কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নিজের চোখে দেখা অন্যের আলোয়

প্রকাশিত : ২২ জুন ২০১৫
  • আবু সুফিয়ান কবির

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে অন্ধত্ব নিবারণ সহজ থেকে সহজতর হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক গবেষণায় দেখা গেছে মানুষের মৃত্যুর পর তার দেহের সব অংশের মৃত্যু হয়। কিন্তু চোখ এমন একটি অংশ যা মানুষের মৃত্যুর পরও প্রায় ৬ ঘণ্টা সজাগ বা বেঁচে থাকে। চিকিৎসকরা এই ৬ ঘণ্টাকে বেছে নিয়েছেন একজন অন্ধ ব্যক্তির জীবনে আলো ফিরিয়ে আনতে। বিশে^র অনেক দেশে মৃত ব্যক্তির চোখের কর্নিয়া সংগ্রহ ও প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে বন্ধত্ব নিবারণ করলেও বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। আমরা সেবা সচেতনতার মাধ্যমেও অন্ধত্ব নিবারণে ভূমিকা রাখতে পারি। শিশু বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর প্রায় ২৬ বছর পর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া একজন অনুভূতি ব্যক্তি ছিলেন এভাবে। ‘প্রতিটি মানুষের কাছে সকালের সূর্য যেমন রক্তিম। আমার কাছে তার চেয়েও বেশি কিছু যেন এর স্পর্শটা আমি পাই।

বাংলাদেশে এই প্রথা চালু হয়েছে ১৯৮৪ সালে ২৫ নবেম্বর সন্ধানীর স্বেচ্ছায় চক্ষুদান কর্মসূচীর মাধ্যমে। সেই সময় প্রকৌশলী এনামুল হক প্রথম স্বেচ্ছায় চক্ষুদান করেন। তার একটি কর্নিয়া বিচিত্রা সম্পাদক ও সাপ্তাহিক ২০০০ এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরীর চোখে সংযোজন করা হয়। অপর চোখটি সংযোজন করা হয় একজন রিকশাচালকের চোখে। ড. এনামুল হকের এই মহৎ উদ্যোগ সেই সময় স্বেচ্ছায় চক্ষুদানকারীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করে। কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণে এই কর্মসূচী আশানররূপ সফল হতে পারেনি। সন্ধানী চক্ষু হাসপাতালের অফিস কর্মকর্তা কামাল আতাউর রহমানের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায় সন্ধানী তার ২৮ বছরের ইতিহাসে ৩৬ হাজার ৮৭ জন স্বেচ্ছায় চক্ষুদানের অঙ্গীকার করে। এই পর্যন্ত মোট ৩৫ হাজার ৯১টি কর্নিয়া সন্ধানী সংগ্রহ ও সংযোজন করে। কষ্ট ও বেদনার বিষয় এর মধ্যে অঙ্গীকারদাতাদের কাছ থেকে মাত্র ৮৪টি কর্নিয়া সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। অঙ্গীকার দাতাদের পক্ষে এত কমসংখ্যক কর্নিয়া সংগ্রহ হওয়ার কারণ সম্পর্কে কামাল আতাউর রহমান বলেন ‘অঙ্গীকার দাতাদের পরিবারের সদস্যরা সময় মতো সন্ধানীর মেডিক্যাল ইউনিটে খবর দেয় না তাই কর্নিয়া সংগ্রহ সম্ভব হয় না। বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী কলিম শরাফি অঙ্গীকার করার পরেও তিনি তাঁর কর্নিয়া দিয়ে যেতে পারেননি। কেননা পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ উদ্যোগ নেয়নি। এই বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে। মনে রাখতে হবে মৃত্যুর পর কর্নিয়াটি জীবন্ত থাকে প্রায় ৬ ঘণ্টা। একটি কর্নিয়ার বিনিময় একজন অন্ধ ব্যক্তি ফিরে পেতে পারে তার দৃষ্টিশক্তি। শিল্পী ও অভিনেত্রী শম্পা রেজা নিজেই তার বাবার মৃত্যুর পর সন্ধানীতে তার বাবার কর্নিয়া সংগ্রহের জন্য খবর দেয়। তাই অঙ্গীকারদাতা শুধু নয় সেইসঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সচেতন হতে হবে’। অন্যের কর্নিয়া সংযোজনের ফলে কর্নিয়া গ্রহণকারীর শরীরে কি দাতার কোন প্রভাব পড়ে। এই বিষয়ে কর্নিয়া গ্রহণকারী এক গৃহিণী বলছিলেন ‘আমার চোখ দিয়ে হয়ত আমি প্রকৃতিকে এত সুন্দরভাবে দেখতে পেতাম না। আমি শুধু দেখি না উপলব্ধি করতে পারি প্রকৃতির রঙ আর রূপ। আমার জানতে ইচ্ছে করে আমি কার কর্নিয়া নিয়েছিলাম। যার কারণে আমার এই উপলব্ধিক্ষমতা সৃষ্টি হয়েছে’।

মুকুল ছিলেন এক বাসার নাইট গার্ড। তিনি ২০০৯ সালের শেষদিকে একজন ডোনারের কর্নিয়া সংযোজন করেন। এখন ভালই দেখেন কিন্তু কয়েক মাস আগে থেকে তার মাথায় যন্ত্রণা হয়। তার ধারণা যে ব্যক্তির চোখের কর্নিয়া নিয়েছেন তার এই ধরনের মাথাব্যথা ছিল। তবে মাথার যন্ত্রণা নিয়েও সে সুখী কেননা সে এখন দেখতে পায়।

এই সম্পর্কে ডাঃ রেফাতউল্লাহ আই কেয়ার সেন্টারের চোখের ডাক্তার তানজিয়া আসমা জাফরুল্লাহ বলেনÑ কর্নিয়া গ্রহণকারীর শরীরে বা মনে এর দাতার চারিত্রিক বা অনুভূতির প্রভাব পড়ে কি না তা স্পষ্ট নয়। কেননা এই বিষয় তেমন কোন গবেষণা হয়নি। এখানে প্রধান বিষয় হচ্ছে দেখতে পাওয়াটা। এখানে অন্যকোন বিষয় কাজ করে বলে আমার মনে হয় না।

বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ অন্ধ হচ্ছে। কেউ কেউ দুর্ঘটনায় চোখের দৃষ্টি হারাচ্ছে। আপনি ইচ্ছা করলে অন্ধত্বের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন এক ব্যক্তিকে। চক্ষুদানের ক্ষেত্রে আপনার ইচ্ছাই যথেষ্ট। মনে রাখতে হবে আপনি একজন সমাজ সচেতন ব্যক্তি।

প্রকাশিত : ২২ জুন ২০১৫

২২/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: