কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫
  • জাফর ওয়াজেদ

পাকিস্তান থেকে বিছিন্ন বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার অনেক কারণের একটি কারণ

পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যাপক গণহত্যা। পাকি সেনাবাহিনী, রাজাকার, দালাল, আলবদর, আলশামস, মুজাহিদ বাহিনী, জামায়াতে ইসলামী তখন এতে প্রধান ভূমিকা রেখেছিল। একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের তৃতীয় বর্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে পেছনে ফিরে তাকালে সে সব নৃশংসতার দৃশ্য ভাসে, আজ চার দশক পেরিয়েও সেই নৃশংসতার কথা, দৃশ্য, বার বার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আজকের প্রজন্মও একাত্তরের বর্বরতার জন্য দায়ীদের ক্ষমা করতে রাজি নয়। তারা মনে করে ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মদান ও তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত দেশে পরাজিত শক্তির অপতৎপরতা বন্ধ করা জরুরী।

স্বাধীনতা সম্পর্কে বাঙালী জাতি যত সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেছে, ততটা অন্যেরা বোধহয় পায়নি। স্বাধীনতার ধারণাটি রবীন্দ্রনাথ যেভাবে আমাদের দিয়েছেন, আর কোন মণীষী সেভাবে দেননি। রবীন্দ্রনাথের মতে- “স্বাধীনতা বাহিরের বস্তু নহে। মনের ও আত্মার স্বাধীনতাই প্রকৃত স্বাধীনতা। স্বাধীনতাকে জীবনের আদর্শ হিসাবে যে গ্রহণ করিতে শিখিয়েছে এবং অপরের প্রতি উহা সম্প্রসারিত করিতে যে কুণ্ঠিত নয়, সেই প্রকৃত স্বাধীনতার উপাসক। ... স্বাধীনতা সম্বন্ধে অপরের প্রতি যাহার একান্ত অবিশ্বাস এবং সন্দেহ, স্বাধীনতার ওপর তাহার কিছুমাত্র নৈতিক দাবি থাকে না, সে পরাধীনই রহিয়া যায়। আমি তাই আমার দেশবাসীকে একথা জিজ্ঞাসা করিতে চাই যে, যে স্বাধীনতার ওপর তাহাদের আকাক্সক্ষা তাহা কি বাহিরের কোনও বস্তু বা অবস্থা বিশেষের ওপর নির্ভরশীল? তাহারা কি তাহাদের সমাজের ক্ষেত্রে শত রকমের অন্যায় ও অসঙ্গত বাধা হইতে বিমুক্ত এতটুকু স্থান ছাড়িয়া দিতে সম্মত আছেন, যাহার ভিতর তাহাদের সন্তান সন্ততি মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ মর্যাদায় দিন দিন বড় হইয়া উঠিতে পারে?” ‘স্বাধীনতার মূল্য’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ মানবতা বোধকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। একাত্তর সালে মানবতার জয় হয়েছিল। আর পরাজয় ঘটেছিল দানবের।

চুয়াল্লিশ বছর পর পেছনে ফিরে তাকালে দেখতে পাই, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেই আমি ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধকালীন ক্ষুধা আমাকে দমিত করতে পারেনি। রক্ত আমাকে বিচলিত করতে পারেনি। ধ্বংসযজ্ঞ আমাকে আতঙ্কিত করেনি। মর্টারের, কামানের গোলা আমাকে ধ্বংস করতে পারেনি। বরং ওইসব শব্দ ছিল আমার নিত্যসঙ্গী। প্রতিমুহূর্তে আমার আশপাশে মুক্তিযোদ্ধার জন্ম দেখেছি। এই মাটি, আমার চোখের সামনে শহীদের রক্তপ্রবাহে দ্বিমাত্রিক হয়ে গেছে। আবার সেই রক্তবিন্দু থেকেই বিদ্রোহী ও অগ্নিশিখার আবির্ভাব দেখেছি। বাঙালীর বিদ্রোহ, এই অগ্নি, এই স্পর্ধা, এই অস্ত্র, এই রক্তের মধ্যেই আমরা প্রতিফলিত হয়েছি। তারপর একদিন আমাদের রক্তপ্রবাহ স্থবির হয়ে দাঁড়ায়। পর্বতের মতো বলীয়ান ও শক্তিধর এক পুরুষের জন্ম হয়Ñ সেই আমার স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতার বৈভবে, তার আকুতি আর ক্রন্দনে, লাখো মুক্তিযোদ্ধার প্রতিচ্ছবি দৃশ্যমান হয়। স্বাধীনতার সেই স্পর্শ, সেই গৌরব অচঞ্চল মূর্তির মতো স্থানুবৎ দাঁড় করিয়ে রাখে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ দৃশ্যত একাত্তরের মার্চ থেকে শুরু হলেও এর প্রেক্ষাপট আরও অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। এটি ছিল দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি। এই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একাত্তরের ২৫-২৬ মার্চ রাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের নেতা বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে ধরা দেয়ার পেছনে একটা কৌশলগত কারণ অবশ্যই ছিল। সাড়ে সাতকোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা, যার অঙ্গুলি হেলনে ও নির্দেশে তখন বাংলাদেশ চলছিল। তিনি পালিয়ে বা আত্মগোপন করলে তো হানাদাররা সুযোগ পায় বিশ্বজনমতকে তাদের পক্ষে নেয়ার। এমনিতেই তখনকার বৃহৎশক্তি আমেরিকা ও চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা শুধু নয়, অস্ত্র ও অর্থ সাহায্যে

পাকিস্তানকে বলীয়ান করছিল। বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি বিশ্বজনমতের সমর্থন লাভ করা সহজতর হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় যদিও বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। তা সত্ত্বে¡ও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তো বঙ্গবন্ধুর নামেই পরিচালিত হয়েছিল। যুদ্ধকালে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ‘মুজিব নগর সরকার’ নামেই পরিচিত ছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার জন্য পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমান এবং আওয়ামী লীগকে এককভাবে দায়ী করেছিল। পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি করার পথ সুগম করার অপরাধে পাকিস্তানী সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে মৃত্যুদ- দিতে বদ্ধপরিকর হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বজনমতের ভয়ে সেই দ- কার্যকর করতে পারেনি। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই শেখ মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। বাংলাদেশ এক ঘোষণায় স্বাধীন হয়ে গেছে যারা ভাবেন, তারা আসলে এদেশকেই মেনে নিতে পারেন না বা ইতিহাসের বিরুদ্ধে, পরাজিত শক্তির পক্ষাবলম্বন করেন। বঙ্গবন্ধু ধীরে ধীরে বাঙালী জাতিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তিনি আমাদের বাঙালী জাতিসত্তাকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই প্রক্রিয়া হঠাৎ করে শুরু হয়নি। বাঙালীর দীর্ঘদিনের আত্মানুসন্ধান, দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও সংগ্রামের অমোঘ পরিণতি হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। বিস্ময় জাগে বৈকি এখন যে, এই ভূখ- যেটি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর প্রথমে ‘পূর্ববাংলা’ এবং পরে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নামে পরিচিত ছিল, সেটিকে ১৯৬৯ সালে ‘বাংলাদেশ’ বলে ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই জাঁদরেল পাকিস্তানী সামরিক শাসক গোষ্ঠীর ভ্রƒকুটি উপেক্ষা করে। এদেশের রাজনীতিকে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক আবর্ত থেকে উদ্ধার করে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ধারায় প্রবাহিত করার পেছনেও শেখ মুজিবের অবদান ছিল অনন্য। বাংলাদেশের মানুষের সম্মিলিত ইচ্ছার ধারক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। যে জাতীয় চেতনার উন্মেষের ফলে আমাদের সময়কালে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটেছে, সেই জাতীয় চেতনার উন্মেষের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অবিস্মরণীয়।

এমনিতে জন্মমুহূর্ত থেকেই পাকিস্তান ছিল এক সমস্যাসঙ্কুল রাষ্ট্র। কারণ এর বাস্তবতা ও এর মানসিকতায় কোথাও মিল ছিল না। দেশ শাসনসংক্রাস্ত সমস্যাগুলো প্রকট হয়ে ওঠে। শাসনক্ষমতা মুসলিম লীগের পাকিস্তানীদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। বাঙালীরা হয়ে পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রজা। কোন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হলো না, সংবিধান প্রণয়নের নানা চেষ্টাও বিফলে গেল। বিরোধী পক্ষের কঠরোধ, যথাসময়ে নির্বাচন বা নির্বাচন আয়োজন ও সম্পন্ন করা হয়নি। অতীতের অখ- বাংলার প্রধানমন্ত্রী একে ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে বিতাড়িত জীবনযাপনে বাধ্য করেছিল। দেশত্যাগে বাধ্য হয়ে বিদেশে নির্বাসিতের জীবনে মৃত্যুবরণ করেন বাঙালীর প্রিয় নেতা সোহরাওয়ার্দী। ততদিনে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে পূর্ববাংলাকে নিষ্পেষণের মাত্রা বাড়ায়। পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে করা হয় পূর্ব পাকিস্তান। বাঙালীর শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির উপর আঘাত হানা হয়।

সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর তার দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের দায়িত্ব বর্তালো তরুণ নেতা শেখ মুজিবের উপর। মওলানা ভাসানী ও আরও কতিপয় ব্যক্তির নেতৃত্বে মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে আসা দলছুট ব্যক্তিরা গঠন করেছিলেন আওয়ামী লীগ। দলটি দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করেছিল। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাহসী ও অক্লান্তকর্মী শেখ মুজিব। ১৯৫৪ সালে এরা সবাই জোটবদ্ধ হয়ে প্রাদেশিক যুক্তফ্রন্টের ব্যানারে লড়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন প্রবীণ নেতা শেরে বাংলা। নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট এবং মুসলিম লীগের ভাগ্যে জুটেছিল ধস নামানো পরাজয়। পূর্ববাংলা মুসলিম লীগের অস্তিত্বই মুছে দিয়েছিল। এরপর ১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে ১৭ দিনের সশস্ত্র যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হলে অসম্মানজনক তাসখন্দ যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধের সময়, পূর্ববঙ্গ ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। শেখ মুজিব এই বিষয়টিকে জনগণের সামনে নিয়ে আসেন। যুদ্ধকালে পূর্ববঙ্গ থেকে প্রতিরোধের জন্য সেনা মোতায়েন করা হয়নি। অবশ্য ভারত পূর্ববঙ্গ আক্রমণের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে তীব্র আক্রমণ চালিয়ে পর্যুদস্ত করে। পাকিস্তানের পরাজয়, অপমান বাঙালীদের ক্ষুব্ধ করে। শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিটি সামনে নিয়ে আসেন। ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি। সারা বাংলার মানুষ এই কর্মসূচীর প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে। কারণ পশ্চিমা পাকিস্তানীদের অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়ে চলেছিল প্রতিবছর এবং সেই সঙ্গে সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক সংস্কারের দাবি প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছিল প্রতিদিন। পাকিস্তানী শাসকরা রাজনৈতিক মীমাংসার পথে না গিয়ে, ছয় দফার দাবিদার শেখ মুজিবকে কথিত আইনের অস্ত্রে ঘায়েল করতে চাইল। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্তের দায়ে দায়ের করা কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিব হলেন এক নম্বর অভিযুক্ত। বাঙলার মানুষ এটাকে দেখল মুজিবের বিরুদ্ধেই শুধু চক্রান্ত নয়, বাঙালী জাতিকে আরও নিষ্পেষিত, কণ্ঠরোধ করা, অধিকারহীন অবস্থানে নিয়ে যাওয়ারও ষড়যন্ত্র। ছাত্র সমাজ প্রতিবাদে ঐক্যবদ্ধ হলো। তারা ৬ দফার আলোকে ঘোষণা করল ১১ দফা। গর্জে উঠল সারা বাংলা। সামরিক শাসক আইয়ুব খানের গদি টলমল। সারা পূর্ববাংলায় গণআন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। তার ঢেউ লাগে পাকিস্তানেও।

গণঅভ্যুত্থানের মুখে আইয়ুব ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। তবে উত্তরসূরি হিসেবে সামরিক বাহিনীর প্রধান ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। জনগণের চাপের মুখে ইয়াহিয়া সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা এবং একজন এক ভোট নীতি মেনে নিল। শেখ মুজিব নির্বাচনকে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে নিলেন। ১৯৭০-এর ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ৬ দফার পক্ষে রায় পেয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি কেন্দ্রীয় আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ একাই ১৬৭টি আসন লাভ করে। অর্থাৎ জাতীয় সংসদে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু

পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী জনগণের এ রায় মেনে নিতে রাজি হয়নি। জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডেকে তা আবার স্থগিত করে। প্রতিবাদে গর্জে ওঠে সারা বাংলা। পূর্ব বাংলার মানুষ স্বাধিকারের দাবিকে স্বাধীনতার দাবিতে রূপান্তরিত করে। দেশ জুড়ে বাঙালী ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে স্বাধীনতার পক্ষে। শেখ মুজিবের ডাকে দেশজুড়ে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। শাসক ইয়াহিয়া খান ও পাকিস্তানী নেতা ভুট্টো কৌশলের পথ বেছে নেয়। তারা ঢাকায় এসে শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। আলাপ আলোচনায় হঠাৎ যবনিকাপতন ঘটিয়ে রাতের অন্ধকারে গোপনে ইয়াহিয়া, ভুট্টো ঢাকা ত্যাগ করে। অরক্ষিত পূর্ব পাকিস্তানকে ফেলে রেখে ওরা দেশটিকে এক নিষ্ঠুর সামরিক আগ্রাসনের মুখে ঠেলে দিল। ২৫ ও ২৬ মার্চের মধ্যরাতের তথাকথিত অপারেশন সার্চলাইটে। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনী। মহান নেতা শেখ মুজিব ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে সাড়ে সাত কোটি বাঙালীকে স্বাধীনতার কঠিন অভিযাত্রায় সর্বাত্মক লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিলেন, “বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে (পাকিস্তানী) সেনাবাহিনীর দখলকারীর মোকাবেলা করার জন্য আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।” এই ঘোষণার শুরুতেই বঙ্গবন্ধু চূড়ান্ত বিষয়টি সামনে আনেন সহস্র বছরের সাধনায় অর্জিত- “আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।” পুরো জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই ঘোষণা শুনে হানাদার দখলদার পাকি বাহিনীকে হটাতে। বাঙালী জাতি সর্বত্র রুখে দাঁড়ায়। নিরস্ত্র জনগণের বিররুদ্ধে সশস্ত্র বাহিনীর আক্রমণ তীব্রতর হতে থাকে। বাঙালী জাতি জড়িয়ে পড়ল এক অসম যুদ্ধে। যে যুদ্ধ পাকিস্তানী জান্তা তাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। বাঙালী নিহত হতে থাকল পাকিস্তানী সেনাদের হাতে নির্বিচারে। রাস্তাঘাটে, রিকশায়, গাড়িতে, ঘরে, বস্তিতে, প্রতিষ্ঠানে, স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্রছাত্রীদের হোস্টেলে এবং বাসা বাড়িতে বাঙালী নিহত হতে লাগল। শুরু হয় নারী জাতির উপর অত্যাচার। প্রকাশ্য দিবালোকে নারীর স্তন কেটে বেয়নেটের মাথায় নিয়ে উল্লাস করে ফিরতে লাগল পাকিস্তানী হানাদার সেনারা। নারী ধর্ষিত হতে থাকে গ্রামগঞ্জে। শিশুরা বেয়নেটের ডগায় উড়তে লাগল রক্তাক্ত নিশানের মতো। অস্ত্র হাতে না ধরতে শেখা বাঙালী গেরিলা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দেয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ও মুক্তির সংগ্রামের ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার ডাকও দিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে আহ্বান জানিয়েছিলেন, “যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।” বাঙালী সে সব মোকাবেলা করেছে। একাত্তর সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্úণের মধ্য দিয়ে এদেশে গণহত্যা বন্ধ হয়। পাকিস্তানি হানাদার ও তার সহযোগী দোসর দালালরা পরাজয়ের মুহূর্তে হত্যা করে দেশের শিক্ষিত গুণীজনদের। ঘর থেকে টেনে চোখ বেঁধে নির্যাতনের পর বধ্যভূমিতে নিয়ে হাত-পা বেঁধে বেয়নেটে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়।

পাকিস্তানী হানাদারের সহযোগী হিসেবে মানবতবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তাদের বিচারের আওতায় আনা হয়। কিন্তু পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিচার কাজ বন্ধতো হয়ই, উপরন্তু সাজাপ্রাপ্ত ও আটক সকলকে ছেড়ে দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, অর্জিত সুফল নস্যাতের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সংবিধানে কালো দাগ পড়তে থাকে। মুছে যেতে থাকে মুক্তিযুদ্ধ, চার মূলনীতি। উত্থান ঘটে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির। পরাজিত শক্তি সদর্পে পুরনো রাজনীতি নিয়ে মাঠে নামে। এভাবে দশকের পর দশক পেরিয়ে একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের তৃতীয় বর্ষে এসে নবজাগরণ ঘটেছে। ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’ ফিরে পাবার আকুতি ঝরছে। একাত্তরের মতোই বিজয় আবার আসবে। তবে রক্তহীন ও অহিংসার পথ ধরে অর্জিত হোক স্বাধীনতার চেতনা, মূল্যবোধ। শহীদের রক্ত কখনও বৃথা যায় না। যায়নি। তরুণদের ত্যাগ এবং আত্মদানও বৃথা যাবে না।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫

২৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: