ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১

অদম্য এক সাহিত্যিক অলোকা ভৌমিক

টিটো মোস্তাফিজ

প্রকাশিত: ০১:০২, ১ মার্চ ২০২৪

অদম্য এক সাহিত্যিক অলোকা ভৌমিক

অলোকা ভৌমিক

বয়স্ক ভাতার সামান্য টাকায় কোনোমতে খেয়ে-পরে দিন চলছে অলোকা ভৌমিকের। ক্ষুধা-তৃষ্ণা তার লেখাকে থামাতে পারেনি। অলোকা ভৌমিক কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লেখেন। তার প্রতিটি লেখা সহজসরল ভাষার জীবন ঘনিষ্ঠ সাহিত্যকর্ম

অদম্য এক সাহিত্যিক অলোকা ভৌমিক। জন্ম ১৯৪৭ সালের ১০ জানুয়ারি নাটোর জেলার শ্রীরামপুর গ্রামে। বাবা জ্যোতিষ চন্দ্র সরকার ও মা চমৎকারিনী সরকার। ছোটবেলা থেকেই ছড়া ও কবিতার প্রতি প্রচ- ঝোঁক ছিল তার। বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তখন মেয়েদের লেখাপড়ার পরিবেশ ও সুযোগ না থাকায় বাড়িতেই বর্ণপরিচয় শিখেছেন। কৈশোর পেরুনোর আগেই ষোলো বছর বয়সে তার বিয়ে হয় নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার তিরাইল গ্রামের বিশ্বনাথ ভৌমিকের সঙ্গে।

সংসার জীবনে এতটুকু শান্তি পাননি অলোকা ভৌমিক। স্বামী বিশ্বনাথ ভৌমিক মোটেও সংসারী ছিলেন না। তার ওপর স্ত্রীকে সবসময় কড়া শাসনে রাখতেন। নিঃসন্তান অলোকা ভৌমিককে সাহিত্য খুব আপ্লুত করতো। স্বামীর কড়া শাসন আর মাতৃত্ববোধ যখন তাকে তাড়িয়ে বেড়াত, ঠিক তখনই ‘শিশু শিক্ষা’ পড়ার জ্ঞান নিয়ে হাতে কাগজ-কলম তুলে নেন। সময় সুযোগ পেলেই চলমান সমাজ জীবনের বিভিন্ন ঘটনাকে নিয়ে লিখতেন।

রাতে ঘুম না এলে নীরবে বসে কবিতা লিখতেন। এ ভাবে ডায়েরিতে প্রচুর লেখা জমা হয়। বেকার স্বামী। দিনের পর দিন একমুঠো ভাতের জন্য কষ্ট করেছেন তবুও লিখে গেছেন নিয়মিত। মনের মধ্যে সব সময় আশা ছিল তার সারা জীবনের সাহিত্য সাধনা একসময় বই প্রকাশের মাধ্যমে সমাজের মানুষের কাছে পৌঁছাবে। 
অভাবের কারণে বিশ্বনাথ ভৌমিক একসময় ভিটে-মাটি বিক্রি করে দেন। ঘর ছাড়া হওয়ার কিছুদিন তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। কিন্তু যিনি বাড়িটি কিনেছেন তার সংসারেও রয়েছে অভাব-অনটন তবু তিনি ও তার স্ত্রী হামিদা বেগম অলোকা ভৌমিককে আশ্রয় দেন। দিনমজুর স্বামীর স্বল্প আয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হলেও মানবিক কারণে হামিদা বেগম পরম মমতায় আপন করে নেন  অলোকা ভৌমিককে।

আর  কোথাও যেতে দেননি। আশ্রয়হীন এ কবিকে তিনি আশ্রয় দেন। হামিদা দম্পতি কেবল তার দেখাশোনার ভারই নেন বরং লেখালেখির জন্য যা যা প্রয়োজন তা দিয়ে সহায়তার চেষ্টা করেন তারা। অলোকার প্রকাশিত বই বাড়ি বাড়ি বিলি করে আসেন। শুধু তাই নয় কবিকে তার ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনেও সহযোগিতা করেন। 
বয়স্ক ভাতার সামান্য টাকায় কোনোমতে খেয়ে-পরে দিন চলছে অলোকা ভৌমিকের। ক্ষুধা-তৃষ্ণা তার লেখাকে থামাতে পারেনি। অলোকা ভৌমিক কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ লেখেন। তার প্রতিটি লেখা সহজসরল ভাষার জীবন ঘনিষ্ঠ সাহিত্যকর্ম। বয়স্ক ভাতা ও স্বজনদের পাঠানো টাকা থেকে যৎসামান্য খাবারের খরচের অর্ধেকটা বাঁচিয়ে প্রতি বছর পাবনার রূপম প্রকাশনী থেকে বই প্রকাশ করেন।

কষ্ট করে প্রকাশ করা বই বিনামূল্যে বিলি করেন। তার প্রকাশিত ১৫টি গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- অমৃত, অমিয় বাণী, অমিয় সুধা (সনাতন ধর্ম বিষয়ক), একগুচ্ছ কবিতা (কাব্যগ্রন্থ), সেতুবন্ধন (কাব্যগ্রন্থ), এক মুঠো রোদ্দুর (কাব্যগ্রন্থ), ছোট-বড় কবিতা (কাব্যগ্রন্থ), নারীর আত্মকথা, উদয়ের পথে (প্রবন্ধ), সরল কথা (গল্প এবং উপদেশমূলক সরল কথা) ইত্যাদি। জীবন সংগ্রামের অভিজ্ঞতার আলোয় তার সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ হয়েছে কল্পনা ও বাস্তবের মিশ্রণে।

কোনো স্কুলে না পড়ে কেবল ‘শিশু শিক্ষা’র মাধ্যমে লেখাপড়া শিখলেও তার ভাষার বুনন বিস্ময়কর। কবি অলোকা ভৌমিকের মধ্যে রয়েছে চমকে দেওয়ার মতো অসাম্প্রদায়িক চেতনা। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী থেকে শুরু করে রাধা কৃষ্ণসহ সনাতন ধর্মের দেবদেবীসহ নাটোরের রাণী ভবানী, রাণী রাসমণির জীবন কাহিনী নিয়ে তার লেখা বই প্রকাশিত হয়েছে। কবি অলোকা ভৌমিকের মতে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমাদের পরিচয় আমরা মানুষ।

চারদিকে মানবিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র দেখে তার স্বল্প জ্ঞানে চলমান সমাজ জীবনের বিভিন্ন ঘটনাকে লিপিবদ্ধ করেছেন কবিতা, গল্প ও নিবন্ধে। পড়ে যদি কারও ভালো লাগে কিংবা সমাজের উপকার হয় তবেই তিনি শান্তি পাবেন। সংকটময় জীবনে সাহিত্যচর্চাকে অবলম্বন করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন জীবনবাদী স্বশিক্ষিত কবি অলোকা ভৌমিক।

×