কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তারুণ্যের দুই চাকার চমক

প্রকাশিত : ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫
  • রেজা নওফল হায়দার

বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটা গর্জন শুনতে পাচ্ছিলাম। খুব জোরে শব্দ করে একটা বাইক ছুটে গেল। বরাবরের মতো নাগরিক চোখে খুব বিরক্তি নিয়ে তাকানো ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। মনে মনে মন্তব্য করতে যাব, তার আগেই চোখে যা দেখলাম সেটা মনে হয় হলিউডের এম আই ছবিতে দেখেছিলাম। খুব রিসেন্ট হলে ধুম ছবিতে দেখেছিলাম। হতচকিত হয়ে আর একটু হলে দৌড়ে যেতাম। যদি না পরের দৃশ্যগুলো চোখের সামনে না ঘটত।

বাইকটা বিকট শব্দে যখন পাশ দিয়ে চলে গেল, বিরক্ত হয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু যখন খুব জোরে কিছুদূর গিয়ে থেমে গেল, তখন দেখলাম বাইকটা তাঁর আরোহীসহ শূন্যে উঠে গেল। ভাবলাম, আমি মনে হয় চোখের সামনে একটা রক্তারক্তি দুর্ঘটনা দেখব। তাই আরোহীকে বাঁচানোর জন্যই দিলাম দৌড়। কিন্তু না। কয়েক সেকেন্ড শূন্যে ভেসে থাকার পর বাইকটা আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। আর আরোহী তাঁর মাথার হেলমেটটা খুলে মজা আর গৌরবের ভঙ্গিতে বাইক থেকে নামল। তবে এই কয়েক সেকেন্ডে, মানুষের আতংকিত চেহারায় আবার স্বস্তির ভাব দেখে ভাল লাগল। উপস্থিত আতংকিত চেহারার মানুষগুলো হাততালি দিচ্ছিল বারবার।

ছেলেটার নাম জেনিত। থাকে ঢাকা সেনানিবাসে। একটা বাইক রাইডার টিম এরই মধ্যে তৈরি করেছে, যার নাম দিয়েছে কেবি রাইডার। ঢাকা শহরে বাইক স্টান করা এখন একটা শখের বিষয়। যারা এই স্টান করে, তারা কেউ প্রফেশনাল নয়। নিতান্তই শখের বসে করছে। ঢাকা কেন, বাংলাদেশের কোথাও বাইক স্টান করার কোন অনুমতি নেই। তারপরও এই টগবগে তরুণরা সকল প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করেই প্র্যাকটিস চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের জাতীয় বেশ কিছু পত্রিকা আর ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর এই তরুণরা আরও একটু সাহস পেয়েছে।

জেনিত এর কথাই ধরা যাক। তাঁর সঙ্গে কথা বলতেই, কথার ফাঁকে ফাঁকে সে বলছিল, তাঁকে নিয়ে দেশের প্রথম সারির বেশ কয়েকটি পত্রিকা নিউজ করেছে। মজা পাচ্ছিলাম জেনিতের সঙ্গে কথা বলে। গল্প করার এক ফাঁকে প্রশ্ন করলাম, তোমরা এত রিস্ক নিয়ে বাকই রাইড কর! যদি কেউ আঘাত পায়, তাহলে কি কর? একটু লজ্জা পাবার ভঙ্গিতে জেনিত বলল, ভাইয়া আমি যে দলটা তৈরি করেছি, সেখানে সদস্যদের মাসিক চাঁদার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কেউ এমন কোন ঘটনা ঘটালে, ঐ টাকা দিয়ে তার, চিকিৎসা করাই। আরও একটা প্রশ্ন করার জন্য মনটা ছটফট করছিল। বলেই বসলাম। তোমরা যে এই প্র্যাকটিস কর? সেখানে তো বেশ জায়গার দরকার হয় তাছাড়া শহরের আইনে তোমরা যা করছ, সেটা বৈধ নয়। তাহলে কেন করছ। বরাবরের মতো জেনিত বলল, ভাইয়া, ইউটিউবে দেখে আর হলিউডের ছবি দেখে নিজের মধ্যে একটা কি যেন, ও হ্যাঁ, জিদ চাপছিল। নিজের বাইক ছিল। প্রথমে কাফরুল এলাকায় নিজের বাইক নিয়ে প্র্যাকটিস শুরু করি। আমার দেখাদেখি এলাকার অন্যরাও এল। শুরু করে দিলাম পুরো দমে। প্রথমে রাত্রে করতাম। তারপর যখন বেশ সমস্যা হচ্ছিল? তখন ফ্লাইওভারের নিচে নিকুঞ্জের দিকে সবাই মিলে দিনের বেলা প্র্যাকটিস করতাম। এখনও তাই করি। সমস্যা হলো, প্র্যাকটিস করার সময় বেশ শব্দ হয়। অনেকগুলো বাইক। তাই যেখানে প্র্যাকটিস করি সেখানে পথের মানুষজন ভিড় করে। অনেকে প্রথমে ভাবে আমরা কোনো সাবটাজ করতে এসেছি। এরই মধ্যে অনেকে না জেনে পুলিশে খবর দেয়। তখন শুরু হয় আর এক ফ্যাসাদ।

কেবি রাইডারের প্রতিষ্ঠাতা জেনিতকে প্রশ্ন করলাম। তোমরা কী কী খেলা প্রদর্শন করে থাক। জেনিত জনকণ্ঠকে জানায়, খুব জোরে বাইক নিয়ে ছুটে হঠাৎ ব্রেক কষে সামনের চাকায় দাঁড়িয়ে পড়লে, বাইক শূন্যে উঠে যায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য। এক বলে স্টপি। তারপর যেমন ধরেন, খুব স্পিডে বাইক চালিয়ে ভারসাম্য ঠিক রেখে বাইকের উপর দাঁড়িয়ে পড়াকে বলে সুইসাইড স্টান আপ। পায়ের উপর ভর দিয়ে ব্রেক চেপে নির্দিষ্ট গতিতে এক জায়গায় বাইক ঘোরানোকে বলে বার্ন আউট দুইজনে একই জায়গায় বাইক ঘোরানোকে বলে ডাবল বার্ন আউট। জেনিত আরো জানালো, বার্ন আউটের প্রধান শর্ত হল বাইক শব্দ করবে আর সাইলেনসার দিয়ে ধোঁয়া বেরোবে। সামনের চাকায় বসে বাইকের হ্যান্ডেল ধরে পেছনের চাকা ঘোরানো। কু-লী পাকিয়ে ধোঁয়া তৈরি হবে। অনেক সময় আগুনও বের হয়। সামনের চাকা উপরের দিকে দাঁড় করানোকে বলে হুইলি। আবার দুই হাত ছেড়ে পা-দানিতে দাঁড়িয়ে চলন্ত বাইককে সামনে নিরাপদে নিয়ে যাওয়াকে বলে বাইক হ্যান্ডস ফ্রি। আছে আরো কৌশল। তার সাথে আছে বাহারি নাম। ঢাকায় কেবি রাইডারের মতো আছে বেশ কয়েকটি টিম। তারাও নানা কসরত দেখিয়ে থাকে। তবে এখন এই কসরত দেখাতে গিয়ে কোন বাইক রাইডারকে হেলমেট ছাড়া নিরাপত্তার জন্য অন্য কোন পোশাক পরতে দেখা যায়নি। কেবি রাইডার ছাড়া ঢাকায় আছে বন্য বাইকার্স, বিডি বাইকার্স, বিডি গোস্ট বাইকার্সসহ আরো অনেকে। তবে যত বাঁধাই থাক না কেন, ঢাকায় এরই মধ্যে অনেক বাইক টিম তৈরি হয়েছে। নিছক শখের বসেই অনেকেই করছে এই প্র্যাকটিস।

ঘনবসতিপূর্ণ তিলোত্তমা ঢাকায় ফাঁকা জায়গার খুব অভাব। তাই মনের শখকে কেন জানি বন্দি করে রাখতে হয় নিজের মধ্যে। তারপরও এই সব টগবগে তরুণ একান্ত নিজের ইচ্ছায় অনেক কষ্টের মধ্যে নগরবাসীকে একটু আনন্দ দেবার ইচ্ছায় দুই চাকায় ঝুঁকিপূর্ণ কসরত করে যাচ্ছে।

প্রকাশিত : ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৫

০৩/০২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: