কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চেচনিয়ায় পুতিনের গোপন বাহিনী

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫

মুসলিম অধ্যুষিত চেচনিয়া দু’দশক আগেও ছিল রাশিয়ান ফেডারেশনের সবচেয়ে বিচ্ছিন্নপ্রবণ অঞ্চল। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর নব্বই দশকের শুরু থেকেই রাশিয়ান সেনাবাহিনী যুদ্ধবাজ চেচেনদের সঙ্গে যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিল। ২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট পুতিন ক্ষমতায় আসার পর এ দৃশ্যের আমূল পরিবর্তন ঘটে। সীমিত স্বাধীনতা আন্দোলন রাশিয়ান বিমান হামলায় স্তিমিত হয়ে আসে। রাজধানী গজনী পরিণত হয় ধ্বংসস্তূপে। চেচেন নেতাদের অনৈক্যের সুযোগে পুতিন খুব সহজে অঞ্চলটির বিচ্ছিন্নবাদ নির্মূল করেন। মস্কো তথা পুতিনের আনুগত্য স্বীকার করতে বাধ্য হয় চেচেন বিদ্রোহীরা। এক যুগ পরের ইতিহাস হলো ভিন্ন চেচেন স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মীরা এখন বহির্বিশ্বে রাশিয়ান গোপন বাহিনীতে পরিণত। যাদের বাহু বলে রাশিয়া ইউক্রেনের বিচ্ছিন্নপ্রবণ অঞ্চল দখল করে। চেচেন যোদ্ধারা কেবল বহির্বিশ্বে রাশিয়ার গোপন মিশনে অংশগ্রহণ করছে না বরং, রাশিয়ার অভ্যন্তরে পুতিনের রাজনীতিক শত্রুদের ঘায়েল করতেও তারা ব্যবহৃত হচ্ছে। ককেসাসের প্রবেশ দ্বার চেচনিয়া কৌশলগত দিক দিয়ে রাশিয়ান ফেডারেশনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। কৃষ্ণ ও ক্যাসপিয়ান সাগরের সংযোগ অঞ্চল চেচনিয়া ১৮ শতকে রাশিয়ার মূল ভূখ-ের সঙ্গে সংযোজিত হয়। জার পিটার দ্য গ্রেট অঞ্চলটি দখল করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর ইউক্রেন, জর্জিয়া, আর্মেনিয়াসহ বারোটি দেশ রাশিয়া থেকে বেরিয়ে এলেও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বরিৎ ইয়েলৎসিন চেচনিয়ায় এসে সীমান্তের ইতি টানেন। রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যেই চেচনিয়াকে ভূ-খ-ের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিন্তু যুদ্ধবাজ চেচেনরা কখনোই রাশিয়ার প্রভুত্ব মেনে নেয়নি। স্থলযুদ্ধে পরাস্ত করে পরাক্রমশালী রাশিয়ান সেনাবাহিনীকে।

উপায়ন্তর না দেখে ১৯৯৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পুতিন বিমান হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং পরের বছর পুতিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সমূলে নির্মূল করেন সকল বিদ্রোহ। স্বজাতির এমন করুণ দশায় গজনীর একজন ইসলামিক ধর্মীয় নেতা মুফতি আখমত কেদিরভ পুতিনের আনুগত্য স্বীকার করেন এবং বিদ্রোহ দমনে মস্কোকে সাহায্য করেন। পুতিনের প্রতি এমন আনুগত্যের পরিণাম ছিল ভয়াবহ। ২০০৪ সালে গজনীর একটি স্টেডিয়ামে সামরিক কুজকাওয়াজ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন আখমত কেদিরভ নিজের জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছিলেন মস্কোর আনুগত্য।

আখমত কেদিরভের মৃত্যুর পর তাঁর ২৭ বছর বয়সী সন্তান রামাজান কেদিরভ অশ্রুসজল নয়নে মস্কো পাড়ি দেন এবং পুতিনের বশ্যতা স্বীকার করেন। রামাজান কেদিরভ চেচনিয়া আসার পর প্রথম যে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেন তা হলো একটি আনুগত্য বাহিনী। যার নির্দেশ দিবেন কেবল রামাজান স্বয়ং। এ বাহিনীর অবিসংবাদিত দুই নেতা ভøাদিমির পুতিন ও রামাজান কেদিরভ। এ দু’জন ছাড়া এ বাহিনী অন্য কারও কাছেই কোন জবাবদিহিতা করে না। রামাজান ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পর ২০০৯ সালে রাশিয়া চেচনিয়া হতে সামরিক আইন পুরোপুরি তুলে নেয়। পুলিশ বাহিনীতে স্থানীয় চেচেনদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে এবং গজনীজুড়ে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। চেচনিয়ায় বর্তমানের বিদ্রোহের লেশ মাত্র নেই বরং গজনীর সর্বত্র এখন পুতিনের আনুগত্য প্রকাশের চিত্র। গজনীর বিমানবন্দর থেকে শহরতলীর রাস্তায়-রাস্তায় এখন চোখে পড়ে পুতিনের বিলবোর্ড, ফেস্টুন কিংবা দেয়াল চিকা। রামাজান কেদিরভ বর্তমানে পুতিনের রাজনীতির ময়দানে অন্যতম খুঁটি। ইউক্রেন সঙ্কট শুরু হওয়ার পর রামাজানের বিশেষ বাহিনীর ৭৪,০০০ জন সৈন্য-ইউত্রেুন প্রবেশ করে এবং বেশকিছু অঞ্চল দখল করে। ডিসেম্বরের শুরুর দিকে রামাজানের নির্দেশে ইউত্রেুনের বেশ ক’জন আইন প্রণেতাকেও অপহরণ করে তার বিশেষ বাহিনী। এ কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্ররা রামাজান ও তার বাহিনীর ওপর বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ইউত্রেুন সঙ্কটে রাশিয়া তার সেনাবাহিনীর কোন নিয়মিত সদস্যকেই প্রেরণ করেনি।

বরং রামাজানের স্বেচ্ছাসেবক দলের সাহায্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। রামাজান কেদিরভ এবং তার বাহিনী এখন কেবল বহির্বিশ্বে রাশিয়ার আধিপত্য বিস্তারের সহায়তা করছে না, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হত্যাকা-েও জড়িয়ে পড়ছে। রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পুতিনের অন্যতম সমালোচক বরিস নেমসটভ হত্যাকা-েও তাদের হাত ছিল। এছাড়া বেশ ক’জন সাংবাদিক এবং সমাজকর্মীর অপহরণ ও হত্যাকা-েও তারা ব্যবহৃত হয়। বলতে দ্বিধা নেই প্রেসিডেন্ট পুতিনের নির্দেশেই তাদের এমন অংশগ্রহণ। রাশিয়ায় এবং বহির্বিশ্বে পুতিনের সমালোচক ও শত্রুদের মাথাব্যথার কারণ এখন রামাজান। চেচনিয়া-অত্যন্ত জনপ্রিয় এ নেতা ইদানীং মস্কোর লাগাম ছেড়ে নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রাধান্য দিতে সংকোচ বোধ করছে না। যা এখন স্বয়ং পুতিনের কাছেই দৃষ্টিকটু ঠেকছে।

চলমান ডেস্ক

সূত্র: টাইম

প্রকাশিত : ১ জুলাই ২০১৫

০১/০৭/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: