আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মুস্তাফিজ- বাঘের গর্জন

প্রকাশিত : ২৪ জুন ২০১৫

হতচকিত ভাবটা এখনও কাটেনি। বারবার নিজেদের শরীরে চিমটি কাটার পরও বুকের ভেতর দানা বাঁধা অবিশ্বাস মিলিয়ে যাচ্ছে না কোনভাবেই। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জন্য এ যেন আলাদিনের চেরাগ। সাতক্ষীরা থেকে আচমকা উড়ে এসে যেন বিশ্বসেরা ভারতীয় ব্যাটিং লাইনআপে জুড়ে বসলেন সাঁড়াশির মতো। অভিষেক ম্যাচ এবং পরের ম্যাচ মিলিয়ে ভারতীয় ব্যাটিংয়ে বাঘের থাবায় যেভাবে আঁচড় কেটে ক্ষতবিক্ষত করেছেন তা কস্মিনকালেও কোন বোলার করে দেখাতে পারেননি। মুস্তাফিজুর রহমান অভিষেকে ৫ এবং ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ম্যাচে নিয়েছেন ৬ উইকেট। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ম্যাচে আর কোন বোলারই এমন নৈপুণ্য দেখাতে পারেননি। ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ম্যাচেই টানা ৫ উইকেট শিকার এর আগে করেছিলেন জিম্বাবুইয়ের ব্রায়ান ভিটোরি। তিনি দুই ম্যাচে নিতে পেরেছিলেন ১০ উইকেট। তাই ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ম্যাচের নৈপুণ্যে সবাইকে ছাড়িয়ে নতুন এক ঘটনার জন্ম দিলেন মুস্তাফিজ।

মুস্তাফিজ কোথা থেকে এলেন? প্রথম ওয়ানডেতে স্কোয়াড ঘোষণার পর বাংলাদেশ দলে চারজন পেসারের নাম দেখে কিছুটা অবাক হয়েছিল বৈকি ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট। তবে চার নম্বর পেসার হিসেবে একেবারে অচেনা, অজানা মুস্তাফিজুরের নাম দেখেও সেদিকে বিন্দুমাত্র মনোযোগ দেয়নি ভারত। কিন্তু বাংলাদেশ ইনিংস শেষ করার পর ভারতীয় ইনিংসের শুরুতেই বোলিং প্রান্তে কে ওটা? বারবার চোখ রগড়াতে লাগলেন রোহিত শর্মা ও শিখর ধাওয়ান। ভূত দেখার মতোই চমকে উঠেছে ‘হোম অব ক্রিকেটে’ আগত দর্শক-সমর্থকরাও। কারণ বল হাতে প্রথম ওভারেই এসেছেন ১৯ বছর বয়সী অচেনা মুস্তাফিজ। বিমূঢ়তা কাটার আগেই টানা ৬ বলে একের পর এক সুইং, সেøায়ার আর কাটারে গতবিহ্বল করে দিলেন তিনি ওয়ানডে ক্রিকেটে দুটি ডাবল সেঞ্চুরির বিস্ময়কর অধিকারী রোহিত। প্রথম বলেই তাঁর বিরুদ্ধে এলবিডব্লিউ’র জোর আবেদন তুলে স্টেডিয়াম এলাকায় গুঞ্জন তুলে দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই গুঞ্জনটা প্রকম্পিত চিৎকারে পরিণত হলো ম্যাচ শেষ হওয়ার খানিক আগেই। কারণ অভিষেক ম্যাচেই ৫০ রানে ৫ উইকেট শিকার করে ভারতীয় ব্যাটিংয়ে ধ্বংস ডেকে এনেছেন মুস্তাফিজ। তরুণ এ রোগা-পলকা ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি দীর্ঘের সদ্য কৈশোর পেরোনে শরীরে অনেক তেজ লুকনো আছে। চোখে আগুন না জ্বললেও সুপ্ত আছে টগবগে লাভার আগ্নেয়গিরি। তা বেশ ভালভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন ভারতীয় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি। কারণ ততক্ষণে মুস্তাফিজ ফিরিয়ে দিয়েছেন রোহিত ও রাহানেকে। দারুণ অবস্থানে থাকা ভারতকে হঠাৎ হামলে পড়ে বিপর্যয়ের স্রোত দিয়ে ভেসে নিয়ে যাচ্ছিলেন অতলে। তাই আর মেজাজটা ঠিক রাখতে পারেননি অধিনায়ক ধোনি। রান নিতে গিয়ে মুস্তাফিজের তলপেটে ইচ্ছাকৃতভাবে কনুইয়ের ধাক্কা দিয়েছিলেন। আহত হয়ে কিছুক্ষণের জন্য মাঠের বাইরে যাওয়া সাতক্ষীরার নবীন এ পেসার ফিরে আরও রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিলেন।

আসলে প্রতিটি ম্যাচেই জিততে হলে কিছু কৌশল খাটাতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সেটা একের পর খাটিয়ে প্রতিপক্ষকে গোলক-ধাঁধায় ফেলে দিচ্ছেন বাংলাদেশের কোচ চান্দিকা হাতুরাসিংহে। তাঁর সঙ্গে প্রতিপক্ষের জন্য ইন্দ্রজাল তৈরির পেছনে বেশ ভালভাবেই যোগ দিচ্ছেন অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। ভারতীয় দলের পেস দুর্বলতা অনেক অতীতকাল থেকেই পরীক্ষিত সত্য। আর অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশ সমৃদ্ধ বাঁ-হাতি স্পিনারে। যে কোন প্রতিপক্ষই বাংলাদেশের মুখোমুখি হওয়ার আগে হিসেব কষে এ দেশের বাঁহাতি স্পিনারদের মোকাবেলার। পরিকল্পনা করে সেভাবেই। কিন্তু সময় বদলেছে। ওই বিষয়টির জন্যই মাশরাফি এবার স্কোয়াডে থাকা একমাত্র স্পিনার আরাফাত সানিকে একাদশের বাইরে রাখলেন। কারণ মুস্তাফিজকে খেলাতেই হবে। ভারতকে ভড়কে দেয়ার মোক্ষম অস্ত্র হতে পারেন তিনিই। কারণ ভারতীয় দল পরিকল্পনা করেছে বিশ্বকাপে ঝড় তোলা রুবেল হোসেন, অতীতে অনেকবার অসুবিধায় ফেলা মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং গত বছর জুনে অভিষেক ম্যাচেই ভারতকে বিপাকে ফেলা তাসকিন আহমেদকে নিয়ে। আর সে সুযোগটাই নিয়েছেন মাশরাফি। ভারতকে চমকে দেয়ার জন্য ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করেছেন তরুণ মুস্তাফিজকে। এ বিষয়ে প্রথম ওয়ানডে শেষে মাশরাফি নিজেই বললেন, ‘আরাফাত সানি খুব ভাল বোলিং করছিল। ওকে বাদ দেয়া কঠিন ছিল। কিন্তু আমরা মনে করেছিলাম, মুস্তাফিজকে খেলানো দরকার। অনুশীলনে ওকে যেমন দেখেছি, তাতে উপেক্ষা করা কঠিন ছিল। শেষ পর্যন্ত সাহস করে আমরা ওকে নিয়েছি। ফলও পেয়েছি। আসলেই ফরচুন ফেভারস দ্য ব্রেভ।’

কিন্তু কে এই মুস্তাফিজ? একই প্রশ্ন বছর দেড়েকের কিছু বেশি সময় আগে উদয় হয়েছিল ফারুকেরও মনে। কারণ দেশের ক্রিকেট কারিগর যাঁরা, যাঁরা ক্রিকেট বোদ্ধা তাঁরাও মুস্তাফিজকে তখন পর্যন্ত চিনতেন না। না চেনারই কথা। কারণ ২০১৩ সালে সাতক্ষীরা থেকে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে পেস বোলিংয়ে নিজের যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন। সেখানে বাছাই হয়ে অনুর্ধ-১৭ দলের হয়ে খেলেছেন। দ্রুতই জায়গা করে নিয়েছেন অনুর্ধ-১৯ দলে। এবার তিনি খেলেছেন জাতীয় লীগ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগেও। ততদিনে মুস্তাফিজকে ফারুকসহ দেশের ক্রিকেটের মাথারা চিনে ফেলেছেন এবং তাঁর ওপর আস্থা খুঁজে পেতেও শুরু করেছেন। এ কারণেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টি২০ ম্যাচে অভিষেক ঘটল মুস্তাফিজের। আর সেই ম্যাচেই তিনি শহীদ আফ্রিদির মতো বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ক্রিকেটারের উইকেটসহ দুটি উইকেট শিকার করলেন তখন থেকেই এ দেশের ক্রিকেট আবেগী মানুষ তাঁকে অন্তরে ঠাঁই দিলেন। দুই বছর আগে নিজ জেলা সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার তেঁতুলিয়া গ্রামের মানুষ ছাড়া আর কেউ চিনতেন না তাঁকে। কিন্তু ধূমকেতুর মতো উদয় ঘটল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। গত এপ্রিল থেকে দেশের ক্রিকেটভক্তরা একটু করে তাঁকে চিনতে শুরু করেছিলেন। তবে এখন তাঁকে সারাবিশ্ব চিনে ফেলেছে। সত্যিকার টাইগার ক্রিকেটার তিনি। উঠেও এসেছেন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসভূমি সুন্দরবনের খুব কাছের এলাকা থেকে। তাঁকে নাকি এমনিতেই সতীর্থরা ডাকেন ‘ছোট বাঘ’ বলে। সেই ছোট বাঘের কাছেই নতিস্বীকার করল ভারতীয় দল।

দ্বিতীয় ওয়ানডে শুরুর আগেই মুস্তাফিজকে চেনা হয়ে গেছে। টানা দু’দিনের বিরতিতে মুস্তাফিজের ভিডিও চিত্র গবেষণায় কাটিয়ে দিয়েছে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট। কিভাবে তাঁকে অকেজো করা যায়, কিভাবে তাঁর আক্রমণকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়া যায়। এ কারণে কোচ হাতুরাসিংহেও বলেছিলেন, ‘এবার তাঁর জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। আমরা দেখব মুস্তাফিজ দ্বিতীয় ম্যাচে কতটা ভাল করতে পারেন।’ কিন্তু কিছুতেই কিছু হলোনা। এবার আরও ভয়ঙ্কর ছোবল হানলেন মুস্তাফিজ। ৪৩ রানে শিকার করলেন ৬ উইকেট। মুস্তাফিজের আগে ওয়ানডে অভিষেকেই ৫ উইকেট শিকার করেছিলেন ইতিহাসে ৯ বোলার। এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফিদেল এডওয়ার্ডস নিয়েছিলেন ৬ উইকেট। কিংবদন্তি পেসাররা যা করতে পারেননি। ক্যারিয়ারে নিজের দ্বিতীয় ম্যাচে আবার ৫ উইকেট নিতে পেরেছিলেন শুধু জিম্বাবুইয়ের পেসার ভিটোরি। তিনি ২০১১ সালের আগস্টে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অভিষেক ও পরের ম্যাচে ৫টি করে উইকেট নিয়েছিলেন। কিন্তু মুস্তাফিজ তাঁকেও ছাড়িয়ে গেলেন। উঠলেন হিমালয় উচ্চতায়। গড়লেন বিশ্বরেকর্ড। কিন্তু মুস্তাফিজকে এভাবেই রাখতে হবে দীর্ঘদিন। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক বলেন, ‘মুস্তাফিজ খুব ভাল বোলিং করছেন। আমি মনে করি বেশি বেশি প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়ে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে এবং সহায়তা করতে হবে একইভাবে চলার জন্য। তিনি এখনও যথেষ্ট তরুণ। আমরা তাঁকে কিভাবে সামাল দেব সে বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। এখানে কোন জাদুকরী কৌশল নেই। শুধু নিশ্চিত করতে হবে সে যেন দীর্ঘসময় ধরে উচ্চপর্যায়ের অনুশীলন করে। তিনি ১১ উইকেট নিয়েছেন। কিন্তু আমরা সবসময় তাঁর কাছ থেকে ৫ উইকেট প্রত্যাশা করতে পারি না। আমরা যদি তাঁর প্রতি যতœবান হই এবং যথেষ্ট সমর্থন জোগাই তিনি আমাদের জন্য অনেক বড় ম্যাচ উইনার হয়ে উঠবেন।’

প্রকাশিত : ২৪ জুন ২০১৫

২৪/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: