আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাঙালীর চলচ্চিত্র মৃত্তিকা মায়া

প্রকাশিত : ২৫ জুন ২০১৫
  • অপূর্ব কুমার কুণ্ডু

পৃথিবীতে যত দেশ আছে সব দেশে কম-বেশি মাটি আছে। মাটির আবার প্রকারভেদ আছে যেমন- দোঁআশ মাটি, এঁটেল মাটি কিংবা বেলে মাটি। মাটি মানেই মৃত্তিকা না যেমন মাটি মানেই ধরিত্রী না। ধরিত্রী মাটি, জল, আগুন, মরু এবং বায়ুর পঞ্চ উপাদানের সংমিশ্রণ। কোন একটি উপাদানকে অস্বীকার করে যেমন ধরিত্রীকে স্বীকার করা যায় না ঠিক তেমনি উন্নত দেশ পরিবেশের অত্যাধিক দূষণের কারণ বলে উন্নয়নশীল দেশের করণীয় কাজকে উপেক্ষা করা চলে না। প্রকৃত পক্ষে প্রতিটি দেশ এবং দেশবাসীর দায়িত্ব তাদের স্বকীয়তাকে অক্ষুণœ রেখে-বাঁচিয়ে রেখে সমাগ্রিক ধরিত্রীকে বাঁচিয়ে রাখা। আর এই বাঁচিয়ে রাখা ধরিত্রীকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলার দৃপ্ত প্রত্যয়ে বিন্দুর মধ্যে দিয়ে সিন্ধু দর্শনের দেশপ্রেম চলচ্চিত্র গাজী রাকায়েতের ‘মৃত্তিকা মায়া’। অস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ যেমন মুসলিম সত্তা নিয়ে ইউরোপের মধ্যে বেড়ে ওঠা বসনিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে ঠিক তেমনি মৃত্তিকা মায়া বাংলাদেশের বাঙালীর বাঙালিত্বের প্রতিনিধিত্ব করে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক অনুদানে নির্মিত, পরিচালক গাজী রাকায়েতের কাহিনী চিত্রনাট্য ও পরিচালনায় পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘মৃত্তিকা মায়া’ সম্প্রতি প্রদর্শীত হলো বাংলাদেশ শিল্পকলা একডেমির চিত্রশালার মূল অডিটোরিয়ামে মুভিয়ানা ও শিল্পকলা একাডেমির যৌথ আয়োজনে নতুন নির্মাতা নতুন চলচ্চিত্র শিরোনামের চলচ্চিত্র উৎসবে।

উৎসবে প্রদর্শীত মৃত্তিকা মায়া চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় বিষয় কুমোর জীবন তথা মাটি দিয়ে তৈরি শিল্পের কারিগরদের জীবন। মূল কারিগর নিমাই চন্দ্র পাল (রাইসুল ইসলাম আসাদ) যার শৈশব থেকে ক্ষীর প্রীতির কারণে সকলের কাছে ক্ষীর মোহন পাল নামে পরিচিতি পাইয়ে দিয়েছে। বার্ধক্যের করণে ক্ষীর মোহন পাল আজ মাটি ছেনে মাটির কলসি, হাঁড়ি-পাতিল বানাতে অক্ষম। মাটির আসবাব তৈরি আর মেলার বটবৃক্ষকে আঁকড়ে থাকা তারা যাপিত জীবন। হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি বাট্টা বন্ধ থাকার কালেও দুটো অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থার জন্যে বট গাছটাকে বিক্রির সুযোগেও যখন বেচল না ক্ষীর মোহন পাল তখন একদিন সন্তানদের বঞ্চনা সহ্য করতে না পেরে স্বামীর ওপর অভিমানে ওই বটবৃক্ষের ডালে গলায় দড়ি দিল তার স্ত্রী। সময়ের পরিক্রমায় ক্ষীর মোহনের দুই ছেলে আজ গ্রাম ছেড়ে ঢাকার বাসিন্দা। একজন ব্যাংকের কেরানি অপরজন শাখারীবাজারের কর্মী। ছেলেরা বাবার পেশাকে তাচ্ছিল্যভাবে ছুড়ে দিলেও দেয়নি বটতলায় বৈশাখী মাসে কুড়িয়ে পাওয়া কুল পরিচয় হীন পালিত পুত্র বৈশাখ (তিতাস জিয়া) । বৈশাখের মানুসিক নির্ভরতা ক্ষীর মোহন পালের পালিত এতিম নাতনি পদ্ম (শর্মীমালা)। পদ্মের ভাসান হয় বৈশাখের জাত-পাতের টানা পোড়েনে। ক্ষীর মোহন, পদ্মকে বৈশাখের কাছ থেকে বঞ্চিত করলেও তার মৃত্যুর কালে জায়গা-জমি, সহায়-সম্পত্তি এবং বটবৃক্ষ দিয়ে যায় বৈশাখকে। ঐতিহ্য আঁকড়ে ধরতে যেয়ে সমসাময়িক কুটিলতার আগ্রাসনে রক্তাক্ত-ক্ষত বিক্ষত বৈশাখের লড়াই আর লড়াইয়ের ময়দানে সহযোদ্ধাদের চিনে নেয়ার মধ্যে দিয়ে শেষ হয় চলচ্চিত্র মৃত্তিকা মায়া।

সব কথা বলার মায়া কাটিয়ে সংক্ষিপ্ত করণ করলে পরিচালক গাজী রাকায়েতের পরিচালনায় কয়েকটি বিষয় সুনির্দিষ্ট। যে কোন অবস্থায় স্বদেশী বৈশিষ্ট্য ধরে থাকা (কুমোরের চরকা ঘুরবে প্রসঙ্গ)। আগ্রাসনের হাত থেকে আপন ঐতিহ্যের সুরক্ষা (বট গাছ কাটা হলে মেলা বন্ধ হয়ে যাবে প্রসঙ্গ)। করণীয় ফেলে কর্তা হবার ফাঁদে পা না রাখা (যারা ডাক দেয় আর ডাক হুনে যারা আয় তাদের সবাইরে এক পাল্লায় না মাপা প্রসঙ্গ)। আধুনিকতার ছোবলে ঐতিহ্যের বিলুপ্তি মেনে না নেয়ার প্রত্যয় (কুমার চাইলে ভাস্কর হতে পারে কিন্তু ভাস্কর মানেই কুমার না প্রসঙ্গে)। মৃত্তিকার টানে ঘরে ফেরার যাত্রীদলে পঞ্চ উপকরণের মতো সকলের অংশগ্রহণের আহ্বান (সাইদুর রহমান ভাস্কর, জশার সঙ্গিনী প্রসঙ্গ)। নির্মাণের পথ পরিক্রমায় গাজী রাকায়েতের কাহিনী, কাব্যের অবকাঠামোয় মহাকাব্যিক বিষয়বস্তুর পরিবেশনা। চিত্রনাট্যে সমাপ্তি অংশে বৈশাখের আতঙ্কিত স্বপ্ন দেখাটা নিখুঁত চিত্রায়ন ছাড়া সকল চিত্রকল্প প্রাসঙ্গিক। সংলাপে ভাস্কর এবং কুমোরের কথোপকথন আরোপিত কেননা পাঠশালা বিমুখ গ্রাম্য কুমোরের ইউরোপ জানবার কথা নয়। তবে অন্যান্য সংলাপ পরিচালকের স্বতন্ত্রতাকে চিনিয়ে দেয়। সাইফুল ইসলাম বাদলের চিত্রগ্রহণে পা-িত্য অপেক্ষা প্রাজ্ঞতাই প্রকাশ প্রায়। অবস্থার যথাযথ চিত্রায়ন। শরিফুল ইসলাম রাসেলের সম্পাদনায় মাঝে মাঝে অধৈর্যের পরিচয়। হেলিকপ্টার সরাসরি ল্যান্ড করে কিন্তু বিমানকে ল্যান্ডের আগে কিছুক্ষণ দৌড়াতে হয়। দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে যেতে হঠাৎ কাট না হয়ে ডিজলতে যাওয়াই ভাল। শিল্প নিদের্শনায় উত্তম গুহ কল্পনা বাস্তবায়নে সফল। কাজী সেলিমের শব্দ গ্রহণে শব্দের মন্তাজ পাওয়া যায়।

চব্বিশটি ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচিত্র পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়ায় সতেরটি পুরস্কার লাভ করেছে মৃত্তিকা মায়া। অভিনয়ের বিভিন্ন ক্যাটাগরিতেও পুরস্কার। বৈশাখ চরিত্রে তিতাস জিয়ার বিষয়ের প্রতি নিমগ্মতা, পদ্ম চরিত্রে শর্মীমালার অঙ্গিকগত ঢেউ তোলা, ক্ষীর মোহন পাল চরিত্রে রাইসুল ইসলাম আসাদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা, জশা চরিত্রে লুৎফর রহমান জর্জের সংক্ষিপ্ত কিন্তু বর্ণিল রঙ্গের অভিনয় বিচ্ছুরণ, জশার সঙ্গিনী চরিত্রে অর্পনা ঘোষের মাঝে মধ্যেই নিরীহের সাহারা দাত্রী অবয়ব, নিখিল চরিত্রে আমিনুর রহমান মুকুলের প্রাণবন্ত অভিনয় চলচ্চিত্রটির গতিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে। অত্যাধিক পুরস্কারে পুরস্কৃত পরিচালক গাজী রাকায়েতের কাছে নিবেদন, ঝড়ে গাছ পড়লে গুনিনের কেরামতি বাড়ে। প্রকৃত গুনিন সেই যার প্রতিটি নিশানাই নির্দিষ্ট লক্ষ্য ভেদ করে। এবার পরীক্ষা, ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রাখা কারণ মৃত্তিকা মায়ার চরকার মতোই সেলোলয়েডের চাকা বন্ধ হওয়ার নয়।

প্রকাশিত : ২৫ জুন ২০১৫

২৫/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: