ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪, ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

সামনে তাঁর অনেক স্বপ্ন পূরণের পথ

ওবায়দুল কবির

প্রকাশিত: ২০:৩৪, ১৮ মে ২০২৪; আপডেট: ১২:৩২, ১৯ মে ২০২৪

সামনে তাঁর অনেক স্বপ্ন পূরণের পথ

বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার

সাংবাদিকতার শুরুতেই দায়িত্ব পেয়েছিলাম দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সংবাদ সংগ্রহের। রিপোর্টারদের ভাষায় আওয়ামী লীগ ‘বিট’। সেটি ১৯৯২ সালের কথা। এর আগেও ছোটখাটো কাগজে লেখালেখি, রিপোর্টিং করেছি। ১৯৮৭ সালের মাস্টার্স পরীক্ষা ১৯৯১ সালে পাস করে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জনকণ্ঠে যোগদান করি। রাষ্ট্র বিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে রাজনৈতিক বিট পেয়ে খুশি হয়েছিলাম।

পেশার শুরুতেই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আমার ওপর আস্থা রাখার জন্য প্রধান প্রতিবেদক প্রয়াত খালেক ভাইয়ের প্রতি আজো কৃতজ্ঞ। এই দায়িত্ব না পেলে হয়তো বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংস্পর্শে যেতে পারতাম না। জানতে পারতাম না এক মহীয়সী নারীর বিশালত্বের মধ্যেও কুসুম কোমল এক মানবিক হৃদয়ের কথা। ৪৩ বছর আগে তিনি হাল ধরেছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের।

পূর্ণাঙ্গ রাজনীতিক হিসাবে তখনই তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল। মানুষের ভোট, ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে দীর্ঘ পথ পরিক্রমা পাড়ি দিয়ে আজ তিনি পরিপূর্ণ রাজনীতিক, সফল রাষ্ট্র নায়ক এবং প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব।


দুই দিন আগে পালিত হয়েছে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৮১ সালের ১৭ মে এক ঝঞ্ঝাটপূর্ণ বিকেলে তিনি দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে ঢাকায় অবতরণ করেছিলেন। আমি তখন মফস্বলে একটি কলেজের ছাত্র। ওখান থেকে রাজধানীতে আসা খুব সহজ ছিল না। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া উপেক্ষা করে অনেক কষ্টে অনেকেই সেদিন ঢাকায় এসেছিলেন।

ব্যক্তিগত কারণে আমি সাক্ষী হতে পারিনি এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের। যারা পেরেছিলেন তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং পরবর্তী সময় অগ্রজ সাংবাদিকদের কাছে শুনে সেদিনের একটি চিত্র এঁকে নিয়েছি মনের মধ্যে। প্রত্যক্ষদর্শী না হলেও সেদিনের এই ঐতিহাসিক ঘটনা আমার দৃশ্যপটে বেশ স্পষ্ট। পরে দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে শেখ হাসিনার সাহচর্যে সেই দৃশ্য যেন আরও স্পষ্ট হয়েছে।


সেদিন ছিল শুক্রবার। অঝোর ধারার বৃষ্টিতে চারদিকে অথৈ পানি। এর মধ্যেও রাজধানী ঢাকা পরিণত হয়েছিল মিছিলের নগরীতে। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকা শহর প্রকম্পিত হয়েছিল মিছিল আর স্লোগানে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, প্রচ- ঝড়-বৃষ্টিও সেদিন লাখো মানুষের মিছিলের গতিরোধ করতে পারেনি।

কুর্মিটোলা বিমানবন্দর থেকে শেরেবাংলা নগর পর্যন্ত এলাকা পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে এক নজর দেখার জন্য সারা বাংলাদেশের মানুষের গন্তব্য ছিল রাজধানী ঢাকা। স্বাধীনতার শ্লোগান, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়েছিল বাংলার আকাশ-বাতাস। জনতার কণ্ঠে ঘোষিত হয়েছিল ‘হাসিনা তোমায় কথা দিলাম, পিতৃ হত্যার বদলা নেব’, ‘শেখ হাসিনার আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’।

বিকাল সাড়ে ৪টায় আকাশে যখন শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি দেখা যায়, তখন সব নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দলীয় স্বেচ্ছাসেবকদের অনুরোধ আবেদন অগ্রাহ্য করে হাজারো মানুষ বিমানবন্দরের ভিতরে ঢুকে যায়। অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই বিমানটি অবতরণ করেছিল। জনতা একেবারেই বিমানের কাছে চলে যায়। বহু চেষ্টার পর জনতার স্রোত কিছুটা সরিয়ে একটি ট্রাক ককপিটের দরজার সামনে নেওয়া হয়। বিমানের দরজায় দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা জনতার উদ্দেশে হাত নাড়েন। 


বিকাল ৪টা ৩২ মিনিটে তিনি সিঁড়ি দিয়ে ট্রাকে নেমে আসেন। কুর্মিটোলা থেকে তাঁকে বহনকারী ট্রাকটি শেরেবাংলা নগর পৌঁছতে সময় লাগে ৩ ঘণ্টা। ঝড়-বৃষ্টিতে অচল হয়ে গিয়েছিল নাগরিক জীবন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তিনি গণসংবর্ধনা মঞ্চে উপস্থিত হন। লাখো মানুষের উষ্ণ সংবর্ধনার জবাবে সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘সব হারিয়ে আমি আপনাদের মাঝে এসেছি।

বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে তাঁর আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে আমি জীবন উৎসর্গ করতে চাই।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমার আর হারাবার কিছুই নেই। পিতা-মাতা, ভাই, আত্মীয়-পরিজন সকলকে হারিয়ে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আপনাদের মাঝেই আমি তাদেরকে ফিরে পেতে চাই। আপনাদের নিয়েই আমি বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চাই। বাঙালি জাতির আর্থ-সামাজিক তথা সার্বিক মুক্তি ছিনিয়ে আনতে চাই।’ 


আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার এক যুগ পর প্রথম তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। আওয়ামী লীগ বিটের কারণে তাঁর সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। প্রথম সাক্ষাতের দিনটি আজও আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। ১৯৯৩ সালের ২৯ এপ্রিল। একটি সমাবেশে যোগদানের জন্য আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ যাবেন।

তখন এত পত্রিকা ছিল না। বেসরকারী টিভি চ্যানেল ছিল না একটিও। ৫/৬ জন সাংবাদিক এবং ২/৩ জন ফটো সাংবাদিক তাঁর সফরসঙ্গী হতেন। জনকণ্ঠ তখন সবেমাত্র বের হয়েছে এবং শুরুতেই পাঠক মহলে তুমুল আলোড়ন তুলেছে। অফিস থেকে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হলো শেখ হাসিনার সঙ্গে গোপালগঞ্জ যেতে। কিভাবে তাঁর সফরসঙ্গী হওয়া যায় কিছুই জানা নেই।

আওয়ামী লীগ বিটের সাংবাদিকদের পরামর্শে সকাল ৭টায় হাজির হলাম ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধী দলের নেতার সরকারি বাসভবনে। জনকণ্ঠের পরিচয়ে প্রথমদিনই আমাকে দারুণভাবে অভিনন্দন জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর প্রেস টিমের সদস্য করে নিলেন মৃণাল কান্তি দাস ওরফে সবার প্রিয় ‘মৃণাল দা’।


তখন গাড়িতে করে গোপালগঞ্জ যাওয়া ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বুড়িগঙ্গাসহ একাধিক ফেরি পার হয়ে মাওয়া ঘাট, ওখান থেকে বড় ফেরিতে পদ্মা পার হয়ে ভাঙ্গা, টেকেরহাট হয়ে মধুমতি নদীর তীর ঘেঁষে আঁকাবাঁকা পথে যেতে হতো গোপালগঞ্জ। আমরা রওনা হলাম সকাল সাড়ে ৭টায়।

কয়েকটি ফেরি পার হয়ে দুপুরে পৌঁছি টেকেরহাট ডাক বাংলোয়। দুপুরে খাবার ব্যবস্থা ছিল ওখানে। খাওয়ার আগে নেত্রী নিজের কক্ষ থেকে বের হয়ে মৃণাল দাকে জিজ্ঞেস করলেন সাংবাদিকদের খাবার ব্যবস্থা হয়েছে কিনা। দাদা জানালেন হয়েছে। সেদিনই সামনে থেকে তাকে প্রথম দেখা। সালাম দিলাম, তিনি জবাব দিলেন। সেদিন আর কোনো কথা হয়নি।

খাবার খেয়ে গোপালগঞ্জের উদ্দেশে রওনা দেই। গোপালগঞ্জ সদরে উত্তর ভেন্নাবাড়ি শেখ মুজিবুর রহমান আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ছিল জনসভা। স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় বক্তৃতা করেন শেখ হাসিনা। জনসভার বক্তৃতায় তিনি ঢাকায় সমন্বয় কমিটির আন্দোলনে পুলিশের নির্যাতনের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘মানুষের মৌলিক অধিকার হচ্ছে গণতান্ত্রিক সমাজের প্রথম শর্ত।

বিএনপি সরকার সংবিধান লঙ্ঘন করে মানুষের অধিকার হরণ করছে।’ জনসভা শেষে শেখ হাসিনা চলে যান টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর পৈতৃক বাড়িতে। আমরা কয়েকজন সাংবাদিক গোপালগঞ্জে থেকে যাই ঢাকায় সংবাদ পাঠানোর জন্য। তখন সংবাদ পাঠানো ছিল খুবই কঠিন। টেলিফোন কিংবা ফ্যাক্স মেশিনে সংবাদ পাঠাতে হতো। অধিকাংশ এলাকায় ফ্যাক্স মেশিন ছিল না। এক্ষেত্রে টেলিফোন ছিল ভরসা।

কেউ ফ্যাক্স ফোনের দোকান থেকে আবার কেউ আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়ি থেকে ফোনে ঢাকায় নিউজ পাঠাতেন। প্রথমদিনই ঘটে বিপত্তি। কোথাও ফ্যাক্স মেশিন না পেয়ে ফোনেই সংবাদ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেই। আমাকে পাঠানো হয় স্থানীয় সংসদ সদস্য কাজী আবদুর রশীদের বাসায়। ওখান থেকে বারবার ফোন করেও ঢাকার অফিসে সংযোগ পাইনি।

জীবনের প্রথম সফরে শেষ পর্যন্ত আর সংবাদ পাঠাতেই পারিনি। আমার পত্রিকায় সংবাদ ছাপা হয় স্থানীয় সংবাদদাতার বরাত দিয়ে। এটাও আমার সাংবাদিকতা জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। রশীদ ভাইয়ের বাসায়ই থাকার ব্যবস্থা হয়। পরদিন সকালে যাই টুঙ্গিপাড়া।


গোপালগঞ্জ থেকে টুঙ্গিপাড়ার রাস্তা ছিল খুবই খারাপ। কিছুটা পিচ ঢালা, কিছুটা ইট বিছানো, বেশিরভাগই কাঁচা। বৃষ্টির দিন গাড়ি নিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে যেত। টুঙ্গিপাড়া সদর থেকে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার রাস্তা ছিল আরও ভয়াবহ। খালের পাড় দিয়ে কাঁচা রাস্তায় বৃষ্টির দিন হেঁটে যাওয়াই ছিল কঠিন। নেত্রীসহ আমরা ঢাকার পথে রওনা হই সকাল ১০টায়।

পথ ছিল কোটালীপাড়া হয়ে টেকেরহাট। টুঙ্গিপাড়া থেকে কোটালীপাড়ার রাস্তা ছিল খুবই সরু। বেশিরভাগই কাঁচা। সরু রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ। গাড়ির বহর চলেছে ধীরে ধীরে। গাড়ির জানালা খুলে হাত নেড়ে শেখ হাসিনা অপেক্ষমাণ মানুষের শুভেচ্ছার জবাব দিচ্ছিলেন। বেশিরভাগ মানুষই সনাতন হিন্দু ধর্মের। শাঁখ বাজিয়ে উলুধ্বনি দিয়ে তারা শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছিলেন।

মানুষের ভিড়ে হঠাৎ গাড়ি থেমে যায়। আমরা গাড়ি থেকে নেমে কথা বলি অপেক্ষমাণ নারী-পুরুষের সঙ্গে। জিজ্ঞেস করি, কেন তারা অপেক্ষা করছেন। তারা বলেন, ‘শুনেছি এই রাস্তা দিয়ে আজ শেখের বেটি যাবেন। তাই সকাল থেকে অপেক্ষা করছি।’ অনেকের খালি গা। খালি পায়ে হেঁটে এসেছেন বহু দূর থেকে। শুধু শেখের বেটিকে এক নজর দেখার জন্য। এক বৃদ্ধা নিজ থেকে বলতে শুরু করলেন, ‘কে দেশের প্রধানমন্ত্রী আমাদের জানার দরকার নেই। শেখের বেটি হাসিনা আমাদের রাজা।

আমরা তাকেই রাজা মানি।’ তাদের এই ভালোবাসায় চাওয়া পাওয়ার কিছু ছিল না। প্রথম দিনে আমার এই অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। ঢাকায় পৌঁছতে রাত ৯টা। গাড়ি থেকে নেমে নেত্রী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আমাদেরকে বললেন, ‘খাওয়া-দাওয়া করে যেও।’ মৃণাল দাকে বললেন, ‘সবাইকে বাসায় পৌঁছে দিস।’ সফরসঙ্গী হিসাবে প্রথমদিন থেকেই শেখ হাসিনার প্রতি আমার মুগ্ধতা তৈরি হয়।

এই মুগ্ধতা থেকে এক সময় তিনি আমার কাছে ‘আপা’য় পরিণত হন। প্রধান প্রতিবেদক নিয়োগ হওয়ার আগে টানা চৌদ্দ বছর এই অসাধারণ মানুষটির সংস্পর্শে থাকার সুযোগ হয়েছে। এক সময় ‘আপা’ ছাড়িয়ে তিনি হয়ে ওঠেন মা’এর প্রতিচ্ছবি। 


ফিরে যাই ১৭ মের কথায়। ’৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে নরঘাতকরা ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। এ সময় বিদেশে থাকায় আল্লাহর অশেষ রহমতে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত করে বাঙালি জাতির অস্বিত্ব বিপন্ন করতে নানামুখী ষড়যন্ত্র শুরু করে ঘাতক গোষ্ঠী। বাঙালি জাতির জীবনে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে ঘোর অমানিশার অন্ধকার। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বকারী দল আওয়ামী লীগেও লাগে বিষাক্ত সাপের নিশ^াস। ভাঙনের কবলে পড়ে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় এই ঐতিহ্যবাহী দল।

এমন একটি ক্রান্তিলগ্নে ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন। এতে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ভয় পেয়ে যায় ঘাতক গোষ্ঠী। সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে দেশে ফিরতে না দেওয়ার জন্যে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘ ৬ বছর নির্বাসন শেষে সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু ও নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি প্রত্যাবর্তন করেন প্রিয় স্বদেশভূমিতে।

ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘ সংগ্রাম শুরু হয়। সামরিক জান্তা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে চলে তাঁর অকুতোভয় সংগ্রাম। জেল-জুলম, অত্যাচার কোনো কিছুই তাঁকে তার পথ থেকে টলাতে পারেনি। বাংলার মানুষের হারিয়ে যাওয়া অধিকার পুনরুদ্ধার করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি বারবার স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেছেন, আবির্ভূত হয়েছেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা রূপে।

আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বৈরশাসনের অবসান, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বাঙালির ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্বসভায় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে। সততা, মেধা, দক্ষতা ও প্রজ্ঞায় শেখ হাসিনা সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম সেরা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

বারবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা এই মানবিক নেত্রীর অর্জনে সমৃদ্ধ হয়েছে বাঙালি জাতি। তাঁর এই অভিযাত্রা এখানেই শেষ নয়। তিনি যেতে চান আরও অনেক দূরে। বাংলাদেশকে তিনি দেখতে চান উন্নত দেশ হিসেবে। সামনে তাঁর অনেক স্বপ্ন পূরণের পথ। তাঁর এই স্বপ্ন সফল হোক এটাই বাঙালির প্রত্যাশা। 

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, জনকণ্ঠ

×