কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রো ড টু মে ল বো র্ন

প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারী ২০১৫

পাকিস্তানের অনন্য বিজয়

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের পঞ্চম আসর বসে ১৯৯২ সালে। যৌথ আয়োজনের ধারাবাহিকতায় এবারে আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হলো অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডকে। ফুটবলের মতো ক্রিকেটকেও বিশ্বায়ন করার লক্ষ্যে আইসিসি ইংল্যান্ডের বাইরে বিভিন্ন মহাদেশে বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়। তারই ধারাবাহিকতায় ইংল্যান্ডের পরে এশিয়া এরপর অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডকে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হয়। এবারও ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আফ্রিকাসহ অনেকেই আয়োজকের দাবিদার ছিল। বিশ্বখ্যাত বেনসন এ্যান্ড হেজেজ সিগারেট কোম্পানি পঞ্চম বিশ্বকাপ ক্রিকেটের স্পন্সর হতে আগ্রহ প্রকাশ করে। আর তাই পঞ্চম বিশ্বকাপ ক্রিকেটের নামকরণ করা হয় ‘রিল্যায়েন্স কাপ’। যদিও আইসিসি এর পরে আর কোন সিগারেট কোম্পানিকে স্পন্সর করেনি। এবারেও বিশ্বকাপে ৫০ ওভার করে খেলার নিয়ম করা হয়। এবারের বিশ্বকাপেও মোট ৩৯টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাইবুয়ে এবারের বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পায়।

যদিও অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের এটা প্রথম আয়োজন। পঞ্চম বিশ্বকাপ ক্রিকেট অবকাঠামো কিছুটা রদ-বদল করা হয়। প্রথম চারটে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ৮টি দলকে দুই গ্রুপে ভাগ করে গ্রুপ পর্বে খেলা হয়। এবারে বিশ্বকাপের আগে ১৯৯১ সালে দ. আফ্রিকার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে আইসিসি তাদের বিশ্বকাপে অংশ নেয়ার অনুমতি দেয়। ফলে এবারের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দল সংখ্যা হয় ৯টি। আর তাতেই গোল বেধে যায়। ফলে বিশ্বকাপের ফর্মেটে রদ-বদল করতে হয়। এবারে দুই গ্রুপ না করে করা হয় একটি গ্রুপ। যার কারণে গ্রুপ পর্বে রাউন্ড রবিন লীগে ৯টি দলকে একে অপরের বিপক্ষে খেলতে হয়।

পঞ্চম বিশ্বকাপে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ড অসাধারণ সূচনা করে। গ্রুপ পর্বের প্রথম ৭টি ম্যাচে একটানা জিতে নিজেদের বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তবে বিধি তাদের সহায় ছিল না। ফলে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে অপ্রত্যাশিতভাবে পাকিস্তানের কাছে হেরে যায়। যদিও তাতে তাদের গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে কোন অসুবিধে হয়নি। পাকিস্তান এ বিশ্বকাপে যে খুব একটা ভাল শুরু করেছিল তা নয়। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ৮ ম্যাচের ৪টিতে জিতে এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে রান রেটের ব্যবধানে সামান্য এগিয়ে কোন মতে টেনেটুনে ৪র্থ দল হিসেবে সেমি-ফাইনালের টিকিট পায়। এ বিশ্বকাপের অন্যতম অঘটন ছিল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জিম্বাইবুয়ের ৯ রানে জয়। এই হারের কারণে যদিও ইংল্যান্ডের সেমিতে খেলতে কোন অসুবিধে হয়নি।

এবারও বিশ্বকাপে অনেক অঘটন, অনেক নাটকীয়তা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংশয়ে ভরা ছিল। পাকিস্তানের মতো একটি দল কাপ জিতবে এটা বিশ্বকাপ শুরুর আগে অনেকেই ভাবতে পারেননি। এমন কী খোদ পাকিস্তানও নয়। সব সময় যে সেরা দল কাপ জিততে পারে না সেটা আবারও প্রমাণিত হলো। নিউজিল্যান্ড যে এবার কাপ জিততে পারবে না সেটা কারও মনেই হয়নি। গ্রুপ পর্বে যে নিউজিল্যান্ডের কাছে সব দল ধরাশায়ী হয় তারাই অপ্রত্যাশিতভাবে পরপর দুইবার পাকিস্তানের কাছে ধরা খেল। যে পাকিস্তানের সেমিতে ওঠাই ছিল সংশয়। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হার ও নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের জয় সব হিসেব-নিকেশ ওলট-পালট করে দেয়। অনেকেই ভেবেছিলেন দুই স্বাগতিকের ফাইনাল হবে। খেলা শুরুর পর সেমি-ফাইনাল পর্যন্ত সেটাই মনে হচ্ছিল। অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে ফাইনালে এসে যায় পাকিস্তান।

২১ মার্চ প্রথম সেমি-ফাইনালে অকল্যান্ডে স্বাগতিক নিউজিল্যান্ড পাকিস্তানের মোকাবেলা করে। নিউজিল্যান্ডের ২৬২ রানকে ৪ উইকেট হাতে রেখেই টপকে যায় পাকিস্তান। অপর সেমিতে ইংল্যান্ড-দ. আফ্রিকা দ্বৈরথে বৃষ্টির কল্যাণে ভাগ্যের জোরে জিতে যায় ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের ২৫২ রানের টার্গেট ছোঁয়ার পথে সহজে এগোচ্ছিল স্প্রিংবকরা। দুর্ভাগ্য দ. আফ্রিকার! ২৩২ রানে তাদের ইনিংস শেষ হয়। এ ম্যাচে দ. আফ্রিকার না জেতার কোন কারণই ছিল না। তারপরও তাদের আইসিসির দুর্বোধ্য নিয়মের কারণে তাদের হারতে হয়েছে। আর তাই অভিষেক বিশ্বকাপে ফাইনালে খেলার এমন কী কাপ জেতার সুযোগটা বৃষ্টি কেড়ে নেয়। তারা মাঠে কাপ না জিতলেও দর্শকদের বিচারে তারাই ছিল চ্যাম্পিয়ন।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে তিন চ্যাম্পিয়ন তিনবারের ফাইনালিস্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজ, স্বাগতিক ও ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া ও তৃতীয় বিশ্বকাপজয়ী ভারত এবার সেমি-ফাইনালের দেয়াল ডিঙাতেই পারেনি।

২৬ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ফাইনালে পাকিস্তান (৫০ ওভারে ২৪৯/১০ রান) ২২ রানে ইংল্যান্ডকে (৪৯.২ ওভারে ২২৭ রান) হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায়। পাকিস্তানের ইমরান খান ৭০, জাভেদ মিয়াঁদাদ ৫৬, ইনজামাম উল হক ৪২ রান করেন। ইংল্যান্ডের ডেরেক প্রিঙ্গল ২২ রানে ৩ উইকেট ও নেইল ফেয়ারব্রাদারের ৬২ রানও দলের হার বাঁচাতে পারেনি। পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরাম ও মুস্তাক আহমেদ ৩টি করে উইকেট নেন।

নিউজিল্যান্ডের মার্টিন ক্রো ৯ ম্যাচে ১১৪.০০ গড়ে ৪৫৬ রান রান ও পাকিস্তানের ওয়াসিম আকরাম ১০ মাচে ১৮.৭৭ গড়ে ১৮টি উইকেট নেন। চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান দলের নেতৃত্ব দেন ইমরান খান এবং রানার্স আপ ইংল্যান্ডের গ্রাহাম গুচ। পঞ্চম বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনা করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্টিভ বাকনার এবং নিউজিল্যান্ডের ব্রায়ান অলড্রিজ।

পঞ্চম বিশ্বকাপেও যে যোগ্য দল হিসেবে পাকিস্তান কাপ জয় করেছিল এ কথা অনেকেই মানবেন না। সব সময় যে সেরা দল কাপ জেতে না সেটা আরও একবার প্রমাণিত হলো। ক্রিকেট যে অনেকটা ভাল খেলা সেটাও আবারও প্রমাণিত হলো। ভাগ্য সহায় ছিল বলে তারা কাপ জিতেছে বলেই পাকিস্তান কাপ জিতেছে বলে অনেকে মনে করেন। কেননা এ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়াও ব্যালান্স দল ছিল। তারপরও তারা কাপ পায়নি। পাকিস্তান কাপ বিশ্বকাপ জিতেছে এটাই সত্যি, এটাই লেখা থাকবে ক্রিকেটবুকে। আর এই জয়ের পেছনে অবসর নিয়ার পরও আবার ফিরিয়ে আনা অধিনায়ক ইমরান খানের সুযোগ্য নেতৃত্ব একটি বড় ভূমিকা পালন করে।

(চলবে)

e-mail : syedmayharulparvey@gmail.com

প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারী ২০১৫

১৪/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: