মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

রংপুরে ভাষা আন্দোলন ॥ যে কথা এখনও অজানা

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • ছাত্র মিছিলের ওপর গুলিবর্ষণের খবর ছড়িয়ে পড়ে

মানিক সরকার মানিক, রংপুর থেকে ॥ রংপুরে ভাষা আন্দোলনের মূল বিরোধিতাকারী ছিলেন কারমাইকেল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ শাহাব উদ্দিন। তিনি ছিলেন উর্দুভাষী এবং মাথায় ফেল্ট ক্যাপ পড়তেন। সার্বক্ষণিক টানতেন পাইপ। ভাল ইংরেজী বলতেন। তিনিই ছিলেন রংপুরে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম বিরোধিতাকারী। ছাত্রদের মিছিল, সভা-সমাবেশ করতে দিতেন না। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত কোথাও কোন পোস্টার কিংবা দেয়াল লিখন দেখলেই পিয়নদের হুকুম দিয়ে ছিঁড়ে-মুছে ফেলাতেন। এমনকি ভাষা আন্দোলন করার অভিযোগে কলেজের দু’জন অধ্যাপককে গ্রেফতার করান তিনি এবং একজনের নামে জারি করান গ্রেফতারি পরোয়ানা। এ ছাড়াও তিনি কলেজের ক’জন ছাত্রকে কলেজ থেকে বহিষ্কারের আদেশ দিয়ে নোটিস দেন এবং কারও কারও জরিমানাও করেন। এ বিষয়টি তিনি পত্র দিয়ে জানিয়েও দিতেন ছাত্রদের অভিভাবকদের। রংপুরে মহান ভাষা আন্দোলনের বিরোধিতাকারীর এসব তথ্য পাওয়া যায় বিশিষ্ট ভাষা সৈনিক, শিক্ষাবিদ ও আইনজীবী মরহুম অধ্যাপক নুরুল ইসলামের লেখা নিবন্ধ থেকে।

জানা যায়, একুশে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় ছাত্র মিছিলের ওপর গুলি বর্ষণের খবর রংপুরে সন্ধ্যার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রাতেই মিছিল নিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে। পুলিশের অবিরাম লাঠিচার্জে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। রংপুরের অনেক তরুণ ছাত্রই সেদিন মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। ২২ ফেব্রুয়ারি কারমাইকেল কলেজে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং পুনরায় এক বিরাট মিছিল নিয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এ মিছিলটিকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেছিল পুলিশ। কিন্তু বাধা উপেক্ষা করে মিছিলটি সারা শহর প্রদক্ষিণ করে। তারপরে প্রতিদিনই কারমাইকেল কলেজে প্রতিবাদ সভা হতো, বেরুতো মিছিলও।

অপর ভাষাসৈনিক শাহ তবিবর রহমান প্রধান এ প্রতিবেদককে জানান ভাষা আন্দোলনের আরও অজানা কাহিনী। শাহ তোফাজ্জল তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলন কমিটির সদস্য। ৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ‘কমিটি অব এ্যাকশন’ থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁকেসহ অনেককেই পাঠিয়ে দেয়া হয় রংপুর।

তিনিসহ সাবেক মরহুম মন্ত্রী রংপুরের মতিউর রহমান, এ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান, ইয়াকুব আলী, মাহফুজ আলী, কাজী মুহাম্মদ এহিয়া, মণি কৃষ্ণ সেন, শংকর বসু, শাহ আবদুল বারী, ধীরেন ভট্টাচার্য, জীতেন্দ্রনাথ দত্ত, ইদ্রিস লোহানী, সুফী মোতাহার হোসেন, শাহ আবদুর রাজ্জাক, মীর আনিছুল হক পেয়ারা, কছিম উদ্দিন, আমজাদ হোসেন, আজমল হোসেন, আবুল হোসেন, ডাঃ মোজাহার উদ্দিন, ডাঃ আবতাব উদ্দীন তালুকদার, ভিখু চৌধুরী, শাহ আবদুল বারী, এ্যাডভোকেট নুরুল হক, দবির উদ্দিন আহম্মদ, খয়রাত হোসেন, মোঃ নাজিম খন্দকার, মোহাম্মদ আফজাল, আজিজার রহমান, নাজমুল আলম চৌধুরী হেবিন, মতিয়ার রহমান, আজিজুল হক সেলিম, আবদুস সোবহান, কৃষক নেতা দরাজ আলী ম-ল, শাহ তবিবর রহমান প্রধান তখন রংপুরের আন্দোলন পুরোধা হিসাবে কাজ করতেন। শাহ তবিবর জানান, রংপুরে তখন মাইক পাওয়া যেত না। দোকান ছিল মাত্র দুটো। যে কারণে চোঙ্গা ফুকতেন তিনি। এজন্য সবাই তাকে ‘চোঙ্গা ম্যান’ কিংবা ‘চোঙ্গা তবি’ বলে ডাকতেন। হাতের লেখা ভাল থাকার কারণে পোস্টারও লিখতেন তিনি। তখন দলবদ্ধ হয়ে আড্ডা এবং পোস্টার লিখতেন বর্তমান জিএল রায় রোডস্থ খ্রীস্টানদের কবরস্থানে। এ তথ্যও জেনে যায় তৎকালীন পুলিশ এবং এজন্য প্রায়ই সেখানে হানা দিত তারা। এছাড়া রংপুরের ভাষাসৈনিকরা নিয়মিত ওঠবসা করতেন নগরীর বর্তমান পায়রা চত্বরের পাশে বর্তমান লুক টেইলার্স ও সাবেক পাকিস্তান বুক হাউসে।

সেটি ছিল আওয়ামী লীগ নেতা আবুল হোসেনের অফিস। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি ভাষাসৈনিক ডা. মোজাহার উদ্দিনের সিটি ফার্মেসিতে। পরবর্তীতে যেটি নুশিন লাইব্রেরি বলে পরিচিতি পায়।

ভাষা সংগঠক মোহাম্মদ আফজাল জানান, সে সময় তাঁরা মিছিল সভা সমাবেশ করে ক্লান্ত দেহে ফিরে যেতেন নুরপুরে হেবিন চৌধুরীর বাসায়। সেখানে হেবিন চৌধুরীর মাকে তাঁরা মা বলে ডাকতেন। তিনি ভাষাসৈনিকদের নিজ হাতে চা বানিয়ে খাওয়াতেন। হেবিন চৌধুরীর দু’বোন ডলি এবং ডজি তারাও নিয়মিত মিছিলে যেতেন এবং ডজি স্লোগান দিয়ে মাতোয়ারা করতে পারতেন।

রংপুরে ভাষা আন্দোলনে আরও যারা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন তারা হলেন, লে. কর্নেল জাহিদুল হক চৌধুরী, শামসুল হুদা (আবু), নজরুল ইসলাম এ্যাডভোকেট, সিদ্দিক হোসেন, ডা. রোকেয়া আলমগীর রুবি, কমরেড বিনয় সেন, মজিবর রহমান মতি মিয়া, ডাঃ শোভান খান, ডাঃ দীনেশ চন্দ্র ভৌমিক (মন্টু ডাক্তার), মকবুল হোসেন, কানু ঘোষ, আফান উল্লাহ, মোসলেম আলী খান, ইব্রাহিম খান সুরুজ, ডা. কবির খান বখতিয়ারি, এ্যাডভোকেট গাজী রহমান, কামরান শাহ আবদুল আউয়াল, অধ্যাপক রেজা শাহ তৌফিকুর রহমান, এ্যাডভোকেট আবদুস সালাম, তোজাম্মেল আলী, এ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, আশরাফ হোসেন বড়দা, তনসিম উদ্দিন আহমেদ মনু পানার উদ্দিনসহ নাম না জানা আরও অনেকেই।

প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

২১/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: