আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হাওড় মোদের পাঠশালা

প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪

সারাদিন ক্লাস করা, লাইব্রেরিতে যাওয়া, রাতে প্র্যাকটিক্যাল লেখা আর এ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করা। সময়ের ফাঁকে খাওয়া বাকিটা ঘুম। এমনি করেই কেটে যায় বাকৃবির শিক্ষার্থীদের নিত্যদিন। রাতের বেলা বাবা-মায়ের শিকল থেকে মুক্ত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের অনেকের মনের হয়তো আকুতি জেগেছে, আর না, অনেক হয়েছে, জীবনের আর কতটুকুই বা আছে খাইদাই, ফুর্তি করি। কিন্তু জীবনে বড় হওয়ার প্রচেষ্টা আর ক্লাস পরীক্ষার চাপ সকালের ঘুম ভাঙতেই মিথ্যে করে দেয় সব চিন্তাগুলোকে। তারপরও রুটিনমাফিক জীবন কাটানোর ফাঁকে ফাঁকে দেখা মিলে যায় কিছু স্মৃতিময় দিন। এখানকার শিক্ষার্থীদের প্রায়োগিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তবিক জ্ঞান দানের জন্য প্রতি সেমিস্টারেই (৬ মাস) আয়োজন করা হয় শিক্ষা সফরের। নিজেদের শিক্ষা জীবনের তাগিদের পাশাপাশি দেশকে চেনা, জানা, সর্বোপরি প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়া। সম্প্রতি শিক্ষা সফরের আনন্দে মেতেছিল বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। ৩ দিনব্যাপী শিক্ষা সফরটিতে কোর্স শিক্ষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শহীদুল হক ও সহযোগী অধ্যাপক কানিজ ফাতেমার তত্ত্বাবধায়নে গিয়েছিলাম সিলেট ও মৌলভীবাজারের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম হাওড় হাকালুকি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাফলংয়ে।

২৭ নবেম্বর বৃহস্পতিবার ৭টায় গড়াল গাড়ির চাকা। বাস ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসের ভেতর শুরু হয় উৎসবের কলরব। বাসের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাচ, গান, আড্ডা আর হৈ-হুল্লোড় আরও বাড়তে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের স্মৃতিকে ধরে রাখতে চলে ফটোসেশন। কেউ গান শুনছে বা গাইছে, কেউ দাঁড়িয়ে বাসের সামনের পথ দেখছে। সময়ের সঙ্গে বেড়েই চলছিল আনন্দ-উল্লাস আর না দেখাকে দেখার প্রবল আগ্রহ। বিকেল সাড়ে ৪টায় পৌঁছলাম মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায়। কুলাউড়া ডাকবাংলোতে চলল আমাদের সারারাত গান-বাজনা আড্ডাবাজি। পরদিন সকাল বেলা পাড়ি জমায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম হাওড় হাকালুকিতে। মৌলভীবাজারের বড়লেখা, জুরী, কুলাউড়া ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ উপজেলায় ৩৯,৩২৩ হেক্টর জমিতে বিস্তৃতি হাওড়টিতে ২০১০ সালে মাছের উৎপাদন ছিল ৫ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। ২৭৬টি বিলের সমন্বয়ে গঠিত হাওড়টির বর্ষাকালের দিগন্তজোড়া বিস্তৃত জলরাশি দেখে মনে হবে যেন এ এক ভাসমান সাগর। জনসংখ্যার দিক দিয়ে প্রায় ২ লাখ মানুষ এর ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তবে একসময় হাওড়টিতে প্রায় ১০৭ প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে পাওয়া যায় ৬৩ প্রজাতি। চিতল, পাবদা, রাণী, মেনী, গুলশা, বাঁশপাতি, চেপচেলা, গুতুম, মহাশোল, বানি টুনার মতো প্রায় ৪৪টি সুস্বাদু মৎস্য প্রজাতি এখন বিলুপ্তপ্রায়। যদিও এই হাওড়টি রক্ষায় বর্তমানে সরকারী-বেসরকারী পর্যায়ে তদারকি শুরু হয়েছে তারপরও হাওড়টি রক্ষায় এখনই দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া অতীব প্রয়োজন।

শনিবার সকালে পাড়ি জমায় সিলেটের জাফলংয়ের পথে। ওপারে খাসিয়া পাহাড়, এপারে নদী। পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে চলছে ঝর্ণা, আর নদীর বুকে স্তরে স্তরে সাজানো নানা রঙের নুড়ি পাথর। দূর থেকে তাকালে মনে হবে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে নরম তোলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে মেঘরাশি। প্রকৃতির এক অপূর্ব সৌন্দর্যের নাম জাফলং। সবুজের বুকে নেমে আসা ঝর্ণাধারায় সূর্যের আলোর ঝিলিক ও পাহাড়ের চূড়ায় গহীন অরণ্যের ওপর দিয়ে ভেসে বেড়ানো মেঘমালা আমাদের মুগ্ধ করে। রাতে রাস্তা পথে আসতে আসতে ইমরান, সৃজন, প্রিতম, পলাশ, ফেমাস, কৌনিক, সজিবরা শুরু করে গানের আসর। একই সঙ্গে সাদী, আজিজ, হাসিব, শামীম, মুন্নি, রুমী, সামান্ত, বরকত, ছন্দা, নাফিসা, নিশাতরা শুরু করে করল স্মৃতির রোমন্থন। তবে যাই হোক না কেন পুরো সফরে শহিদুল হক স্যার, অর্ণব স্যার ও ম্যাডামের আন্তরিকতা, রাতের আড্ডা, তাস খেলা, হাকালুকি দেখা, কুলাউড়ার ভুনাপুরি, চা, জাফলংয়ের ফটোসেশন, চা কিনা, মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক কৃষিবিদ মোঃ কামরুল হাসানসহ সুলতান-রাসেল ভাইদের আন্তরিকতা কোনদিনও ভোলার নয়। নিজেদের অভিমত ব্যক্ত করতে গিয়ে ইউসুফ, আরিফ, সাদি, হাসিব, আজীজ, মাসুদ, বরকত, তৌকির বলেন, জীবনের এত মজাদার আনন্দক্ষণ কখনও পাব কিনা জানি না। প্রকৃতির নিয়মে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যাব কিন্তু , বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কাটানো দিনগুলো স্মৃতির পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে চিরজীবন।

মো. ইউসুফ আলী

প্রকাশিত : ২৮ ডিসেম্বর ২০১৪

২৮/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: