মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দুইটি ভাষণ

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫
  • রশীদ হায়দার

পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলি, আমেরিকার পেনসেলভেনিয়া রাজ্যের গেটিসবার্গে ঠিক যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আব্রাহাম লিঙ্কন গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে বিশ্ববিখ্যাত ভাষণটি দিয়েছিলেন, ঠিক সেখানেই আমার কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ হয়েছিল। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই আমার বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের কথা মনে আসে।

আমি ভাষণের গুণাগুণ বিচার করব না; তবে বলতে চাই দুটি ভাষণের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য অন্যরকম। দুটোই যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে একটি গৃহযুদ্ধ; আরেকটি স্বাধীনতা পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে। আমেরিকায় উত্তর-দক্ষিণ গৃহযুদ্ধের কথা আশা করি বহু লোকে জানেন, কিন্তু বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা যুদ্ধ সূত্রেই কতজন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণটিকে গুরুত্ব দিয়েছেন, মূল্যায়ন করেছেন? চরম দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণটির অবমূল্যায়ন করতে এখনও অনেক লোক আনন্দ পায়; বক্তৃতায় তিনি কেন স্বাধীনতা ঘোষণা না করে স্বেচ্ছায় ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে পাকিস্তানীদের হাতে ধরা দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গেলেন, এমন কথাও প্রচার করে বহু লোক খুশি হয় যে, বঙ্গবন্ধুর সেলের সামনে কবর খোঁড়া বানানো গল্প, তিনি তো ছিলেন রাজার হালে!

সৌভাগ্য, এখন সে সব কোন যুক্তিই ধোপে টিকছে না। যতই অনুসারীরা এক মেজর স্বাধীনতার ঘোষক বলে গলা ফাটান না কেন, ইতিহাস চিরকালই বলে যাবে সেই মেজর ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণার পাঠক ছিলেন মাত্র, অন্য কিছুই নয়। যারা সেই ঘোষককে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছেন, তাদের উদ্দেশেই বলি, জিয়াউর রহমান যে ‘অন বিহাফ অব আওয়ার গ্রেট ন্যাশনাল লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ অর্থাৎ ‘আমাদের মহান নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে’ ঘোষণাটি দিচ্ছেন সেই সত্যটি চেপে যাচ্ছেন কেন?

এই ঘোষণা সম্পর্কে যাঁর কথা ধ্রুবতারার মতো সত্য, তিনি স্বনামধন্য বেলাল মোহাম্মদ। তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্ধৃতি দিচ্ছি:

ক. অফিস কক্ষে শুধু আমরা দু’জন। আমি ও মেজর জিয়াউর রহমান। বলেছিলাম : আচ্ছা, মেজর সাহেব, আমরা তো সব ‘মাইনর’, আপনি ‘মেজর’ হিসেবে স্বকণ্ঠে কিছু প্রচার করলে কেমন হয়।

কথাটা ছিল নিতান্ত রসিকতা। তিনি নিয়েছিলেন গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হিসেবে। সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন : হ্যাঁ। কিন্তু কি বলা যায়, বলুন তো।

আমি এক পাতা কাগজ এগিয়ে দিয়েছিলাম। তিনি নিজের পকেট থেকে কলম হাতে নিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি লিখেছিলেন : ও, Major Zia do hereby declare independence of Bangladesh.

আমি তখন বলেছিলাম : দেখুন, ‘বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে’ বলবেন কি?

তিনি বলেছিলেন : হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। নিজের নামের শেষে তীর-চিহ্ন দিয়ে লিখেছিলেন : ড়হ নবযধষভ ড়ভ ড়ঁৎ মৎবধঃ হধঃরড়হধষ ষবধফবৎ ইধহমধনধহফযঁ ঝযবরশয গঁলরনঁৎ জধযসধহ, ...

খ. সেই সান্ধ্য অধিবেশনে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বকণ্ঠে ঘোষণার পর অনুবাদটিও অন্যদের কণ্ঠে বার বার প্রচার হয়েছিল। ঘোষণাটি প্রধানত আমার সঙ্গে আলোচনা করে রচিত এবং ক্যাপ্টেন অলি আহমদের উপস্থিতিতে। আর বাংলায় অনুবাদের সময় আমাকে সহায়তা করেছিলেন অধ্যাপক মমতাজ উদ্্দীন আহমদ। ঘোষণার মর্মবাণী ছিল, মেজর জিয়া মহান জাতীয় নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন। বাংলাদেশের সর্বত্র দখলদার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়েছে। তাদের সম্পূর্ণরূপে দমন করতে আমাদের একদিন বা দু’দিনের বেশি সময় লাগবে না। এখন দেশ-বিদেশের কাছ থেকে অস্ত্রশস্ত্র সাহায্য পাওয়া আমাদের প্রয়োজন ইত্যাদি।

আজকের অধিবেশনে আবুল কাসেম সন্দ্বীপ সংবাদ বুলেটিন রচনা করে আমাকে দেখিয়ে নিয়ে স্বকণ্ঠে প্রচার করেছিলেন। সংবাদ বুলেটিনে মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণাকে ‘বিবৃতি’ বলে কভারেজ দেয়া হয়েছিল। প্রক্ষেপণের দায়িত্বে ছিলেন আমিনুর রহমান ও আবদুশ শুকুর। মোহরা গ্রামের সেকান্দর হায়াত খান ও হারুণ-অর-রশীদ খান দুই ভাই আমাদের সহযোগিতায় নিয়োজিত হয়েছিলেন।

গ. মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণার ইংরেজী পাণ্ডুলিপিটি আমার পকেটে ছিল। বাসায় ফেরার পর ডাক্তার মোহাম্মদ শফীকে দেখতে দিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন : এসব কাগজ রাখতে নেই। প্রচার করা হয়ে গেছে। প্রয়োজন মিটে গেছে।

বলেই তিনি খণ্ড কাগজটি চুলার আগুনে ফেলে দিয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালের বিজয় দিবসের দু’একদিন আগের কথা। ক্ষমতাসীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সরাসরি আমার সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেছিলেন। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে।

: আপনি বেলাল বলছেন?

: জি।

: চট্টগ্রামের বেলাল তো?

: জি। আমাকে কি আপনার মনে আছে?

: মনে না থাকলে কথা বলছি কেন? আপনার কি মনে আছে, আমি কি কলম দিয়ে ২৭ মার্চের ঘোষণাটি লিখেছিলাম?

: কলমটা আপনার নিজের পকেট থেকেই নিয়েছিলেন। সেটা কি কলম ছিল, মনে নেই।

একই দিনে আন্তঃসার্ভিস জনসংযোগের পরিচালক টেলিফোনে আমাকে মেজর জিয়াউর রহমানের ঘোষণার খসড়াটির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলেন। অনুযোগ দিয়েছিলেন, সেটা কেন নষ্ট করা হলো! জবাবে আমি কড়া কথা শুনিয়ে দিয়েছিলাম। পরে তিনি অনুরোধ করেছিলেন, স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে যেন তাঁকে জানাই। স্বয়ং জেনারেল এ বিষয়ে আগ্রহী। এক ঘণ্টার ব্যবধানে টেলিফোনে জানিয়ে দিয়েছিলাম। সেই প্রসঙ্গে দাবি করেছিলাম, আমার স্মৃতিচারণায় ভাষা ও শব্দগত বিভ্রম ঘটলেও, বক্তব্য অবিকৃতই রয়েছে।

(অনুপম প্রকাশনীর ৪র্থ মুদ্রণ থেকে)

১৯৭৫ সালের বিজয় দিবসের দু’একদিন আগে বেলাল মোহাম্মদ ও মেজর জিয়ার কথাবার্তার মধ্যে ‘আমি (জিয়া) কি কলম দিয়ে ২৭ মার্চের ঘোষণাটি লিখেছিলাম?’ বাক্যটিতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে চাই। জিয়া স্বয়ং বলছেন ২৭ মার্চ, আর পরিষদরা সেই তারিখটা সামনে টেনে আনতে আনতে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এনেছেন। ঘোষক আর পাঠক যে এক নন এ কথা ওই জ্ঞানপাপীদের কে বোঝাবে? তাঁদের হয়ত গোয়েবলস্্-এর ওই তত্ত্বটি মাথায় ছিল যে একটা মিথ্যা বার বার বললে একটা পর্যায়ে সেটা সত্য বলে গ্রহণ করা হতে পারে। তবে এই তত্ত্ব এখন আর কিছুতেই ধোপে টিকছে না। কারণ হোয়াইট হাউসের ‘সিচুয়েশন রুম’ থেকে ২৬ মার্চ ১৯৭১-এ প্রকাশিত উওঅ (Defence Intelligence Agency)-এর SPOT REPORT-এ বলা হয়েছে- ÔPakistan was thrust into civil war today when Sheikh Mujibur Rahman proclaimed the east wing of the two part country to be the sovereign independent peopleÕs Republic of Bangladesh.

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা সম্পর্কে মার্কিন সরকারের গোপন দলিলে উল্লেখ আছে-

The above despatch entiled ÔCivil War in PakistanÕ was sent by U.S. Defence Intelligence Agency in Dhaka on 26 March, 1971 at 14.30. EST. It was received in the White House on the same day at 3.55 p.m. EST.

This document mentiones about the proclamation of independence by Sheikh Mujibur Rahman in which he, apart from declaring East Pakistan as a sovereign and independent state. named the state, as PeopleÕs Republic of Bangladesh.

মার্কিন সরকার ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের যতই বিরোধিতা করুক, বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ঘোষণাটি দিয়েছিলেন, সেই সঠিক তথ্যটি সংরক্ষণ ও পরিবেশন করতে ভুল করেনি।

প্রাসঙ্গিকভাবেই প্রশ্নটি আসে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণার অধিকার লাভ করলেন কিভাবে? যারা ইতিহাস থেকে, সত্য থেকে বঙ্গবন্ধুকে চিরতরে মুছে ফেলতে চান, তারা জানেন না একমাত্র মহৎ সত্যই চিরস্থায়ী হয়, ‘হঠাৎ-সত্য’ কিছুক্ষণ বা কিছুদিনের জন্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করলেও পরে ফেনার মতো শুকিয়ে যায়, স্ফুলিঙ্গের মতো উড়ে গিয়ে ফুরিয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু সত্যের শক্তিটি অর্জন করেছিলেন ছেলেবেলা থেকেই। তাঁর ভালবাসার ভিত্তি ছিল মাটি ও মানুষ। এই দুটি বিষয়কেই সবচেয়ে বেশি আপন হিসেবে জানতেন বলে তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ভাষণটি শুধু কথার কথা ছিল না, মাটি ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগবিহীন রাজনীতিবিদদের মতো আবেগ সর্বস্ববক্তৃতা ছিল না। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণটি এমন ছিল যে, তিনি যেন ধরালো তরবারির ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। বক্তৃতার সামান্য একটু এদিক-ওদিক হলেই ৭ মার্চে ওই রেসকোর্সেই যে হাজার হাজার মানুষ মারা যেতেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। ওই পরিস্থিতিতে একটা সাধারণ রক্তমাংসের মানুষ কী অসাধারণ বক্তৃতা দিয়ে স্বাধীনতা লাভের সব কথাই বললেন, শুধু স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করলেন না ‘আমি স্বাধীনতা ঘোষণা করলাম।’ করলে কি হতো? অনিবার্যভাবেই হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, লাখ লাখ মানুষের পঙ্গুত্ব এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ সম্ভবত চিরদিনের মতো অধরা থেকে যেত। মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে বলছি কারণ আমি মালিবাগ চৌধুরীপাড়া থেকে সিদ্ধেশ্বরী পার হয়ে রমনা পার্কের গাছের আড়ালে, ফুলগাছের পেছনে, ঢাকা ক্লাবের আঙ্গিনায় অজস্র সশস্ত্র পাকিস্তানী সৈনিক দেখেছি, রেসকোর্স ময়দানের সভাস্থলের উপর দিয়ে হেলিকপ্টার ও প্ল্যান্ট প্রোটেকশনের ছোট বিমান একাধিকবার চক্কর দিয়েছে। স্বাধীনতার পর বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফের একটি লেখায় পড়েছি রেসকোর্স ময়দানের পুরনো হাইকোর্টের পেছনে বহু পাকিস্তানী সৈন্য সশস্ত্র অবস্থান নিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু কেন স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি বলে যারা অভিযোগ করেন, তাদের নাইজেরিয়ার বায়াফ্রার একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার পরিণতিটা জানতে অনুরোধ করি। একটা দেশের স্বাধীনতা লাভ ছেলের হাতের মোয়া নয়।

অনেকে অবলীলায় আব্রাহাম লিঙ্কনের ‘গেটিসবার্গ এ্যাড্রেস’র সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বক্তৃতার যথাযথ মূল্যায়ন না করে তাঁর বক্তৃতাটিকে মেঠো বক্তৃতা বলে আখ্যায়িত করেন, কিন্তু তাঁদের অনেকেই কি জানেন লিঙ্কনের বক্তৃতাটি ছিল লিখিত এবং তিনি লিখতে গিয়ে কাটাকুটি, লিখন, পুনর্লিখন করেছিলেন আট বার। ওয়াশিংটন থেকে ট্রেনে গেটিসবার্গ আসতে ট্রেনেও তিনি লেখায় যোগ বিয়োগ করেছেন, গেটিসবার্গে যে বন্ধুর বাসায় রাত যাপন করেছিলেন সেখানেও বক্তৃতায় কাজ করেছেন।

লিঙ্কনের বক্তৃতার শব্দ সংখ্যা ২৬৯। বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার সময়সীমা ১৯ মিনিট। সবচেয়ে বড় কথা জীবন মৃত্যু বা স্বাধীনতা-পরাধীনতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি যে বক্তৃতা দিলেন তাতে তাঁকে উচ্চারিত শব্দ হাতড়ে-ফিরতে হয়নি, শব্দ খোঁজার জন্য দ্বিধান্বিত হতে দেখা যায়নি। কোন একটি বিষয় পুনরুক্তি করেননি। পরে জানা যায়, ৭ মার্চের বক্তৃতায় তিনি কি বলবেন না বলবেন সে সম্পর্কে অনেকে মতামত দিয়েছেন ও পরামর্শ প্রদান করেছেন, কিন্তু তিনি শুধু শুনে গেছেন। স্পষ্টই বোঝা যায় তাঁর বলার বিষয় নিজেও আগেই স্থির করে রেখেছিলেন।

আমেরিকার গৃহযুদ্ধে যে জীবনহানি ও রক্তপাত হয়, তার তুলনায় আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে জীবনহানি ও রক্তপাত অনেক, অনেক বেশি। না, বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার সময় তাঁর সামনে লিখিত কোন কিছু ছিল না, যেন অবলীলায় কথাগুলো বেরিয়ে আসছে। অবাক হতে হয়, মাত্র ১৯ মিনিটের বক্তৃতায় তিনি ‘আপনারা সবই জানেন সবই বোঝেন’ বলে বুঝিয়ে দিলেন আমরা কোন ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের শিকার হতে যাচ্ছি। অতি দ্রুত আমরা জেনে গেলাম আমাদের বঞ্চনার ইতিহাস, আমরা কি চাই। জ্ঞানপাপীরা কোনভাবে প্রমাণ করতে পারেনি বঙ্গবন্ধু একটাও অপ্রাসঙ্গিক কথা বলেছেন। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত ব্যক্তির বক্তৃতার পেছনে বহু লোকের অবদান থাকে, কিন্তু তাঁর অবদান তাঁর নিজেরই।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতাটিকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বক্তৃতা বলা হয়। এটা পৃথিবীর বহু গুণীজনের উচ্চারিত স্বীকৃতি।

দেখা যাক, ১৯৭৫ সালের বিজয় দিবস অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বরের আগে জিয়াউর রহমানের কাছে ওই ঘোষণাটির গুরুত্ব বেড়ে গেল কেন? হিসাবী জিয়া ঠিকই বুঝেছিলেন বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাঁর ঘোষণার কৃতিত্বে আর কেউ যেন ভাগ বসাতে না পারে। এটা ঠিক, ২৭ মার্চ ১৯৭১ সন্ধ্যায় আমি নিজ কানে শুনেছি, তেমনি আরও অনেকে শুনেছেন। ২৬ মার্চ জিয়ার ঘোষণা শোনার প্রশ্নই আসে না। কারণ বেলাল মোহাম্মদের নেতৃত্বে কালুরঘাট থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও চালু করা হয় ২৭ মার্চ, ১৯৭১। হ্যাঁ, ২৬ মার্চ ১৯৭১ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হান্নান সাহেব স্বকণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার কথা বলেছিলেন কিন্তু জিয়া ২৬ মার্চ দৃশ্যপটে মোটেই ছিলেন না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যে সেনাবাহিনীর সদস্যরাও আছেন তা দেশবাসীকে জানানোর জন্য একজন সেনা কর্মকর্তার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। বলতে হবে, সিনিয়র সেনা অফিসার হিসেবে তিনি চট্টগ্রামে অবস্থান করছিলেন, তাই ক্যাপ্টেন রফিকের চাইতে মেজর জিয়ার ঘোষণার গুরুত্ব আসে। জিয়া তো নিজেই ২৭ মার্চ তারিখের ঘোষণাই খুঁজছিলেন। ওটা থাকা দরকার ছিল, তাহলে তার লিখিত রূপ কাগজে প্রকাশিত হতো এবং তাঁর অনুসারীরা ২৭ থেকে ২৬, ২৬ থেকে ২৫ তারিখে এগিয়ে এনে জিয়াকে তেলের ড্রামে দাঁড় করাতে পারতেন না। জেনারেল শওকতের এই ড্রামতত্ত্ব তো এখন তৈল প্রদান তত্ত্বে পরিণত হয়েছে।

যুদ্ধ যে আসন্ন সেটা বঙ্গবন্ধু ঠিকই বুঝেছিলেন বলে ৭ মার্চ ১৯৭১, তিনি রেসকোর্স ময়দানে ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে’; ‘আমরা ভাতে মারবো পানিতে মারবো’; ‘বাংলার ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো’; ‘রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিতে হবে’; ‘মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি তখন আরো রক্ত দেবো, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ’ ইত্যাদি বাক্য দিয়ে তিনি মানুষের মন মানসিকতা তৈরি করে ফেলেছেন। বঙ্গবন্ধুর উপরিউক্ত বাক্যগুলোর মধ্যে ‘আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি...’ কথাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইয়াহিয়ার চোখে তিনিই সবচেয়ে বড় অপরাধী এবং ২৬ মার্চ ১৯৭১ সন্ধ্যার পর বেতার ভাষণে তো ইয়াহিয়া বলেই দিলেন- ‘ঃযরং ঃরসব যব ংযধষষ হড়ঃ মড় ঁহঢ়ঁহরংঃবফ’ অর্থাৎ সে শাস্তির অপর নাম যে মৃত্যুদ- তাতো দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার হয়েই গেল। এক্ষেত্রেই বলা যায়, আব্রাহাম লিঙ্কন স্মরণীয়, আর বঙ্গবন্ধু অবিস্মরণীয়।

প্রকাশিত : ২৬ মার্চ ২০১৫

২৬/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: