মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আলাপন ॥ পিতার মতো নামী হতে চেয়েছিলাম

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫
  • মুর্তজা বশীর

যে বই বার বার পড়তে ইচ্ছা করে?

আসলে কোন বই বার বার পড়তে ইচ্ছা করে না। তবে বেদ পড়েছি বার বার প্রয়োজনেই। বৈদিক বিষয়ের সাহায্যার্থে ঋগে¦দ থেকে প্রতীক গ্রহণের জন্য এটার দ্বারস্থ হয়েছি। আবার কোরান থেকেও প্রতীক উপমা ব্যবহারের জন্য বার বার পড়তে হয়েছে।

ছোটবেলার কী স্বপ্ন ছিল?

পিতার মতো নামী ব্যক্তি হতে চেয়েছিলাম। এখনও অনুসরণ করি তাঁকে।

চিত্রশিল্পী না হলে কী হতেন?

সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতি করতাম কিংবা ছবি বানাতাম। সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতি করব বলেই ছাত্রজীবনে প্রগতিশীল বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। ওই বয়সেই জেল খাটতে হয়েছে আমাকে।

নিজের যে সৃষ্টিকর্ম আপনাকে বেশি আনন্দ দিয়েছে?

আসলে আনন্দের কি আর শেষ আছে? সৃষ্টিশীল মানুষের আনন্দ না থাকলে তো তার সৃষ্টিকর্মই সৃষ্টি হবে না। সব চিত্রকর্মই আমার সন্তানের মতো। সবগুলোকে সৃষ্টি করতে পেরে আনন্দিত হয়েছি। তবে মনে বেশি রেখাপাত করে শহীদ শিরোনাম ও প্রজাপতি সিরিজ।

নিজের যে সৃষ্টিকর্ম বিষণ্ণ করে?

নিজের কোন সৃষ্টিকর্মই আমাকে বিষণœ করে না।

রবীন্দ্রনাথ আপনার কাছে...

আমাদের জাতিসত্তার জন্য তাঁর কাছেই বার বার ফিরে যেতে হয়েছে। আমি জানি বা অনুভব করি তিনি সর্বগ্রাসী। তবুও কোথায় যেন শ্রেণীচিন্তাগত দিক থেকে একটু দূরত্ব রয়েই গেছে। আমি তো সর্বহারা মানুষের মুক্তির দর্শনে বিশ্বাসী। তবুও তিনি আমার প্রিয় মানুষ।

প্রথম ভালবাসার কথা জানতে চাই-

প্রথম ভালবাসা ছিল ঘর পালানোর সঙ্গে। ঘর পালিয়ে যে আনন্দ পেয়েছিলাম তা আজও ভুলিনি।

নদীর কাছে গেলে কেমন অনুভূতি হয়?

নদীর কাছে গেলে মনটা আনমনা হয়ে যায়। সৃষ্টির রূপবৈচিত্র্যের কথা মনে পড়ে। ভেতরে জেগে ওঠে কবিসত্তা। সে কবিতা আঁকা হয় রঙ-তুলির মাধ্যমে ক্যানভাসে।

বিদেশে শিক্ষাগ্রহণকালীন মারিয়ার প্রেমে পড়েছিলেন।

ইতালিতে যখন পড়তে যাই তখন সম্পর্ক গড়ে ওঠে একাডেমির সহপাঠিনী মারিয়ার সঙ্গে। মিরা বলেও তাকে ডাকা হতো। সমস্যা হলো আমি জানি না ইতালিয়ান ভাষা, ও জানে না ইংরেজী। ওর দুর্বলতা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু নিজেকে সব সময় গুটিয়ে রাখি। একে তো আমি বেঁটে মানুষ তদুপরি গায়ের রং অনুজ্জ্বল। ও তো সুন্দরী আর গায়ের রং দুধেআলতা। তাতে কী? এতকিছুর পরেও কখন যেন আমরা কাছে চলে আসি। আমার দ্বিধা কেটে যায় ওর উদারতায়। ভাষা কোনো সমস্যা হয়নি। হৃদয়ের ভাষা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম। এসেছিলাম অনেক কাছে। কিন্তু বাধ্য হয়ে এক সময় দেশে ফিরলাম এবং অন্য মেয়েকে বিয়ে করলাম। বিয়ের পর বাসর রাতে মারিয়ার ছবি বউকে দেখিয়েছিলাম। যদিও কাজটি ঠিক হয়নি।

আপনার প্রথম সাহিত্যচর্চা সম্পর্কে জানতে চাই-

ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৫২ সালে লিখেছিলাম প্রথম কবিতা ‘পারবে না’ শিরোনামে। ছাপা হয়েছিল ‘পরিচয়’ পত্রিকায়। আর গল্প লিখেছিলাম ‘পার্কের একটি পরিবার’ নামে দৈনিক সংবাদের ঈদ সংখ্যায়। এরপর কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ ও গল্পের বই ছাড়াও আছে আত্মজীবনী। উপন্যাসও আছে।

যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে কিছু বলুন।

এ বিষয়ে আর কী বলার আছে? আরও আগে হলে বেশি খুশি হতাম। দীর্ঘ আন্দোলনের আমিও তো সহযাত্রী। সান্ত¡না এটুকু জীবদ্দশায় দেখে যেতে পারলাম এর বিচার ও কিছু দণ্ড কার্যকরের।

এখন কী কাজ করছেন?

এখন প্রজাপতি সিরিজ নিয়ে আরও কাজ করব ভাবছি। সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি।

আপনার যে স্বপ্নটি পূরণ হয়নি?

আমার কোন স্বপ্ন অপূর্ণ থাকেনি। কোন খেদ বা আফসোসও নেই।

যে আশা পোষণ করেন ৮২ বছর পেরিয়ে?

এখনও স্বপ্ন দেখি এ দেশের খেটে খাওয়া নিরন্ন মানুষই সমাজ বদলে দেবে। কায়েম করবে কৃষক-শ্রমিকরাজ। সমাজ থেকে ওরা মুছে ফেলবে বৈষম্য। বুর্জোয়া সমাজ ভেঙ্গে প্রতিষ্ঠা করবে সাম্যবাদের চেতনা। আমার কামনা- ওদের হাতেই যেন হয় আমার মৃত্যু। কেননা ওদের দৃষ্টিতে আমিও বুর্জোয়া গোত্রের। বিপ্লব আসবেই!

যা সবচেয়ে বেশি অপছন্দ?

হিপোক্রেসি। আমি খোলা মনের মানুষ। সৎ ও সরল। মুখে এক রকম আর অন্তরে আরেক রকম ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আমি ঘৃণা করি। আমি সব সময় খোলাখুলি বলতে পছন্দ করি।

একদিনের সরকারপ্রধান হলে কী করতেন?

আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি না। আর একদিনের সরকারপ্রধান একটা অলীক ব্যাপার। গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল দিয়ে লাভ নেই। আমি বাস্তবতায় বিশ্বাসী।

পৃথিবীর বাইরে কোন বাসযোগ্য গ্রহে কিছুদিনের জন্য বসবাসের সুযোগ পেলে সঙ্গে কোন তিনটি জিনিস নেবেন?

আসলে বাসযোগ্য ব্যাপারটি আমার কাছে আপেক্ষিক। অন্যের জন্য বাসযোগ্য হলেও আমার জন্য না-ও হতে পারে। প্রশ্নটা বেশ কঠিন। ভিনগ্রহে গেলে কলম, ডায়েরি আর ছবি আঁকার প্যাড নেব। কেননা নিঃসঙ্গতা কাটাতে হবে তো?

যে স্মৃতি ভোলা যায় না?

বাল্যকাল, শৈশবের স্মৃতি ভোলা যায় না। ওই সময়টা ছিল সবচেয়ে নিষ্কলুষ, মধুর। যেন আকাশ থেকে ঝরে পড়া পবিত্র বৃষ্টির জল। বর্তমান জীবনটা জটিল সে সময়কার জীবন ছিল সরল, যেজন্য বাল্যকাল বা শৈশবের কোনকিছুই ভোলা যায় না।

কথোপকথন : সিরাজুল এহসান

প্রকাশিত : ২৬ জুন ২০১৫

২৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: