ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০৩ মার্চ ২০২৪, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩০

স্মার্ট বাংলাদেশ ॥ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা-৩

মোস্তাফা জব্বার

প্রকাশিত: ২২:১৩, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

স্মার্ট বাংলাদেশ ॥ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা-৩

.

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে  আগস্ট ২০২৩ তারিখ স্মার্ট বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কেবিনেট কক্ষে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতির  বক্তব্যে  প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্মার্ট বাংলাদেশের যে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তার ভিত্তি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতেই  তৈরি হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ), আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর সদস্য পদ লাভ করেছে। তিনি বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন গঠনের মাধ্যমে দেশে পরমাণু  গবেষণার সুযোগ  তৈরি করে দেন। রাঙামাটির বেতবুনিয়াতে  বাংলাদেশের প্রথম ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র্র তিনি স্থাপন করেন, যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর দেখা যায়, সারা পৃথিবীতে ইন্টারনেট ব্যবহƒ  হলেও তখন বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহার খুবই সীমিত পরিসরে ছিল। সেই অবস্থা থেকে বাংলাদেশ এত দ্রুত গতিতে এগিয়েছে, যেখানে অনেক উন্নত দেশও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের পেছনে রয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে, যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ এবং  প্রযুক্তি ব্যবহারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ  করতে পারার কারণে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ১৯৯৬ সালে দেশে   টেলিফোন ব্যবস্থা  ছিল এনালগ, কোনো ডিজিটাল ফোন ছিল না। সে সময়ে উদ্যোগ নিয়ে ডিজিটাল টেলিফোন চালু করা হয় এবং মোবাইল ফোনের বিকাশ ঘটতে থাকে। সাবমেরিন কেবল স্থাপনের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমদিকে যখন ডিজিটাল সেন্টার  তৈরি করা হয়, তখন অনেকেই এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও এখন এর সুবিধা পাচ্ছে সকলে। এখন অধিকাংশ মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে এবং এটি আমাদের নিরক্ষরতা দূরীকরণেরও সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বাস্তব রূপ পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সুযোগ  তৈরি করে দেয়, অতীতের ধারাবাহিকতায় সেই সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো অগ্রসরমান ডিজিটাল প্রযুক্তি কাজে লাগাতে হবে। প্রযুক্তির উৎকর্ষে বিভিন্ন কাজে মানুষের প্রয়োজনীতা পাবে না তা নয়, বরং প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য দক্ষ মানুষের প্রয়োজন হবে। তাই স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নের জন্য আমাদের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে। মানুষের ভিতরে যে সৃজনশীলতা রয়েছে, সেটিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে। ডিজিটাল বিভাজন কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রামের তৃণমূল মানুষের কাছেও প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দিতে হবে পুরোপুরিভাবে। আর্থিক সংগতি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। প্রযুক্তি পরিবর্তনশীল হওয়ায় পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো দক্ষ জনশক্তি  তৈরি করতে হবে। দক্ষ জনগোষ্ঠী প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিকল্পে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে, সে অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে হবে। ফ্রি-ল্যান্সারদের ভাষা শেখার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। শিক্ষার মান বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। স্মার্ট বাংলাদেশে মানুষ নতুনভাবে চিন্তা করবে এবং উদ্ভাবনী শক্তিগুলোকে বিকশিত করে নিজেদের জীবনমানের উন্নয়ন করবে। লক্ষ্য অর্জনে মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে পারলে, তারা অসাধ্য সাধন করতে পারে।

সভায় উপকমিটি গঠনের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা পর্যালোচনা শেষে নিম্নরূপ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়:

ইতোপূর্বে ডিজিটাল বাংলাদেশ টাস্কফোর্স কর্তৃক গৃহীত কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় স্মার্ট বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। (বাস্তবায়নে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ)

যে সকল মন্ত্রণালয়/ বিভাগের মন্ত্রী/ প্রতিমন্ত্রী বা সিনিয়র সচিব/ সচিব উপকমিটিকে নেতৃত্ব প্রদান করবেন, সে সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগকে স্মার্ট বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবে কো-অপ্ট করতে হবে (বাস্তবায়নে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ)

স্মার্ট বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের ১৫টি উপকমিটি গঠন করতে হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগের মন্ত্রী/প্রতিমন্ত্রী মহোদয়বৃন্দের। নিম্নবর্ণিত ১৫টি উপকমিটি দ্রুত গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

উপকমিটি এবং উপকমিটির  আহ্বায়ক

স্মার্ট কৃষি, জলবাযু পরিবর্তন, ক্লিন এনার্জি, পরিবেশ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী, কৃষি মন্ত্রাণালয়। স্মার্ট শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থান উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়। স্মার্ট পরিবহন; উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী, সড়ক পরিবহন সেতু মন্ত্রণালয়। স্মার্ট কর এবং রাজস্ব আদায়; উপকমিটির আহ্বায়ক  মন্ত্রী, অর্থ মন্ত্রণালয়।

স্মার্ট আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ক্যাশলেস সমাজ, বাণিজ্য,বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র মাঝারি উদ্যোক্তা এবং ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী, অর্থ মন্ত্রণালয়। স্মার্ট ভূমি ব্যবস্থাপনা; উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী, ভূমি মন্ত্রণালয়। স্মার্ট জুডিশিয়ারি; উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী আইন, বিচার সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

স্মার্ট সংসদ উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী, আইন, বিচার সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

স্মার্ট সিভিল সার্ভিস স্মার্ট স্থানীয় সরকার; উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন সমবায় মন্ত্রণালয় জিরো ডিজিটাল ডিভাইড এবং সর্বজনীন সংযোগ; উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী, ডাক টেলিযোগাযোগ বিভাগ।

আইসিটি ইন্ডাস্ট্রি, ডিজিটাল কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং, অস্ট্রাপ্রেনারশিপ স্টার্ট-আপ উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী, ডাক টেলিযোগাযোগ বিভাগ মন্ত্রী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং মহাকাশ জিও-স্পেশিয়াল উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী, বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। স্মার্ট কূটনীতি   বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক উদ্ভাবনী সহযোগিতা;

উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী, পররাষ্ট্র ইনোভেটিভ সার্ভিস ডেলিভারি, তথ্য-উপাত্ত ভিত্তিক গভর্নেন্স এবং সাশ্রয়ী ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার উপকমিটির আহ্বায়ক প্রতিমন্ত্রী, তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ স্মার্ট জননিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং নিরাপদ ক্লাউড উপকমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

প্রধানমন্ত্রী সভায় উপস্থিত সকলকে উন্মুক্ত আলোচনায় পরামর্শ প্রদানের আহ্বান জানান। উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে . মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, আমাদের মেধাবী ছেলেমেয়েদের একটি বড় অংশ এখনো দেশের বাইরে, যাদের স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নে কাজে লাগাতে হবে। তিনি গবেষণা উন্নয়নে অর্থায়ন বহুগুণ বৃদ্ধির পাশাপাশি গবেষণা সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং মানুষকে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। কৃষিমন্ত্রী (সাবেক) . মোঃ আব্দুর রাজ্জাক তাত্ত্বিক গবেষণার পাশাপাশি প্রায়োগিক গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

মহাপরিচালক এনটিএমসি বলেন, এনটিএমসিতে একটি প্ল্যাটফর্ম  তৈরি করা হয়েছে, যেখান থেকে অনেক সংস্থা প্রয়োজনীয় তথ্য নিচ্ছে। যদি সকল সংস্থা প্ল্যাটফর্ম থেকে তথ্য নেয়, তাহলে রাষ্ট্রীয় অর্থের সাশ্রয় হবে। ডাক টেলিযোগাযোগ বিভাগের মন্ত্রী (সাবেক) মোস্তাফা জব্বার বলেন, বর্তমানে আমাদের চাহিদার নব্বই ভাগ স্মার্ট ফোন এবং ফিচার ফোন দেশেই উৎপাদন করা হয়। দেশীয় উৎপাদনকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদানের ওপর তিনি জোর দেন। তিনি আরও বলেন, ব্রডব্যান্ড কানেকটিভিটি ব্যবহারের মাধ্যমে চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট টেলি স্বাস্থ্য সেবায় একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একই পদ্ধতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে জনগোষ্ঠীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ সেবা প্রদান করতে পারে। স্মার্ট সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার স্মার্ট ভিসা বাস্তবায়ন প্রসংগে জনাব আসাদুজ্জামান খান, মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সভাকে অবহিত করেন, দেশে স্মার্ট ভিসা বাস্তবায়নের কাজ বহুলাংশে এগিয়েছে। বেসিসের সভাপতি রাসেল টি আহমেদ বলেন, সরকারের বাস্তবায়িত প্রত্যেকটি মেগা প্রকল্পে তথ্যপ্রযুক্তির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মেগা প্রকল্পগুলোতে খুব স্বাভাবিকভাবেই বিদেশী প্রতিষ্ঠান সম্পৃক্ত থাকে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যবস্থা রাখা হলে ব্যয় সাশ্রয় হবে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষতা সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদকলামিস্ট, সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড সফটওয়্যার-এর জনক

 [email protected],

www.bijoyekushe.net

×