কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

একজন কাঞ্চনমালা

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫
  • রহিমা আক্তার

‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়

দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে কে পরিবে পায়।’

স্বাধীনতা জাতীয় জীবনে অর্জিত একটি লাল তারিখ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই দেশের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র স্বাধীনতার সংগ্রামে নারী-পুরুষ ভেদে বাঙালী জাতি যে বীরের জাতি, তা প্রমাণ হয় স্বাধীনতার যুদ্ধে। সেই বীর গাথা বাঙালী আর বীর সন্তানদের কথা আমরা ভুলতে পারিনি। পারিনি মুক্তিযুদ্ধের কথা ভুলতে, পারিনি শহীদদের আত্মত্যাগ আর আমাদের সংগ্রামী নির্যাতিতা নিপীড়িতা নারীদের কথা। শোষণ নিপীড়ন নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল এ দেশের মানুষ। দেশের মানুষের সামনে উন্মোচিত হয় পাকিস্তানী শাসকচক্রের মুখোশ। তারই প্রতিবাদে বাংলার দামাল সন্তানরা বের হয়ে আসে। ঘরে বসে থাকেনি আমাদের কিশোরী নববধূ, গৃহবধূ থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবীরা। সংগ্রামে অংশীদার হয় সবাই। একটি প্রবাদ আছেÑ ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’। আমাদের যে নারীরা সুখের স্বপ্নে, সংসারের স্বপ্নে বিভোর ছিল, তারাও বের হয়ে আসে দেশকে স্বাধীন করার জন্য। সেসব নারীকে কিভাবে আমরা সম্মান করব জানি না। যে সব নারী শরীরের রক্ত ঝরিয়েছে, দেশের জন্য ইজ্জত হারিয়েছে আর নির্যাতিতা নারী হিসেবে সমাজে পরিচিত হয়েছে, তাদের কোন্ আসনে আমরা রাখব জানি না। তারা কি এতটুকু সম্মান আর সহানুভূতি পেতে পারে না!

সে সব নারীর একজন হলেন ‘কাঞ্চনমালা’। মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার ‘কাঞ্চনমালা’ নিজ মুখেই স্বীকার করেছেন, ৩ পাকসেনা খতম করেছেন। মোট ৪ জনকে শেষ করেছেন তিনি। নববিবাহিতা কাঞ্চনমালা চোখে-মুখে নতুন সংসারের স্বপ্ন বুনতে বুনতে দিন পাড় করছেন। চলছে ১৯৭১-এর মার্চ মাস। বাবার বাড়ি ঢাকায় বেড়াতে এসে দেখতে পান ঢাকার অবস্থা খুব খারাপ। থমথমে ভাব। ফিরে যান গ্রামে, গ্রামেও ঠিক একই অবস্থা। সেই দিনটি ছিল ২৮ মার্চ। দুপুর ৩টায় শ্বশুরবাড়ির সবাই মিলে খেতে বসেন। হঠাৎ শুনতে পান পাকিস্তানী মিলিটারি বাড়িতে আসছে। সবাই যার যার মতো পালিয়ে যাচ্ছে। কাঞ্চনমালা তা করেননি। খেঁজুর গাছ কাটার দা হাতে করে দরজার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন। পাকিস্তানীরা ঘরে ঢুকতেই একে একে ৩ জনের গর্দানে কোপ দেন। এরপর পাকিস্তানী মেজর জাহিদ কাঞ্চনকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় নেত্রকোনা জেলার বিরিসিরি ক্যাম্পে। মেজরের রুমেই তাকে আটকে রাখা হয়। পাশের রুমে ছিল বাঙালী অনেক নারী। যাদের প্রতি মুহূর্তে অত্যাচার করত পাকিস্তানী হায়েনাগুলো। মেজর কাঞ্চনকে বিয়ের প্রস্তাবও দেয়। পরিস্থিতি দেখে কাঞ্চন রাজি হয়। সব সময় পালিয়ে যাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এক সময় মেজরের সঙ্গে অভিনয় শুরু করে। পাশের রুমে থাকা মহিলাদের দায়িত্ব নিতে চায়। বাঙালী নারীদের অত্যাচার দেখে সহ্য করতে না পেরে মেজরের কলার ধরে প্রতিবাদ করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মেজর কাঞ্চনমালাকে অনেক নির্যাতন করে। আশপাশের গ্রাম দেখার অনুরোধ করে কাঞ্চন। মেজরও যেতে দেয়। কাঞ্চন খুব সাহসী। যে কোন মুহূর্তে কিছু করতে পারে ভেবে ওনাকে পাহারা দেবার জন্য ১০-১২ জন গার্ড সঙ্গে দেয়া হতো। একদিন কাঞ্চন রেগে গিয়ে এক গার্ডের মাথায় কাঠ দিয়ে আঘাত করে। গার্ড সেখানেই মারা যায়। এই অপরাধে মেজর কাঞ্চনমালার পেটে গুলি করে বিরিসিরি নদীতে ফেলে দেয়। হিন্দু এক বয়স্ক মহিলা কাঞ্চনকে নদীর তীরে পেয়ে বাসায় নিয়ে ২ দিন রাখে। কাঞ্চনের সারা শরীরে জখমের ক্ষতগুলো দগদগ করছে। ২ দিন পর কাঞ্চন শিবগঞ্জ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভবানীপুর ক্যাম্পে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা কাঞ্চনমালাকে দেখেই বলেছে, ও বাঁচবে না। ক্যাম্পে কিছুদিন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলে যুদ্ধে যাবার কথা বললে অনেকে বাধা দেয়। বলে, মহিলা কী আর যুদ্ধ করবে। তখন কাঞ্চনমালা বলেন, ‘আমার যুদ্ধ তো কবেই শুরু হয়েছে। ৪ জন শেষ করে এসেছি’। সেখান থেকে বাঘমারা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ শেষে অনেক অপারেশনে যোগ দিয়েছেন। বার বার বলতেন, ‘অগো মাইরা ফেলতে পারলে দেশটা স্বাধীন হইব।’

দেশ স্বাধীন হবার পর টাঙ্গাইলের গোপালপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়িতে থাকা অবস্থায় ভাসুরের সঙ্গে দেখা হয় এবং ওনার সহযোগিতায় শ্বশুরবাড়ি ফিরে আসে। দেশ স্বাধীন হয়েছে, মাথার ওপর স্বাধীন দেশের পতাকা উড়ছে। কিন্তু কাঞ্চনমালার সংসার নেই আগের মতো। স্বামী তাঁর স্ত্রীর এই বীরগাথা দিনগুলো আর নির্যাতনগুলো মেনে নিতে পারেনি। তবুও শাশুড়ি আর ভাসুরের কথায় থাকতে শুরু করে। স্বামী কথা বলত না কাঞ্চনের সঙ্গে। অনেক সময় মেরে ফেলতে চেয়েছে। এসিড দিয়ে বা ধারালো ব্লেড দিয়েও মারতে চেয়েছে। এরই মাঝে কাঞ্চন ৪ সন্তানের মা হন। একদিকে সন্তানের মা হচ্ছে, অন্যদিকে স্বামী তাঁকে মেনেও নিচ্ছে না। নারী স্বামীর ঘর থেকে যেতেও পারে না। পরিবারের অন্যরা সহায়তা করলেও, প্রতি মুহূর্তে স্বামীর ধিক্কার, নোংরা ভাষার কথা, যা সহ্য করার ছিল না। ভাসুর আশ্রয় দিতে চাইলেও বিপত্তি ঘটায় স্বামী। বাধ্য হয়ে ৪ সন্তান ফেলে চলে আসে বাবার বাড়িতে। অক্ষেপ নয়, অভিমান নয়, অনায়াসে মুখ দিয়ে বলেই ফেললেন, ‘দায়ের কোপে ৩ পাকসেনা খতম করতে পারলেও স্বামীর ঘরে ঠাঁই হলো না তাঁর।’ বর্তমানে মিরপুর সাবলেট হিসেবে বসবাস করছেন অসহায় এই নারী।

কাঞ্চনমালার মতো আমাদের অনেক নারী আছেন, যাঁরা দেশের জন্য সব হারিয়েছেন। স্বপ্নের বোনা সংসার আজ ছিন্নভিন্ন হয়েছে। যুদ্ধে যাবার আগে কেউ হয়ত ভেবেছেন, ফিরে এলে এমন আজও হবে। কেউ হয়ত ভাবতেও সময় পাননি বা সময় নেননি। দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৪৪ বছর। কিন্তু বাংলার আনাচে-কানাচে রয়েছে আমাদের নির্যাতিত নিপীড়িত মায়েরা, যারা সব হারিয়ে অসহায় হয়ে আজও স্বপ্ন দেখেন বাংলার নারীরা সম্মান পাবে, মর্যাদা পাবে। দেশের মাটিকে, মানচিত্র আর পতাকা অর্জন করার জন্য তাঁরা যে রক্ত, সম্মান হারিয়েছেন, তা বিফলে যাবে না।

প্রকাশিত : ২৭ মার্চ ২০১৫

২৭/০৩/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: