মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

এগিয়ে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম

প্রকাশিত : ২৪ মার্চ ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

সব গেছে উচ্ছন্নে। আহা আমাদের সে সময়টা কত্ত ভাল ছিল। কলিকাল, কলিকাল। এরা এক একটা বজ্জাত। যত্ত সব ইঁচড়েপাকা। কাম কাজ নেই, সারাক্ষণ ফেসবুকে মেতে থাকে। লেখাপড়ায় কোন মনযোগ নেই। শুধু গলি ঘুপচিতে আড্ডা দিয়ে বেড়ায়। মেয়েছেলের কোন বালাই নেই, সব একসঙ্গে বইস্যা থাইক্কা কী যে রং তামাশা করে। আজাইরা হৈ-হুল্লোড় যত্ত সব। এরকম আরও কত রকম অপবাদ যে, আজকের তরুণ সমাজকে সহ্য করতে হচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই। পাড়ার মুরব্বি থেকে শুরু করে বাবা-মা, অনেকের মাঝেই তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে নাক সিটকে কথা বলার এক অদ্ভূত প্রবণতা আছে। এ প্রজন্মকে খাটো করতে পারলেই যেন তাদের আত্মতৃপ্তি। অথচ বাস্তব সত্য হলো আগের প্রজন্ম থেকে আজকের প্রজন্ম ভাল আচার-ব্যবহারে কোন অংশে কম যায় না। বরং অনেক দিক থেকে আগের প্রজন্মের চেয়ে এরা অনেক ভাল। এমন কয়েকটি দিকই তুলে ধরা হলো আজকের আয়োজনেÑ

অপরাধ প্রবণতা এখন কম

তরুণদের মাঝে আগের চেয়ে অনেক বেশি অপরাধ প্রবণতা কমেছে। কথায় কথায় মুরব্বিরা বলেন, আজকালকার পোলাপানরা সারাক্ষণ মারামারির ভিডিও গেমস খেলে আর মুভি দেখে মারামারি শিখছে। এ কারণে সমাজে বেশি বেশি মারামারি, হানাহানি ঘটছে। সিনেমা দেখে দেখে অভিনব সব অপরাধকৌশল রপ্ত করে এরা ঝুঁকে পড়ছে অপরাধের দিকে। কিন্তু দ্য সিডিসি (সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রেথ অ্যান্ড প্রিভেনশন) এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দশ থেকে চৌদ্দ বছর বয়সী কিশোর ও তরুণদের মধ্যে আগের তুলনায় অনেক কম অপরাধ প্রবণতা বিদ্যমান। আজ থেকে বিশ বছর আগে যেখানে এই বয়সী তরুণদের ১৫.২% এর মাঝে অপরাধ প্রবণতা ছিল, এখন তা কমে হয়েছে ৭.৫%। যত দিন যাচ্ছে তরুণদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা কমছে। অথচ মুরব্বিরা বলে কিনা, এ প্রজন্ম উচ্ছন্নে গেছে। বালাই ষাট।

মাদকাশক্তির পরিমাণ কমেছে

মাদকাশক্তির পরিমাণ কমেছে শুনে নির্ঘাত অনেক মুরব্বি আঁতকে উঠছেন। আরে বলে কী, চারিদিকে খালি মাদক আর মাদক। পোলাপাইন নিত্যনতুন কত বিচিত্র নেশায় মত্ত হয়ে যচ্ছে! মদ, গাঁজার সঙ্গে ইয়াবা-টিয়াবা কত্ত কিছুই না বের হলো। আর এরা বলে কিনা মাদকাশক্তির পরিমাণ কমছে! কিন্তু সত্যি আগের তুলনায় মাদকাশক্তির পরিমাণ কমেছে। অনেক বিচিত্র মাদক বের হলেও, তরুণ-তরুণীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা নেশার জগত থেকে দূরে থাকছে। যেসব তরুণ-তরুণী বিভিন্ন ধরনের মাদক নিচ্ছে, সে হার আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক কম। এখনকার পঞ্চাশ থেকে ষাট বছর বয়সী মানুষদের মদ আফিম-গাঁজায় মত্ত হওয়ার সংখ্যা বর্তমান প্রজন্মের চেয়ে বেশি।

কমেছে অবিবেচকের মতো

গাড়ি চালানো

গাড়ি পেলে আর হুশ থাকে না। এমন বেয়াক্কেলের মতো জোরে কেউ গাড়ি চালায় নাকি! আমরা দেখে-শুনে কত সুন্দরভাবে গাড়ি চালাতাম। আজকালকার পোলাপানদের কোন আক্কেল-জ্ঞান নেই। তরুণ প্রজন্মকে উদ্দেশে করে এমনতর কথা অনেক মুরব্বি প্রায়ই বলে থাকেন। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, তরুণদের গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা এখন অনেক কমে গেছে। বিশ বছরের ব্যবধানে এই হার ৪২% থেকে কমে হয়েছে ২৫%। এই কমে যাওয়া প্রমাণ করছে এখনকার তরুণরা গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে আগেকার মানুষের থেকে অনেক বেশি সচেতন। তারা আগের মানুষের চেয়ে গাড়ি চালানোয় ক্ষেত্রে অনেক বেশি বিবেচক। নিরাপদ গাড়ি চালানোর বিষয়ে অনেক বেশি সতর্ক।

কমছে অবৈধ গর্ভধারণ

বুড়োরা কথায় কথায় আজকের প্রজন্মের দিকে আঙ্গুল তুলে বলে ছ্যা, ছ্যা। সব বেহাল্লাপনায় মেতে উঠেছে। সারাক্ষণ শুধু পোলা-মাইয়্যার ঢলাঢলি। আর উন্মাদ ফুর্তি। অনৈতিক যৌনসম্পর্কে একালের তরুণ-তরুণীরা বেশ পটু, এ নালিশ তো তারা অহরহই করে থাকে। কিন্তু অবৈধ গর্ভধারণের হার এখন আগের তুলনায় অনেক কম। এইতো, আজ থেকে সাত বছর আগেও যেখানে তরুণ-তরুণীদের অবৈধ গর্ভধারণের হার ৩৪% ছিল, এখন তা কমে হয়েছে ২৪%। এমনটাই পাওয়া গেছে জরিপে। এটাই প্রমাণ করে যে, এখনকার তরুণ-তরুণীরা নীতি-নৈতিকতার ব্যাপারে অনেক বেশি সচেতন। তারা যা করে, সরাসরি করে। হঠকারী কোন কিছু করে না। লুকিয়ে চুকিয়ে অবৈধ কাজে তারা লিপ্ত হয় না।

বেশি আয় করছে তরুণ প্রজন্ম

কথায় কথায় আগের প্রজন্মের অনেক মানুষই এ যুগের তরুণদের অকর্মা অপবাদ দেন। রুজি রোজগারের কোন চিন্তা না করে এরা নাকি আজাইরা আড্ডা দিয়ে বেড়ায়, এমন অভিযোগ তোলেন অনেকেই। কিন্তু পিউ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট কর্তৃক পরিচালিত এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, আজকের যুগের তরুণ-তরুণীর ৮৪% তাদের বাবা-মার তরুণ বয়সের আয় থেকে অনেক বেশি আয় করতে সক্ষম হচ্ছে। বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও তারা বাবা-মায়ের তরুণ বয়সের আয়ের চেয়ে অনেক বেশি আয় করতে পারছে। এর কারণ এখনকার ছেলেমেয়েরা আগের প্রজন্মের থেকে ক্যারিয়ারের বিষয়ে বেশি সচেতন। পেশার প্রতি বেশি যতœবান।

তরুণ প্রজন্ম অনেক বেশি সদয়

এখনকার ছেলেমেয়ের মাঝে মায়া-দয়া বলে কিচ্ছু নাই। সব পাষ- হয়ে গেছে। বিবেক-আবেগ কই যে গেল, এরা কেন যে এমন হলো, এরকম কথা অহরহই আগের প্রজন্মের অনেকই বলে থাকেন। ভাবখানা এমন যেন, তাদের যুগের তরুণদের মাঝে মায়া-দয়ার ছড়াছড়ি ছিল। কিন্তু গবেষণা থেকে দেখা যায়, আগের তুলনায় এখনকার তরুণ-তরুণীদের মাঝে দয়া-মায়া বেশি। মানুষের বিপদ দেখলে আগের প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের বেশিরভাগই যখন নিজে বিপদে পড়বেন কিনা তা ভেবে সাহায্য করতে যেতেন, এখনকার বেশিরভাগ তরুণ-তরুণীই এর ব্যতিক্রম। এরা নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে বিপদগ্রস্ত মানুষকে সাহায্য করতে এগিয়ে যায়।

অধিক সচেতন তরুণ সমাজ

আগেকার তুলনায় এখনকার তরুণ প্রজন্ম বেশি রাজনৈতিক সচেতন। আগের প্রজন্মের মানুষরা তা মানতে চাইবে না। বলবেন, এরা রাজনীতির ‘ক’ও বোঝে না। এরা লেখাপড়ার বাইরে কিছুই জানে না। নিজেকে নিয়ে এরা সদা ব্যস্ত। দেশপ্রেমের ছিটেফোঁটাও নেই এদের মাঝে। এরপর তারা তাদের সময়কার আন্দোলন-সংগ্রামে তরুণ-তরুণীর কীর্তিগাথা বলে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন। কিন্তু গবেষণায় দেখা যায়, এখনকার যুবসমাজ বেশ রাজনীতি সচেতন। শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করে এখনকার তরুণ সমাজ অধিকার সচেতন হয়েছে, যা তাদের স্বাভাবিকভাবেই রাজনীতি সচেতন করেছে।

মেধার দিক দিয়েও এগিয়ে গেছে তরুণ প্রজন্ম

ধ্যাত্তরি! এরা কিছুই জানে না। লেখাপড়া করে না, জানবে কী করে! তাছাড়া এদের মেধাও নেই। ভেজাল খেতে খেতে এদের মেধা নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ আমাদের সময় এক একজন কত্ত মেধাবী ছিল! এমন কথা প্রায়ই আগের প্রজন্মের মানুষরা এ প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশে বলে। অথচ জেমস ফ্লিন নামক এক গবেষক গবেষণা করে প্রমাণ করেছেন যে, একশ’ বছর ধরে ক্রমাগত মানুষের আইকিউ বেড়ে চলেছে। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ক্রমাগত মানুষের আইকিউ বাড়িয়ে চলছে। সে হিসেবে বলাই যায়, আগের তুলনায় এখনকার তরুণ-তরুণীরা অনেক বেশি মেধাবী। তরুণ-তরুণীদের আবিষ্কারের মাত্রা এবং পেশাগত সাফল্যই তা প্রমাণ করে।

শত প্রতিকূলতা ও বাধাবিঘœ অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে আজকের তরুণ প্রজন্ম।

প্রকাশিত : ২৪ মার্চ ২০১৫

২৪/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: