কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

উড়তে থাকা ‘ছাই’-এর গল্প

প্রকাশিত : ১৮ জুন ২০১৫

ঘড়ির কাঁটা চারটা ছুঁই ছুঁই। জেগে আছে রাত, শহুরে নিয়ন আলো, কিছু ছোট পোকা এবং আরও অনেকেই। মাথার উপর শব্দ করে বাতাস দোলাচ্ছে ঝুলন্ত ফ্যান। জেগে আছে এ্যাশেজের ভোকাল জুনায়েদ ইভানও। শুরু হলো আড্ডা। নামটা ‘ছাঁই’ না হয়ে ‘এ্যাশেজ’ কেন? প্রথম প্রশ্নেই একটু নড়েচড়ে বসলেন তিনি। বললেন, ‘উচ্চারণের দিক থেকে এ্যাশেজ শুনতে অনেক ভাল লাগে ছাঁই থেকে। সেজন্যই মূলত...।’ বাংলা গানের দলের নাম ইংরেজীতে, বিষয়টা হতাশার না? জানতে চাইলাম। জানালেন, ‘এই জিনিসটা তো তাহলে অন্যান্য ব্যান্ডের সঙ্গেও একই রকমই হবে। যেমন- এলআরবি, মাইল্স্, ওয়ারফেজ..,।’ তার মানে এলআরবি, মাইল্স্ ইংরেজীতে নাম দিয়েছে বলেই কি আপনারাও দিয়েছেন? ‘না। অবশ্যই না। শুধুমাত্র পছন্দ হয়েছে বলেই এমন নাম দিয়েছি। আর কিছু না। তবে আমরা বাংলাকে অসম্মান করতে চাইনি। বাংলা ব্যান্ডের নাম ইংরেজীতে থাকলে বিষয়টা বাংলার সঙ্গে বিরোধিতা করা হয় না, এটা বোঝানোর জন্য আমি ওদের উদাহরণ দিয়েছি।’ সরলভাবেই বললেন তিনি।

এখনকার অধিকাংশ অডিও এ্যালবামের নামই গতানুগতিক হয়। সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম এ্যাশেজ। তাদের প্রথম এ্যালবামের নাম ‘ছারপোকা’। কেন? জানতে চাইলাম। ‘আমরা তো সবাই-ই একদিন শেষ গন্তব্যে পৌঁছব। আমাদের এই যে বাড়িঘর, এই যে সবকিছু- সবই একদিন পরিণতির দিকে যাবে। ছারপোকাও ঠিক তাই। এখানে ছারপোকা একটা উপমা মাত্র। অর্থাৎ, মানুষগুলো ছারপোকার মতো।’ এভাবে ভাবলে তো তেলাপোকাও উপমা হিসেবে টানা যায়! রসিক বিস্ময় আমার। হাসলেন তিনি। হাসি থামিয়ে বললেন, ‘তখন তো আবার এটাও প্রশ্ন আসত যে, ছারপোকা নয় কেন? আসলে এটার উপস্থাপনা তো অনেকভাবেই করা যায়। ছারপোকা, তেলাপোকা, উঁইপোকা- যে কোন একটা হলেই হলো। আমাদের কাছে ছারপোকাটাই বেশি পছন্দ হয়েছে।’

বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মাঝেমধ্যে দুয়েকটা গাড়ির ছুটে চলার ছন্দবদ্ধ শব্দ ভেসে আসছে দূর থেকে। এ্যাশেজের বেশিরভাগ গানে এই একটা জিনিসের খুব অভাব, ছন্দবদ্ধতা বা অন্তঃমিল। কেন? এটার সঙ্গে কি শত্রুতা ভীষণ? ‘ঠিক তা নয়। এটা ইচ্ছা করে করা হয় না। আমাদের বেশিরভাগ গানের লিরিক হাতে-কলমে-কাগজে লেখা না। প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে আমি একটা পাহাড়ে বসে গান করি। ওই সময় যে সুরটা আসে, যে লিরিকটা আসে- সেটাই রাখা হয়। এডিট করে তো পরে অনেক কিছুই করা যায়, অনেক ভাল লিরিকও বসানো যায় সেই সুরে- আমরা সেসব করি না।’ ব্যাখ্যা দিলেন ইভান। গানের সঙ্গে অন্তঃমিলটা খুব বেশি জরুরী বলেও মনে করেন না তিনি। ছন্দ ঠিক রাখার জন্য নয়, এর সঙ্গে ছয় মিলিয়ে লিখতেই হবে, এমনটাও মানেন না। শুধু মনে করেন, ‘যেটাই লেখা হোক, শুনতে যেন শ্রুতিকটু না লাগে। তাহলেই ঠিক আছে।’এ্যাশেজ মূলত সাইকেডেলিক রক ব্যান্ড। তাদের অনুপ্রেরণা পিঙ্ক ফ্লয়েড, ইউ-টু, অঞ্জন দত্ত। প্রথম এ্যালবামের পর পরই প্রচুর সুনাম অর্জন করেছেন তারা। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তো বটেই, কলকাতা থেকেও এসেছে অনেক ভাল মন্তব্য। কারণটা কি অঞ্জন দত্ত?

হাসলেন আবারও ইভান। বললেন, ‘কলকাতার মানুষ বোধ হয় এই সব গান একটু বেশিই পছন্দ করে।’ কিন্তু এত দ্রুত এতগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার পেছনে তো নিশ্চয়ই আরও কিছু কারণ আছে? ‘তা তো বটেই। এ্যালবামটার শুরুর দিকে কিছু সিনিয়র সঙ্গীতশিল্পী আমাদের সাহায্য করেছিলেন। আর্টসেলের লিংকন ভাই, শিরোনামহীনের তুহিন ভাই ও জিয়া ভাই এবং ওয়ারফেজের অনি ভাই ও শামস্ ভাই তাদের মধ্যে অন্যতম। এটা একটা কারণ...। পরবর্তীতে ক্রমশ অগ্রসর হওয়ার পেছনে গানের লিরিকগুলো বোধ হয় সহায়তা করেছে আমাদের। সুর, সঙ্গীত, গায়কী তো আছেই।’

বাজার মেপে গান করার ইচ্ছা একদমই নেই এ্যাশেজের। নিজেদের মতো করেই করতে চান সব। পরবর্তী এ্যালবামের কাজও শুরু হয়ে গেছে এরমধ্যেই। দশটা গান থাকবে ওই এ্যালবামে। সেগুলোও প্রায় তৈরি হয়ে গেছে। জুনায়েদ ইভান (ভোকাল), সুলতান রাফসান খান (গিটার), ওয়াহিদুজ্জামান তুর্য (বেজ গিটার), আদনান বিন জামান (কী-বোর্ড), তৌফিক আহমেদ বিজয় (ড্রামস্) ও আমির খান (ম্যানেজার)Ñ এই ক’জন মিলেই এখনকার এ্যাশেজ।

শুধু এই এ্যাশেজই নয়, অনেক নতুনই এখন ভাল করছে গানে। সিনিয়ররা তো বটেই। তবুও আমরা ভিন্ন ভাষার গান, ভিন্ন দেশের তারকাদের প্রতি অতি আকৃষ্ট। এটা সব সময় মন্দ নয়। কিন্তু কিছু কিছু সময় যখন ভিন্ন দেশের তারকাদের প্রতি আকৃষ্টতার কারণে অবজ্ঞার শিকার হয় নিজের দেশের তারকারাই, তখন সেটা সত্যিই মেনে নেয়া যায় না। আমার কথায় সায় দিলেন ইভানও। জানালেন, ‘একবার একটা কনসার্টে বাইরের দেশের ভাল একটা ব্যান্ড এসেছিল আমাদের দেশে, হেলিকাপ্টারে করে। অথচ সেই একই কনসার্টে আমাদের আজম খান রিক্সায় করে এসেছিলেন। এটা নিশ্চয়ই আমরা আশা করি না! আমরা কেন যেন বাইরের দেশের কাউকে পেলেই নিজের দেশের লিজেন্ডদের ভুলে যাই। এটা উচিত নয়।’ আসলেই... এই উচিত-অনুচিতের ব্যবধান যত দ্রুত সবাই বুঝতে পারবে, তত দ্রুতই এগিয়ে যাবে দেশ।

সময় থেমে নেই। এগিয়েই চলছে উত্তপ্ত আবহাওয়াকে সাক্ষী করে। রাতকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য ভোর উঠে দাঁড়িয়েছে প্রায়। শুরু হয়েছে ঝুম বৃষ্টি। বাইরের কোন এক টিনের চালে সেই বৃষ্টির কণাগুলো পড়ে দুমড়ে হাহাকার করে উঠছে। আড্ডা থামাতেই হলো। তখনও পিসির ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজেই চলছে এ্যাশেজের গান, ‘হঠাৎ করে কেঁদে ওঠে সে, কী যেন এক কান্না ছিল, কী যেন এক আকাশ ছিল, আকাশটা চুরি হয়ে গেছে... লা লা লা, লা লা লা... আজ আমার মন ভাল নেই...।’

প্রকাশিত : ১৮ জুন ২০১৫

১৮/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: