাংশ অবদান রাখছে। একে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান হয়েছে ২০ লাখেরও বেশি মানুষের। এ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে দেশের অনেক শিল্প কারখানা। নির্মাণ শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ২০-২৫ শতাংশ। কিন্তু গত তিন বছর ধরে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে দেশের আবাসন ব্যবসা। মন্দার কারণে চাকরি হারাচ্ছে অনেক মানুষ। আবাসনে নতুন গ্যাসের সংযোগ বন্ধ করা ও গৃহায়ন তহবিল থেকে ঋণ না দেয়ার কারণে আবাসন ব্যবসায় মন্দা শুরু হয়ে যা এখনও বিদ্যমান আছে।

একটি বাড়ি তৈরি করতে প্রয়োজন হয় ইট, বালু, রড, সিমেন্ট, রং, টাইলস, ইলেকট্রনিক্স পণ্যসহ আরও অনেক কাঁচামাল। দেশের আবাসন নির্মাণ বৃদ্ধির ফলে গড়ে উঠেছে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সারাদেশে আবাসনের ওপর নির্ভরশীল শিল্প খাত ২৬৯টি। আর এতে আছে প্রায় ১২ হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান। আবাসন মন্দার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। বছরে সিমেন্ট উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩ কোটি টন কিন্তু চাহিদা ১ কোটি ৮০ লাখ টন। দেশের উৎপাদিত সিমেন্টের ২৫ শতাংশ ব্যবহার করেন ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাতারা, ৩৫ শতাংশ আবাসন ব্যবসয়ীরা ও ৪০ শতাংশ ব্যবহার হয় সরকারী বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে। দেশের স্টিল উৎপাদন ক্ষমতা ৭০ লাখ টন কিন্তু চাহিদা কম থাকায় উৎপাদন হচ্ছে ৪০ লাখ টন। আর গত এক বছরে ৬০ গ্রেড রডের দাম কমেছে ৫ শতাংশ। সিরামিক শিল্পে ৫৪টি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আছে ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এ খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান হয়েছে ৪০ হাজার মানুষের। আবাসন খাতে মন্দার কারণে এ শিল্পের উৎপাদন কমেছে ৪০ শতাংশ। আবাসন ব্যবসার মন্দার কারণে সংযোগ অনেক শিল্পে মন্দা দেখা দিয়েছে যা অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়।

১৯৭০ সালের শেষদিকে বাংলাদেশে প্রথম আবাসন ব্যবসা শুরু হয়। তখন ৫টি কোম্পানি দেশে এ ব্যবসা শুরু করে। যা ১৯৮৮ সালে গিয়ে দাঁড়ায় ৪২টিতে। আবাসন ব্যবসা ক্রমশ বৃদ্ধির ফলে এ খাতে অনেক অনিয়ম এবং কাজে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হয়। আর এসব সমস্যা মোকাবেলা করতে আবাসন ব্যবসয়ীরা ১৯৯১ সালে রিয়েল এস্টেট এ্যান্ড হাউজিং ডেভেলপমেন্ট (রিহ্যাব) নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করে। এ প্রতিষ্ঠানটির কাজ হলো তার সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি ও তাদের সুযোগ-সুবিধার দিকে লক্ষ্য রাখা। বিদ্যমান মন্দা ব্যবসাকে চাঙ্গা করার জন্য রিহ্যাব গত ডিসেম্বর এবং এই জুনে আবাসন মেলার আয়োজন করে। কিন্তু মেলায় ক্রেতাদের দিক থেকে তেমন কোন সাড়া আসেনি। বিক্রেতারা বলছেন, ফ্ল্যাটের দাম এখন অনেক কমেছে। তারা এখন খুবই অল্প লাভে ফ্ল্যাট বিক্রি করছেন। তবু আশানুরুপ ফ্ল্যাট বিক্রি করতে পারছেন না।

রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামিন অবশ্য মন্দা কেটে ওঠবে বলে বিশ্বাস করেন। তিনি বলেন, জীবিকার প্রয়োজনে সারাদেশ থেকে মানুষ ঢাকায় আসতে চায়, থাকতে চায়। এ চাওয়া দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবং একারণেই ফ্ল্যাটের ব্যবসা নিয়ে আমি আশাবাদী। অস্থির রাজনীতির কারণে এত দিন কারো হাতেই তেমন টাকা পয়সা ছিল না। কিন্তু এখন অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। সব ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা হয়ে ওঠছে। সামনে জমির দাম বাড়বে। আবাসন খাতে মানুষ এখন বিনিয়োগ করলে লাভবান হতে পারবে। তাই আশা করছি, সামনের দিকে আবাসন ব্যবসায় আবারও চাঙা হয়ে উঠবে।

আবাসন খাতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আগামী ৫ বছর পর বাৎসরিক আবাসন চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে ৬০ হাজারে। আবাসন তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পর্যন্ত নগরবাসীর চাহিদার অর্ধেক ফ্ল্যাট তৈরি করতে পেরেছে। প্রতিবছর ঢাকা শহরে ৩০ হাজার বাড়ির চাহিদা যার ১৭-১৮ হাজার তৈরি করছে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো। পরিসংখ্যান বলছে, আবাসন চাহিদা মেটাতে আগামী ২০ বছরে ৪০ লাখ বাড়ি বানাতে হবে। তাই বর্তমান ব্যবসায় মন্দা সত্ত্বেও বিশেষজ্ঞরা এ ব্যবসায় নিয়ে আশাবাদী।

আবাসন ব্যবসায় নিয়ে জনকণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইকোনমিক্স ডিপার্টমেন্টের চেয়ারপার্সন প্রফেসর ড. নাজমা বেগম। তিনি বলেন, মন্দার প্রধান কারণ হলো সঠিক সময়ে গ্রাহককে তার ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেয়া এবং গ্রাহককে নানা হয়রানির মধ্যে ফেলা। এছাড়াও সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্দা, ফ্ল্যাটের চওড়া দাম, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের সল্পতা ও কোম্পনিগুলোর নানা অনিয়ম এ ব্যবসার মন্দার কারণ। এ মন্দা দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দিনমজুরের একটা বড় অংশ যারা এ খাতে কাজ করছে। যেহেতু দিনমজুরদের প্রান্তিক ভোগ প্রবণতা বেশি তাই তাদের আয় বাড়লে অথর্নৈতিক চাহিদা বাড়ে। আর সামগ্রিক চাহিদা বাড়লে মানুষ বিনিয়োগে উৎসাহী হয়। কিন্তু আমাদের বড় সমস্যা হচ্ছে বিনিয়োগ বাড়ছে না।

নাজমা বেগম আরো বলেন, এভাবে চলতে থাকলে এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোও ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আবাসন ব্যবসায়ীদের আরও স্বচ্ছ হতে হবে। গ্রাহকের হয়রানি বন্ধ করে সময়মতো গ্রাহককে তার ফ্ল্যাট বুঝিয়ে দিতে হবে। রিহ্যাব এবং সরকারকে আরও শক্তিশালী ভূমিকা নিয়ে আবাসন কোম্পনিগুলোর ওপর পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে এবং অনিয়ম পেলে জরিমানা, শাস্তি কিংবা প্রয়োজনে তাদের ব্যবসায়িক সনদ বাতিল করতে হবে। হয়রানির বন্ধ হলে মনুষ এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহী হবেন।

আবাসন ব্যবসায়ের উন্নয়নের জন্য হাউসবিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের জন্য আবাসন খাতে ঋণ দেয়ার প্রধান উৎস এই সংস্থা। কর্পোরেশনের সরকার কর্তৃক পরিশোধিত মূলধন ১১০ কোটি টাকা। এছাড়াও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সরকারী গ্যারান্টির মাধ্যমে বাংলদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহের নিকট ডিভেঞ্চার বিক্রির মাধ্যমে কর্পোরেশন তহবিল সংগ্রহ করে থাকে। বর্তমানে কর্পোরেশনের স্থিতি প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। কিন্তু কর্পোরেশন থেকে ঋণ নেয়ার জটিলতার কারণে অনেকেই ফ্ল্যাট কিনতে পারছেন না। ঋণ জটিলতা সহজকরলে তা আবাসন ব্যবসায়কে মন্দার হাত থেকে রক্ষা করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এক্ষেত্রে সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে। এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন বলেছেন, গরিব-মধ্যবিত্ত লোকদের জন্য অল্প সুদে ৫০ হাজার কোটি টাকার আবাসন ঋণ তহবিলের ব্যবস্থা করা এবং ঋণ পরিশোধের জন্য ২০-৩০ বছর সুযোগ দিয়ে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত। সৃষ্টি হবে এবং ভবিষ্যতে এটি দেশের অর্থনীতিতে আরও বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।

প্রকাশিত : ২৮ জুন ২০১৫

২৮/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: