মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সাফল্য-শিরোপায় ভরপুর শেখ জামাল

প্রকাশিত : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৪
সাফল্য-শিরোপায় ভরপুর শেখ জামাল
  • মজিবর রহমান

সাফল্য সব সময়ই আনন্দের। শিক্ষা, খেলাধুলা, ব্যবসা, চাকরি, সমাজসেবা-জীবনের সর্বক্ষেত্রে। তবে প্রতিবদনের প্রতিপাদ্য বিষয় ক্রীড়া। এই ক্ষেত্রে অর্জনটা যদি হয় বিদেশের মাটিতে, বড় কোন আসরে, সেই সাফল্যের তৃপ্তি অনেক মধুর। সেটা আরও মর্যাদার হয়ে ওঠে যখন তা মুখ উজ্জ্বল করে দেশ ও জাতির। বহমান ঋতু বৈচিত্র্যে চিরন্তন ধারাবাহিতকায় প্রকৃতির গায়ে এখন শীতের আবরণ। কিন্তু প্রকৃতির এই রূপ পরিবর্তনের মাঝে উষ্ণতা, উত্তাপ যেন একটুও বদলায়নি। সবই আছে সেই আগের মতোই। বিষয়টা শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাবকে ঘিরে। ২৭ ডিসেম্বর ঢাকায় কোরিয়ার লীগ চ্যাম্পিয়ন বুসান আই পার্ক ক্লাবের বিরুদ্ধে মাঠে নামার লক্ষ্যে, প্রত্যাশিত রেজাল্ট অর্জনে শেখ জামালের ফুটবলাররা টগবগ করে ফুটছে। সদ্য সমাপ্ত ভুটান কিংস কাপ ফুটবলে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উত্তাপের পারদটা নিচে নামাতে পারেনি ঋতুরাজ বসন্ত শেষে শীতের তীব্রতা। বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাসে গৌরব গাথা শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাবের ক্ষেত্রে এটি একটি নির্জলা সত্য, বাস্তব এক অনুভূতি। ভুটানের কিংস কাপে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেখ জামাল ধানম-ি দেশের ফুটবলে একটি গৌরবগাথা নাম, একটি ইতিহাস। অতীতে বিদেশের মাটিতে আন্তর্জাতিক আসরে ট্রফি জয়ের রেকর্ড নেই ঢাকার কোন ক্লাবের। বিজয়ের মাসে যেন আরেকটি বিজয় উপহার দিয়েছেন অকুতোভয় সৈনিকের মতো শেখ জামাল ধানম-ির বীর ফুটবলাররা। কাজেই একে শুধু বছরের সেরা সাফল্য নয়। ক্লাব পর্যায়ে যুগ-যুগান্তরের সেরা অর্জন। ফাইনালে ভারতের পুনে এফসিকে হারিয়ে শেখ জামালের শিরোপা জয় দেশের ফুটবলকে নিয়ে গেছে অন্য উচ্চতায়। কাজেই অর্জিত এই সাফল্য শুধু দলটিরই নয়, জাতির জন্যও বিরাট গর্বের।

এখানেই শেষ নয়। ২০১১ সালে নেপালের পোখরা সাফাল গোল্ডকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় মুখরিত হয়েছিলেন এদেশের লাখো কোটি ফুটবল অনুরাগী। আর ঘরোয়া ফুটবলের ঈর্ষণীয় ইতিহাস, শিরোপা আর শিরোপা ক্লাবটিকে অতি অল্প সময়ে পরিণত করেছে পরাশক্তিতে। খেলোয়াড়রা মাঠে খেলেন। প্রশিক্ষকের দিক নির্দেশনায় লক্ষ্য পূরণের জন্য নিঃসন্দেহে তাদের ভূমিকা, কৃতিত্ব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সব সাফল্যের পেছনেই একজন নেপথ্য কারিগর থাকেন। যার হাতের সুনিপুণ ছোঁয়ায় বদলে যায় সবকিছু। সাদামাটা পরিবেশটা হয়ে ওঠে ছিমছাম পরিপাটি এক গোছাল সংসার। পর্দার অন্তরালে থাকা সাফল্যের এই কারিগর আর কেউ নন, মনজুর কাদের। যাকে দেশবরেণ্য ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য সমালোচকরাও। কথার ফুলঝুরি ছিটিয়ে নয়। কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন মনজুর কাদের তার মতো নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক এদেশে হাতে গোনা। যদিও তার ভাগ্যে এখনও জুটেনি জাতীয় কোন পুরস্কার। এ নিয়ে অবশ্য আক্ষেপ-ক্ষোভ নেই তার। সদালাপী এই ক্রীড়া সংগঠক কোন দিন মুখ ফুটে কাউকে কখনও তা বলেননি। গাঁটের অঢেল অর্থ খরচ করে নিরলস সেবা দিয়ে যাচ্ছেন দেশের খেলাধুলায়। উদারমনা এক ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব। যেখানেই হাত দেন সেখানেই সোনা ফলিয়ে ছাড়েন। দেশের ঐতিহ্যবাহী আবাহনীর জার্সিতে ফুটবল খেলেছেন, দলটির সফল ম্যানেজার হিসেবেও তার রয়েছে যথেষ্ট সুনাম। তবে মনজুর কাদের ক্রীড়াঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছিলেন নব্বইয়ের দশকে সাদামাটা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্রকে রাতারাতি ‘ড্রিম টিম’ এ পরিণত করে। তৎকালীন মোহামেডান, আবাহনী ও ব্রাদার্সের একচ্ছত্র অধিপত্যে খর্ব করে তিন ক্লাবের সেরা, তথা তারকা ফুটবলারদের দলে ভিড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাকে পরিণত করেন ‘জায়ান্ট টিম’ হিসেবে। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা যেন সেদিন ঢাকার ফুটবলের ময়দানী যুদ্ধের আরেকটি ‘ফ্রন্ট’ তৈরি করে পরিণত হন খবরের শিরোনামে। বর্তমানে তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থাকলেও সেরা দলের একটি হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে নামের সুবিচার করে।

পরবর্তী মিশন-নতুন আদলে তৈরি করা শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাবের সভাপতি মনজুর কাদের, জেলা ফুটবল লীগ কমিটির চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সম্মানিত পরিচালক ও উত্তরা ক্লাবের সভাপতি। ২৫ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য উত্তরা ক্লাবের সভাপতি পদে এবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দেশবরেণ্য এই সংগঠক। বিগত এক বছরে উত্তরা ক্লাবকেও একটি আধুনিক সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে নিরলস শ্রম দিয়েছেন। খরচ করেছেন গাঁটের অঢেল অর্থ। তৈরি করেছেন ‘মনজুর কাদের সিনে প্লেক্স।’ পাঁচ কোটি টাকার সংস্কার কাজের তিন কোটি টাকা দিয়েছেন নিজের পকেট থেকে। ‘উত্তরা ক্লাবকে আরও আধুনিকায়নে একটা মাস্টার প্লান তৈরি করেছি। আমাদের সাড়ে ১৩শ’ মেম্বার রয়েছে। কেবল তারা চাইলে এই পদক্ষেপটা কার্যকর করা সম্ভব। নিয়ম আছে আমাদের ক্লাবের সন্তানদের বয়স ২৬ হলে তারা ( কোটা দু’জন) ক্লাবের সহযোগী সদস্য পদ পাবেন। কিন্তু সাত বছর পর সেটা থাকবে না। তাদের চলে যেতে হবে। কিন্তু আমি চাচ্ছি, তারা তো আমাদেরই সন্তান। ফলে সাত বছর পূরণ হওয়ার পর কেন তারা চলে যাবে। ন্যূনতম পরিমাণ ফি দিয়ে তাদের পূর্ণ সদস্য করে ক্লাবে রেখে দিতে চাই। আলাপে জানালেন মনজুর কাদের। এবারের নির্বাচনে এটাই তার অঙ্গিকার-মূল শর্ত।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য সন্তান শহীদ শেখ জামালের নাম যুক্ত করে লে. শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাব লিমিটেড ( অতীত নাম ধানম-ি ক্লাব) নতুন রূপে আবির্ভাব হওয়ার পর বিশেষ করে ফুটবলে একটি ঝড় তোলা দলে পরিণত হয়েছে। দেশের সেরা ফুটবলারদের নিয়ে ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো একটি সমৃদ্ধ দল গঠন করায় দেশের ফুটবলাররা অতীতের চেয়ে এখন কয়েকগুণ বেশি পারিশ্রমিক পাচ্ছেন। একই সঙ্গে আমরাই সবচেয়ে উন্নতমানের, মেধাবী বিদেশী ফুটবলার দলে নিচ্ছি মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে। শেখ জামাল ধানম-ি বর্তমানে দেশের সবচেয়ে আধুনিক ক্লাব। জরাজীর্ণ অবস্থা থেকে সু-সজ্জিত, চোখে পড়ার মতো পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। আমি মনে করি সাফল্যের জন্য কেবল ভাল মানের খেলোয়াড় যথেষ্ট নয়। ক্লাবের পরিবেশ একটি মুখ্য বিষয়। এখানে গড়ে তোলা হয়েছে দেশের সবচেয়ে চমৎকার প্রশিক্ষণ মাঠ। ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়া আন্তর্জাতিক মহিলা ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলতে এসে বিদেশেী দলগুলো অনুশীলন করে ভূয়সী প্রশংসা করেছে ক্লাবের পরিবেশ ও মাঠের। এটা দেশের জন্যও সম্মানের। লে. শেখ জামাল ক্রীড়া কমপ্লেক্সে আরও রয়েছে বাস্কেটবল, টেনিস কোর্ট, ক্রিকেট প্রাকটিস পিচ। পাশাপাশি একটি সুইমিংপুল নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। ঠিক একইভাবে উত্তরা ক্লাবকেও আরও আধুনিকায়ন করাই আমার মূল লক্ষ্য, একটানা বলে গেলেন মনজুর কাদের। আরও সংযোজন, শুধু পুরুষ নয়। মহিলা ফুটবলেও চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেখ জামাল ধানম-ি ক্লাব অতি অল্প সময়ে দেশের আলোচিত একটি দল। রয়েছে প্রিমিয়ার ডিভিশনে খেলা ক্রিকেট দলও। নিজের ব্যবসা, বাণিজ্য সামাল দিয়ে সূচারুভাবে ক্লাব পরিচলানা অনেক কষ্টের। তবু আমি সেটা করে যাচ্ছি, আশা করি অত্যন্ত সফলভাবে। কারণ একটাই, খেলাধুলার সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক। মনের টান না থাকলে এটা সম্ভব হতো না।

প্রসঙ্গত, নেপালের সাফাল পোখরা গোল্ডকাপ ও ভুটানের কিংস কাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছাড়াও ভারতের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী আইএফএ শিল্ডে রানার্সআপ হয়ে শেখ জামাল বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। ২০১০-১১ মৌসুমে শেখ জামাল ধানম-ি ঘরোয়া ফুটবলে নতুন রূপে পা রেখে ফেডারেশন কাপে রানার্সআপ, পেশদার ফুটবল লীগে চ্যাম্পিয়ন হয়। এছাড়া মহিলা ক্রিকেট লীগে রানার্সআপ। পরের মৌসুমে ফেডারেশন কাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন, মহিলা ফুটবলে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন, প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লীগে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। ২০১২-১৩ মৌসুমে চ্যাম্পিয়নের স্বাদ নিতে না পারলেও পাঁচটি আসরে রানার্সআপ হয়ে রেকর্ড করে শেখ জামাল ধানম-ি। এর মধ্যে রয়েছে, ফেডারেশন কাপ, স্বাধীনতা কাপ, পেশাদার ফুটবল লীগ, মহিলা ক্রিকেট লীগ ও প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট। ২০১৩-১৪ মৌসুমটা দলটির স্বর্ণালী সাফল্যের সঙ্গী। কিংস কাপ ফুটবলে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন, পেশাদার ফুটবল লীগে চ্যাম্পিয়ন, ফেডারেশন কাপে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন এবং কোলকাতার ১১তম আইএফর শিল্ডে রানার্সআপ। পরিসংখ্যান প্রমাণ করছে, দেশে ও দেশের বাইরে সাফল্য যেন দলটির নিত্যসঙ্গী।

প্রকাশিত : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৪

২৪/১২/২০১৪ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: