ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৯ জুন ২০২৪, ৫ আষাঢ় ১৪৩১

মূলধনী মুনাফার ওপর করারোপ

শেয়ারবাজারে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

প্রকাশিত: ০০:০৯, ১১ জুন ২০২৪

শেয়ারবাজারে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

শেয়ারবাজারে মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা

ব্যাংকে নগদ টাকার অভাবে আস্থাহীনতায় ভুগতে থাকা শেয়ারবাজারে মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে বড় বিনিয়োগকারীদের মূলধনী মুনাফার ওপর করারোপ। খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা শেয়ারবাজারে যেখানে নতুন প্রণোদনা দরকার ছিল উল্টো করের আওতা বাড়ানোর জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ২০২৪-২৫ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে।

প্রস্তাবিত বাজেটের যেখানে বিনিয়োগকারীরা প্রণোদনা চেয়েছিল সেখানে মূলধনী মুনাফার ওপর করারোপকে ভালোভাবে নেয়নি প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগকারীরা। মূলত এসব ইস্যুতে সাম্প্রতিককালে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ-কারীদের অবস্থা নাজুক আকার ধারণ করেছে। কমতে কমতে বিনিয়োগকারীদের পুঁজি তলানিতে ঠেকেছে।

সহায় সম্বল হারিয়ে তারা এখন রাস্তায় নামার উপক্রম হয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থেকে শুরু করে মাঝখানে কিছুটা বিরতি দিয়ে টানা পতনের বৃত্তে আটকে পড়েছে শেয়ারবাজার। এই পরিস্থিতিতে কোনো উত্তরণে পথ আপাতত না দেখতে পেয়ে লোকসান দিয়েই শেয়ারবাজার ছাড়ছে বিনিয়োগকারীরা।   
মূলত ক্রেতা সংকটে প্রতিদিনই শেয়ারবাজারে দরপতন হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক সাড়ে তিন বছরের মধ্যে সর্বনি¤œ অবস্থানে নেমে গেছে। 
ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীরা বলছেন, রোজার ঈদের আগেও শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে।

রোজার ঈদের পর দু-একদিন বাজার ভালো গেলেও দেড় মাসের বেশি সময় ধরে বাজারে মন্দা অবস্থা বিরাজ করছে। শেয়ারবাজারে যখন মন্দা চলছে, সেই সময় প্রস্তাবিত বাজেটে ক্যাপিটাল গেইনের ওপর ট্যাক্স আরোপ করা হয়েছে। ফলে বাজারে পতনের মাত্রা আরও বেড়ে গেছে।
কয়েকদিন পরই ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। শেয়ারবাজারের অনেক বিনিয়োগকারীর জন্য এবারের ঈদ মাটি হয়ে যাবে। কারণ বাজারে যে হারে দরপতন হয়েছে, তাতে অনেকেই বিনিয়োগ করা পুঁজির ৫০ শতাংশের মতো হারিয়ে ফেলেছেন। বিনিয়োগকারীরা এখন চোখে সরিষার ফুল দেখছেন। সবারই দিশেহারা অবস্থা। বিনিয়োগ করা পুঁজি রক্ষার কোনো উপায়ের দেখা মিলছে না।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থান করেন অর্থমন্ত্রী। প্রস্তাবিত বাজেটেই ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়। শেয়ারবাজারে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরা ৫০ লাখ টাকার ওপরে মূলধনী মুনাফা বা ক্যাপিটাল গেইন করলে তার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ট্যাক্স দিতে হবে। আর ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত মূলধনী মুনাফায় কর দিতে হবে না।
নতুন অর্থবছরের বাজেটে নতুন করারোপ করা হতে পারে, এমন গুঞ্জন শেয়ারবাজারে আগেই ছড়িয়ে পড়েছিল। যার পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জসহ শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের মূলধনী মুনাফার ওপর কর বসানোর দাবি জানানো হয়। কিন্তু অর্থমন্ত্রী কোনো কথা শুনেননি। 
ফলে প্রস্তাবিত বাজেটের পর প্রথম কার্যদিবস রবিবার দেশের শেয়ারবাজারে বড় দরপতন হয়। দ্বিতীয় কার্যদিবস সোমবারও শেয়ারবাজারে বড় দরপতন হয়েছে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে এবং অপর শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার পাশাপাশি সবকটি মূল্যসূচকের বড় পতন হয়েছে। সেইসঙ্গে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ।
শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হয় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমার মাধ্যমে। লেনদেনের শুরুতে দেখা দেওয়া এ নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকে শেষপর্যন্ত। এমনকি লেনদেনের শেষদিকে দরপতনের মাত্রা বেড়ে যায়। 
ফলে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৬৫ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ১০৫ পয়েন্টে নেমে গেছে। এর মাধ্যমে ২০২১ সালের ৪ এপ্রিলের পর সূচকটি এখন সর্বনি¤œ অবস্থা বিরাজ করছে। ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর ডিএসইর প্রধান সূচক ৫ হাজার ৮৯ পয়েন্ট ছিল।

অপর দুই সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক আগের দিনের তুলনায় ১৭ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১০৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আর বাছাই করা ভালো ৩০টি কোম্পানি নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের তুলনায় ২৩ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৮১১ পয়েন্টে অবস্থান করছে। দিনভর বাজারটিতে লেনদেন হয়েছে ৩১৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৩৫৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা। সে হিসেবে লেনদেন কমেছে ৩৮ কোটি ১২ লাখ টাকা।
বাজারের এই চিত্র সম্পর্কে বিনিয়োগকারী নাফিজ রহমান বলেন, যেই শেয়ারে বিনিয়োগ করেছি, সেটাতেই ধরা খেয়েছি। রোজার ঈদের পর থেকে গত দুই মাসে বিনিয়োগ করা পুঁজি প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। একটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বর্তমানে ৭০ শতাংশের মতো লোকসানে রয়েছি। গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশের মতো লোকসানে আছি। তিনি বলেন, লাভের আশা ছেড়ে দিয়েছি।

×