ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

মূল্য না পেয়ে ফেলে দিয়েছে অনেকে

কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস ॥ কার্যকর হয়নি সরকারি দাম

এম শাহজাহান

প্রকাশিত: ০০:২১, ২০ জুন ২০২৪

কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস ॥ কার্যকর হয়নি সরকারি দাম

সরকার নির্ধারিত দামে কোরবাানির কাঁচা চামড়া বেচাকেনা হয়নি

ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়ার পরও ঢাকাসহ দেশের কোনো জায়গায় সরকার নির্ধারিত দামে কোরবাানির কাঁচা চামড়া বেচাকেনা হয়নি। নির্ধারিত দামের চেয়ে কমমূল্যে চামড়া কিনেছেন এ খাতের আড়তদার, পাইকার ও ট্যানারি মালিকরা। প্রকৃত দাম না পেয়ে দেশের অনেক স্থানে গতবারের মতো কাঁচা চামড়া ফেলে দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণে ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে নামমাত্র দামে। ভালো দাম না পাওয়া, পশুর গা থেকে ছাড়ানোর সময় চামড়া কেটে ফেলা এবং সময়মতো লবণ দিয়ে সংগ্রহ না করাসহ নানা কারণে এ বছর ৩০ শতাংশ পর্যন্ত চামড়া নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার সারাদেশে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ গবাদিপশু কোরবানি করা হয়েছে। অর্থাৎ সঠিক ব্যবস্থাপনায় সংগ্রহ করা হলে এক কোটি পিসের বেশি চামড়া পাওয়া যেত। যার আন্তর্জাতিক বাজার মূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে এবারও কাঁচা চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 
কোরবানির দিন পাইকারি বাজার হিসেবে খ্যাত ঢাকার পোস্তায় দুপুরের পর থেকে শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে ট্রাক, পিকআপ, অটোরিক্সা ও ভ্যানে করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া নিয়ে আসেন। কিন্তু মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এসে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া বেচতে পারেননি। ওই সময় পোস্তার আড়তদাররা প্রতি পিস গরুর চামড়া আকার ও সাইজভেদে ২০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং ছাগলের চামড়া প্রতি পিস ৫ থেকে ১০ টাকায় কিনেছেন। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায় থেকে তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছেন।

এতে করে যারা কোরবানি দিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে প্রতি পিস গরুর চামড়া আটশ থেকে ১ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে। এ ছাড়া ছাগলের চামড়া কেনা হয়েছে প্রতি পিস গড়ে ৫০ টাকায়। কিন্তু পোস্তার আড়তদাররা এই দামে চামড়া কেনেনি। ফলে ঈদের দিন দুপুরের পর অনেক ব্যবসায়ী লোকসান দিয়ে চামড়া বিক্রি করে পোস্তা ছেড়ে চলে যান। এদিকে, পোস্তা, হাজারীবাগ ও সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়ার সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর হচ্ছে না-এ খবর তাৎক্ষণিক মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।

ফলে কোরবানির দিন দুপুরের পর মাঠ পর্যায়েও চামড়ার দরে ধস নামে। মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা কিংবা অন্য যেসব দাতব্য প্রতিষ্ঠান চামড়া সংগ্রহ করেছে তারাও শেষ পর্যন্ত পানির দরে চামড়া বিক্রি করে দিয়েছে ব্যবসায়ীদের কাছে। এতে করে ঢাকাসহ সারাদেশে চামড়ার দাম নিয়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। দাম না পেয়ে কেউ কেউ চামড়া রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন। জানা গেছে, কোরবানির চামড়া সংরক্ষণ এবং ন্যায্য দাম নিশ্চিত করার স্বার্থে জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে আগেই স্থানীয় পর্যায়ে এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রেরিত ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, লবণ দিয়ে আগে চামড়া সংরক্ষণ করে তা বিক্রি হবে। তবেই চামড়ার ভালো দাম পাওয়া যাবে। কিন্তু ঢাকা এবং অন্যান্য জেলায় সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে বেশিরভাগ চামড়া ঈদের দিন লবণ ছাড়াই যে যার মতো বিক্রি করে দিয়েছেন। ফলে এ খাতের অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও বেশি সুযোগ নিতে পেরেছেন। ঢাকার মৌসুমি ব্যবসায়ী, মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ ঈদের দিনই নামমাত্র মূল্যে চামড়া বিক্রি করে দিয়েছেন। কেউ লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

এতে করে প্রকৃত দাম না পাওয়ার পাশাপাশি অনেক স্থানে চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। খিলগাঁও ঈদগাহ মসজিদ, মাটির মসজিদসহ ওই এলাকার কয়েকটি এতিমখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। বরং কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে বিনামূল্যে চামড়া পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে খিলগাঁও উত্তর গোড়ান মাটির মসজিদ কমিটির সভাপতি আমির হোসেন হাওলাদার জনকণ্ঠকে জানান, মসজিদে অনেকেই চামড়া দান করেছেন।

এ কারণে আমরা চামড়া বেচে যা পেয়েছি সেটাই লাভ। সরকার নির্ধারিত দাম নিয়ে আমরা আসলে ভাবিনি। এ ছাড়া মসজিদে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। সেই জায়গাও মসজিদে নেই। তবে এটা ঠিক লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করা গেলে কয়েকদিন পর ভালো দাম পাওয়া যেত। তিনি আরও জানান, প্রতি পিস গরুর চামড়া মাত্র ২০০-৬০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। ছাগলের বেশিরভাগ চামড়া আমরা গরুর চামড়ার সঙ্গে ফ্রি দিয়ে দিয়েছি। শুধু গোড়ান নয়, এইভাবে চামড়া সংগ্রহ ও বিক্রি হয়েছে পুরো ঢাকা শহরে।

অথচ সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা ছিল, আগে লবণ দিয়ে চামড়া কয়েকদিনের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। এরপর বিক্রি করতে হবে। কিন্তু ঢাকাসহ দেশের কোথাও সেই উদ্যোগ দেখা যায়নি। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে এক ভ্যান চামড়া নিয়ে পুরান ঢাকার পোস্তার আড়তে এসে জামাল হোসেন হতাশ হয়েছেন। তিনি বলেন, গতবারের চেয়ে এবার বাজার একটু ভালো মনে হয়েছিল। কিন্তু আমার চামড়া বড়। দাম আরও বেশি আশা  করেছিলাম। সেই দাম দেওয়া হয়নি।

একেকটি চামড়ার দাম ১২০০ টাকা করে চাইছিলাম। কিন্তু আড়তদার ৭০০ টাকার বেশি দেয়নি। সরকার নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজার দরের পার্থক্য  দেখে ‘ন্যায্য দাম’ না পাওয়ার অভিযোগ করছেন অনেকে। বাড্ডা রামপুরা থেকে ২৫০টি চামড়া নিয়ে পোস্তা এসেছেন আব্দুল খালেক। তিনি বলেন, এখানে বর্গফুটের কোনো হিসাব নেই। সংখ্যা হিসাবে বিক্রি করতে হচ্ছে। সরকারের নিয়ম মানলে তো অনেক টাকা পাওয়া যেত।

পোস্তায় কয়েক ঘণ্টা ঘুরে দেখা গেছে, গরুর চামড়ায় ছিদ্র থাকলে সেগুলো নিতে চায় না আড়তদাররা, অনুরোধ করলে দাম দেয় ২০০ টাকার মতো। মাঝারি থেকে বড় গরুর চামড়া প্রতি পিস ৭০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। গত কয়েক বছরের মতো এবারও খাসির চামড়ার চাহিদা নেই, নিতে চাইলেও ৫-১০ টাকা করে দাম বলা হচ্ছে আড়ত থেকে। এদিকে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সমিতির সভাপতি আফতাব উদ্দিন জনকণ্ঠকে বলেন, পোস্তার চেয়ে বেশি আড়ত বর্তমানে হেমায়েতপুরে।

×