মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

নিষিদ্ধ নজরুল ও যুগবাণী

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

“স্বাধীনতা হারাইয়া আমরা যখন আত্মশক্তিতে অবিশ্বাসী হইয়া পড়িলাম এবং আকাশমুখো হইয়া কোন অজানা পাষাণ দেবতাকে লক্ষ্য করিয়া কেবলি কান্না জুড়িয়া দিলাম; তখন কবির কণ্ঠে আকাশবাণী দৈববাণীর মতোই দিকে দিকে বিঘোষিত হইল, ‘গেছে দেশ দুঃখ নাই, আবার তোরা মানুষ হ।’ বাস্তুবিক আজ আমরা অধীন হইয়ছি বলিয়া চিরকালই যে অধীন হইয়া থাকিব, এরূপ কোন কথা নাই। কাহাকেও কেহ কখনও চিরদিন অধীন করিয়া রাখিতে পারে নাই ইহা প্রকৃতির নিয়ম বিরুদ্ধ” (যুগবাণী : নজরুল)। অধীনতা মেনে নেয়া নজরুল জীবনে ছিল অকল্পনীয়। বাল্য থেকেই স্বাধীনচেতা মনোভাব তাঁকে সাহসী, ব্রতী, সংগ্রামী, লড়াকু, দৃঢ় মনোবলের অধিকারী করেছে। জন্মেছিলেন পরাধীন দেশে। উপনিবেশ শাসনের ভেতর দেখেছেন শোষিত, বঞ্চিত পরাধীন এক জাতিকে। এক আত্মগরিমাহীন জাতি ক্ষয়িষ্ণু, দারিদ্র্য আর অশিক্ষা, কুসংস্কারে তলিয়ে যাচ্ছে। ১৮৯৯ সালে রাঢ়বঙ্গে জন্ম নেয়া কাজী নজরুল ইসলাম শৈশবেই মুখোমুখি হয়েছেন দারিদ্র্যের। নামতে হয়েছে রোজগারে। শিশু শ্রমিক থেকে কিশোর শ্রমিক জীবনের মাঝে শিক্ষার আগ্রহ থেকে দূরবর্তী হননি। দশম শ্রেণীর ছাত্র যখন, তখনই স্বাধীনচেতা নজরুল পথ খুঁজে নিলেন। সৈনিকের খাতায় নাম লেখালেন সশস্ত্র পথে দেশমাতার স্বাধীনতা অর্জনের স্বপ্নে তখন টগবগে।

পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন নজরুল। আর এই চাওয়াটা তার পুরো জীবন ধরেই ছিল। নজরুল মূলত চেয়েছিলেন স্বাধীনতা, স্বরাজ নয়। বলেছেন, “স্বরাজ- টরাজ বুঝি না, কেন না ও কথাটার মানে এক- এক মহরাথী এক-এক রকম করে থাকেন, ভারতবর্ষের এক-পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীনে থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভারÑ সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোন বিদেশীদের মোড়লীর অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। ... আমাদের এই প্রার্থনা করার ভিক্ষা করার, কুবুদ্ধিটুকু ছাড়তে হবে।” স্বাধীনতা প্রাপ্তির যে কোন সক্রিয় পথের শরিক হতে নজরুল পা বাড়িয়েছেন সব সময়। সৈনিক হিসেবে যুদ্ধে যাওয়ার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বয়স যখন তার ১৮, তখন তিনি প্রথম মহাযুদ্ধের সৈনিক। স্বপ্ন তখন তাঁকে হয়ত আলোড়িত করেছে, দেশ ও জাতির মুক্তির জন্য। সে পথ সশস্ত্র হতে পারে। কারণ যখন তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, দেশজুড়ে তখন স্বদেশী আন্দোলনের জোয়ার। সশস্ত্র সংগঠনও গড়ে উঠেছে বাংলায়। আবার এই নজরুলই গান্ধীবাদকেও অভিনন্দন জানিয়েছেন। পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদকেও করেছেন অভিনন্দিত। আবার যখন গণজাগরণের সাম্যবাদ এসেছে, সেও হয়েছে কবিরও নান্দীপাঠ।

নজরুলের ক্ষুধা ছিল সামগ্রিক ক্ষুধা অর্থাৎ সমাজের সকল স্তরে মানুষের স্বাধীনতা। মানুষে মানুষে বৈষম্যও তাঁকে পীড়িত করেছিল। আসলে নজরুলের দেশপ্রেম দুর্দম, তার নিজের মতোই অন্য কারও সঙ্গে তা তুলনীয় নয়। তাঁর কোন দলের জ্ঞান ছিল, এমন নয়। সকলকে সমান অধিকারে স্বাধীন মানব হিসেবে দেখার উদগ্র বাসনা এবং তাদের সঙ্গে গলাগলি হয়েই সেই স্বাধীনতা অর্জন করতে চেয়েছিলেন তিনি। নজরুলের কাজে প্রাপ্তিই ছিল পরম চাওয়া। পথ বা পদ্ধতি নিয়ে টানাপোড়েন তেমন দেখা দেয়নি। যে পথেই হোক স্বাধীনতা চাই। এই একগুঁয়ে মনোভাব ছিল তীব্র। তাই গান্ধীর ডাকে চরকাও ঘুরিয়েছেন। কারার ওই লৌহ কপাট ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছেন। জগতের লাঞ্ছিত নিপীড়িত মানুষের উত্থানের গান গেয়েছেন। শোষণ, শাসন, ত্রাসনের বিরুদ্ধে হাত উজাড় করে গদ্য পদ্য লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যে নজরুলই প্রথম কবি, যিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন, নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো জনমত গঠনে। আর এতেও ছিল তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক কর্মী এবং সাংবাদিক নজরুলের চেয়ে সৃজনশীল সৃষ্টিশীল কবি হিসেবে ছিলেন আরও উঁচুস্তরের। কিন্তু রাজনীতি ও সাংবাদিকতাÑ এ দুটো মাধ্যমই ছিল তাঁর উপনিবেশিকতার বিপরীতে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন এবং সাম্যবাদী ধারায় দেশ পরিচালনার স্বপ্ন। যুগের হাওয়ায় নজরুল ইসলাম নিজেকে মেলে ধরেছিলেন। একাই নিজের বাণী বহন করেছেন। নিজস্ব চিন্তা, চেতনা, ভাবনাকে সামনে এগিয়ে নিতে একাই লড়েছেন, অদম্য সাহসে। সাহস তাঁর সঞ্চিত হয়েছিল বাল্যকালে, যখন অজস্র জনতার উপস্থিতিতে বাল্যবয়সে লেটো দলে গান গাইতেন। গানবাঁধা, সুর দেয়ার কাজটি তখন থেকেই শুরু। আর এই গান গাওয়ার সুবাদে সমাজ চেতনা, জনজীবনের দুঃখ-কষ্ট, হাসি-কান্নাকে আত্মস্থ করার প্রক্রিয়ারও শুরু তখন।

১৯১৪-১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে ইংরেজ আর জার্মানির মধ্যে। ইংরেজদের পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশ থেকে যুবশক্তিকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ শুরু হয়। ইংরেজ শাসকরা বাংলার দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার টানিয়ে দেয় সেনাবাহিনীতে যোগদানের আহ্বান জানিয়ে। পোস্টারে উল্লেখ করাা হয়, “কে বলে বাঙালী যোদ্ধা নয়? কে বলে বাঙালী ভিতুর জাতি? এই কলঙ্ক মোচন করা অবশ্য কর্তব্য। আর তা পারবে একমাত্র বাংলার যুবশক্তি। ঝাঁপিয়ে পড় সিংহবিক্রমে। বাঙালী পল্টনে যুব শক্তি।” আঠারো বছরের নজরুল উদ্বুদ্ধ হলেন। দেশকে স্বাধীন করতে হলে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ থাকা প্রয়োজন- এই ভাবনা তাকে এমনই আলোড়িত করল যে, দশম শ্রেণীর মেধাবী ছাত্রটি আসন্ন ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশ না নিয়ে চলে গেলেন বাঙালী পল্টনে। ঊনপঞ্চাশ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দিয়ে চলে গেলেন পেশোয়ারে প্রশিক্ষণে। প্রশিক্ষণ শেষে মেসোপটেমিয়া যুদ্ধে ইংরেজ সৈন্যের পক্ষে লড়াই করার জন্য করাচীর সেনা ছাউনিতে শুরু হলো অপেক্ষমাণ জীবন। এখানে কর্মকুশলতায় পদোন্নতি পেয়ে হয়ে গেলেন হাবিলদার নজরুল। কিন্তু সৈনিক জীবনের কঠোর নিয়মানুবর্তীতায় হাঁফিয়ে ওঠেন দুর্দম্য স্বাধীনচেতা নজরুল। তবু সেখানেই পেয়ে গেলেন শিক্ষা-সংস্কৃতির এক নতুন দিগন্ত। ফারসী, উর্দু, হিন্দী ভাষাটা রপ্ত হয়ে যায় এ সময়। ওমর খৈয়াম, হাফিজের কাব্য মূল ফারসীতে পাঠের আনন্দ তাঁর কবিসত্তাকে আলোড়িত করে। করাচীতেই শুরু হয় তাঁর নতুন করে কাব্যচর্চা। সঙ্গে সঙ্গে গল্প, উপন্যাস রচনার কাজে হাত দেন। কলকাতার কাগজে কবিতা ছাপা শুরু হয়। ১৯১৯ সালে মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে বাঙালী সেনাদের প্রয়োজন ফুরায়। ১৯২০ সালে বাঙালী পল্টন ভেঙ্গে দেয়া হয়। সৈনিকদের বিভিন্ন পদে চাকরি দেয়া হয়। কিন্তু চাকরি পেয়েও নজরুলের আর যোগ দেয়া হয়নি। কলকাতায় বন্ধু মুজফফর আহমদের সাহচর্য তাঁকে দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার পক্ষে সংগ্রামের লড়াকু সৈনিক করে তোলে। দেশমাতৃকার মুক্তির আকাক্সক্ষা হয়ে ওঠে তীব্র। দু’জনেই রাজনীতি করার ব্রত নিয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন সংবাদপত্র প্রকাশের। এবং তা সান্ধ্য দৈনিক। শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের অর্থায়নে নজরুল ও মুজফফর আহমদের যৌথ সম্পাদনায় ১৯২০ সালের ১২ জুলাই ‘নবযুগ’ বাজারে এলো। প্রথম সংখ্যা থেকেই তা পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠে। সাংবাদিকতার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা নজরুল তখন একুশ বছর বয়সী। নিজের সহজাত তীক্ষè মেধা, কাব্যরুচি, রাজনৈতিক বোধ এবং প্রখর কা- ও নীতিজ্ঞান তাঁকে সাংবাদিক হিসেবে সামনে আসার পথ তৈরি করে দেয়। দৈনিক পত্রিকায় লেখার অভিজ্ঞতা না থাকা এই দু’জনে তখন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। নজরুল বড় বড় প্রতিবেদনগুলো সম্পাদনা শুধু নয়, সংক্ষিপ্তাকারে নিজের ভাষায় লিখতেন। পত্রিকায় শিরোনাম দিতেন বিদ্যাপতি, চ-ীদাস, রবীন্দ্রনাথের কবিতা দিয়েও।

নবযুগ পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণ নজরুলের রচনা। স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর কলম তখন জোরালো। তাঁর লেখার জন্যই ব্রিটিশ সরকার ‘নবযুগ’ প্রকাশক ফজলুল হককে সতর্ক করে দিয়েছিল বার তিনেক। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই যাঁদের লক্ষ্য, তাঁরা থেমে থাকবেন কেন। নজরুলের একটি জ্বালাময়ী প্রবন্ধের কারণে সরকার পত্রিকার জামানত এক হাজার টাকা বাজেয়াপ্ত করেছিল। নতুন করে অনুমতি পেতে ২ হাজার টাকা জমা দিয়ে আবার ‘নবযুগ’ প্রকাশ করা হলেও তাঁরা তা বেশিদিন চালাননি।

সাত মাস পর ১৯২১ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁরা নিজেরাই পত্রিকা ছেড়ে দেন। অবশ্য পরে নতুন মালিকানায় ‘নবুযগ’ প্রকাশ হলে নজরুল তাতে যোগ দিয়েও বেশিদিন থাকেননি নীতিগত কারণে। নজরুল ততদিনে বিদ্রোহী কবি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা সম্বলিত ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে প্রকাশিত হয় ‘যুগবাণী’ নামক প্রবন্ধগ্রন্থ। ‘নবযুগ’ পত্রিকায় সাত মাসে প্রকাশিত সম্পাদকীয় ও অন্য নিবন্ধগুলো থেকে বাছাই করে ২১টি প্রবন্ধ নিয়ে প্রকাশ করেন ‘যুগবাণী’ সংকলন গ্রন্থ। নজরুল কবি হিসেবে পরিচিতির পাশাপাশি সাংবাদিক ও কলাম লেখক হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাঠক হৃদয় জয় করেছিলেন। তাঁর ক্ষুরধার কলম সাহস করে সেই সব কথাই বলেছে, যা নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, পরাধীন মানুষের অন্তরের কথা। তিনি তাদের মধ্যে জাগরণের মন্ত্র তুলে দিয়েছেন। যেসব লেখার কারণে ‘নবযুগ’ রাজরোষে পড়েছিল, সেসব লেখার সংকলন প্রকাশের কয়েকদিনের মধ্যে তা সরকার নিষিদ্ধ করে। বিস্ময়কর যে, এই নিষেধাজ্ঞা ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বহাল ছিল। নজরুলের প্রথম গদ্যগ্রন্থটিই শুধু বাজেয়াপ্ত হয়নি, তাঁর আরও দুটি প্রবন্ধগ্রন্থও পরবর্তীকালে বাজেয়াপ্ত হয়েছে। ‘রুদ্রমঙ্গল’ (১৯২৬) প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাজেয়াপ্ত হয়। এটিও দেশভাগের পর মুক্ত হয়। ১৯২৬ সালে প্রকাশিত অপর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘দুর্দিনের যাত্রী’রও একই ভাগ্য ঘটে।

নজরুলের গ্রন্থ সংখ্যা ৫৩টি। এর মধ্যে প্রবন্ধগ্রন্থ তিনটি ছাড়াও বাজেয়াপ্ত হয় চারটি কাব্যগ্রন্থÑ ‘বিষের বাঁশী’ (১৯২৪), ‘ভাঙ্গার গান’, ‘প্রলয়শিখা’ (১৯৩০), ‘চন্দ্রবিন্দু’ (১৯৩০)। প্রথম দুটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এবং পরের দুটি এক বছর পর ১৯৩১ সালে বাজেয়াপ্ত করা হয়। এই গ্রন্থগুলোর একটিও নজরুলের অসুস্থতাপূর্ব সময়ে আর প্রকাশিত হয়নি। নজরুলের আরও কয়েকটি গ্রন্থ বাজেয়াপ্তের জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে তা করা না হলেও সেগুলোর বিক্রয় ও প্রচারে পুলিশি বাধা অক্ষুণœ ছিল। ‘যুগবাণী’ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ ‘নবযুগ’, যা ছিল পত্রিকার নাম। লিখেছেন নজরুল, ‘আজ নারায়ণ মানব। তাহার হাতে স্বাধীনতার বাঁশি। সে বাঁশির সুরে সুরে নিখিল মানবের অনুপরমাণু ক্ষিপ্ত হইয়া সাড়া দিয়াছে। আজ রক্ত প্রভাতে দাঁড়াইয়া মানব নবপ্রভাত ধরিয়াছেÑ ‘পোহাল পোহাল বিভাবরী, পূর্ব তোরণে শুনি বাঁশরি, এ সুর নবযুগের। সেই সর্বনাশা বাঁশির সুর রুশিয়া, আয়ার্ল্যান্ড শুনিয়াছে, তুর্ক শুনিয়াছে এবং সেই সঙ্গে শুনিয়াছে আমাদের হিন্দুস্তান। জর্জরিত, নিপীড়িত, শৃঙ্খলিত ভারতবর্ষ।” নজরুলের লক্ষ্য কী ছিল তা এই লেখায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নজরুলের প্রথম গ্রন্থটি বেরিয়েছিল ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, গল্পগ্রন্থ ‘ব্যথার দান’। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিবীণা’-কে বাজেয়াপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু করা হলো কবির প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ। প্রকাশের ২৮ দিনের মাথায় ২৩ নভেম্বর।

অসহযোগ আন্দোলনে দেশ তখন তুঙ্গে। ব্রিটিশ উপনিবেশবিরোধী মনোভাব তীব্রতর। শাসকগোষ্ঠী নিপীড়নের পথ বেছে নেয়। সেই সঙ্গে নেতাদের গ্রেফতার। আর তাদের ১৭৯৯ সালের ১৩ মে চালু করা ‘প্রেস রেগুলেশন এ্যাক্ট’ বলবৎ করে। রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও অশ্লীলতার অভিযোগ এনে বহু বই-পুস্তক, নাটক, কবিতা, গান, লিফলেট, সাময়িকীপত্র, এমনকি গ্রামোফোন রেকর্ডও বাজেয়াপ্ত করা হয়। বঙ্কিম, দীনবন্ধু, মুকুন্দ দাস, গিরীশচন্দ্র, শরৎচন্দ্রের গ্রন্থ বাজেয়াপ্তের ধারায় কবি নজরুলের গ্রন্থও বাজেয়াপ্ত হয়। তবে তাঁর গ্রন্থই সর্বাধিক বাজেয়াফত হয়। ৭টি পুরোপুরি আর ৫টির প্রচার ও বিক্রয়ে অলিখিত বাধা প্রদান করা হয়। নিষিদ্ধ না থাকা সত্ত্বেও তল্লাশি চাালিয়ে পুলিশ বই আটক করত। নজরুলের জানা ছিল, বৈপ্লবিক আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামে অপরিসীম প্রভাব সৃষ্টির অভিযোগে ব্রিটিশরা এ দেশের ধর্মগ্রন্থ ‘ভগবতগীতা, ও ‘চ-ী’ চূড়ান্ত নিষেধ না করেই তল্লাশি চালিয়ে জব্দ করেছে। পূর্ববঙ্গ এমনকি আসাম প্রদেশ থেকেও নজরুলের বই তল্লাশি করে জব্দ করা হয়েছে। ইংরেজ শাসক প্রথমে বাজেয়াপ্ত করে নজরুল সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা। এই পত্রিকার শারদীয়া সংখ্যায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রকাশের জন্য। এরপর বাজেয়াপ্ত করে ‘যুগবাণী’ গ্রন্থটি। গ্রেফতার করে কবিকে কারারুদ্ধ করা হয়। (আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫

২২/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: