ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২০ মে ২০২৪, ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

মঞ্চকাঁপানো সংলাপ আর উচ্চৈঃস্বরের বাদ্য-বাজনা হারিয়ে গেছে

ভালো নেই সিরাজ, আলেয়া ও লুৎফারা

সঞ্জয় সরকার

প্রকাশিত: ০১:১৬, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ভালো নেই সিরাজ, আলেয়া ও লুৎফারা

যাত্রা পালার একটি দৃশ্যে নবাব সিরাজ উদ্্দৌলা অভিনয় করছেন জনৈক শিল্পী

বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মহান অধিপতি, তোমার শেষ উপদেশ আমি ভুলিনি জনাব...।’ঐতিহাসিক ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ যাত্রাপালার এ সংলাপ এখনো অনেক প্রবীণের মুখস্থ। কিছুদিন আগেও বাংলা ভাষাভাষীদের সবচেয়ে জনপ্রিয় বিনোদন মাধ্যম ছিল লোকনাট্যের এ ধারাটি। যাত্রার কলাকুশলীদের মঞ্চকাঁপানো সংলাপ আর উচ্চৈঃস্বরের বাদ্য-বাজনার আনন্দ-ঝঙ্কারে মুখরিত হয়ে উঠত পল্লিবাংলা।

লোকসংস্কৃতির জেলা হিসেবে খ্যাত নেত্রকোনাও এক সময় যাত্রাগানের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। লেভেল যাত্রা, ঢপ যাত্রা এবং ঝুমর যাত্রা নামে তিন ধরনের পালা প্রচলিত ছিল এখানে। প্রায় প্রতিটি গ্রামেই বছরের কোনো না কোনো সময় যাত্রাপালার আয়োজন হতো। আবার বাণিজ্যিকভিত্তিতে পক্ষকাল বা মাসব্যাপী যাত্রা প্রদর্শনীরও আয়োজন হতো কোথায়ও কোথায়ও।

যাত্রার এ বিপুল জনপ্রিয়তাকে কেন্দ্র করেই এখানকার বিভিন্ন উপজেলায় গড়ে ওঠেছিল নিউ গণেশ অপেরা, নবযুগ অপেরা, কৃষ্ণাকলি অপেরা, মহুয়া নাট্য সংস্থা, লক্ষ্মীপুর যাত্রা ইউনিট, সবুজ অপেরা, পলাশ অপেরা, রিপন যাত্রা ইউনিট, বন্ধন অপেরার, ঝলমল অপেরা, নেত্রকথন নাট্যগোষ্ঠী ও কৃষ্ণা অপেরার মতো পেশাদার যাত্রাদল। আবার যাত্রাদল পরিচালনা, নির্দেশনা, অভিনয়, মেকাপ, প্রম্পট বা বাদ্য পরিবেশনের কাজগুলোকেও পেশা হিসেবেও বেছে নিয়েছিলেন অনেকে।

এখানকার পেশাদার পুরুষ যাত্রাভিনেতাদের মধ্যে আশ্রব আলী, নয়ন মিয়া, মুখলেছ উদ্দিন, খমির উদ্দিন, হরেন সরকার, রমেশ আদিত্য, শরীফ এ মুখলেছ, পঞ্চানন বিশ্বাস, হরিপদ সরকার, অমূল্য শর্মা, আব্দুর রহিম, মোসলেম উদ্দিন, আব্দুর রব, আফাজ উদ্দিন, আব্দুল হাই প্রমুখের নাম এখনো মুখে মুখে ফেরে। আবার বিবেকশিল্পী গৌরাঙ্গ আদিত্য, অশ্বিনী সরকার, মদন সরকার ও গোপাল দত্তের কথা আজও ভুলে যাননি এখানকার যাত্রামোদীরা। 
স্বাধীনতা-উত্তরকালে যাত্রামঞ্চে নারী শিল্পীদের আগমন ঘটলে শিল্পটির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। নেত্রকোনা জেলার পেশাদার নারী অভিনেত্রী হিসেবে আলোচনায় ওঠে আসেন কৃষ্ণা চক্রবর্তী, ইলা, আঞ্জুমান আরা, বেবী সাগরিকা, সাধনা সরকার, পারল বা রীতার মতো নায়িকাদের নাম। সারাদেশেই ছিল তাদের খ্যাতি। তবে এর কিছুকাল পরেই শুরু হয় ধ্বংসের প্রক্রিয়া। আশির দশকে যাত্রা প্রদর্শনীর নামে রমরমা বাণিজ্য চালু করেন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা কিছু প্রভাবশালী।

দর্শক টানতে তারা মঞ্চে নিয়ে আসেন ‘প্রিন্সেস’ নামধারী নর্তকীদের। সঙ্গে যুক্ত করেন হাউজি ও ওয়ানটেনের মতো জুয়ার ব্যবসা। একদিকে নর্তকীদের রুচিবর্জিত নৃত্য-কুর্দন আর অন্যদিকে জুয়া-হাউজির প্রসারে হুমকির মুখে পড়ে যায় মূল শিল্পটি। ফলে মুখ ফিরিয়ে নেয় সাধারণ মানুষ। লাগাম টেনে ধরে প্রশাসনও। আরোপ করা হয় নানা বিধিনিষেধ। যদিও পেশাদার যাত্রাশিল্পীদের দাবি, এসব অসামাজিক কার্যকলাপের সঙ্গে প্রকৃত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কোনো সম্পর্ক নেই। উপরন্তু তারা পরিস্থিতির শিকার।

নেত্রকোনা অঞ্চলে যাত্রাশিল্পের রমরমা প্রসারের কারণে চার শতাধিক যাত্রাশিল্পী ও কলাকুশলী জেলা সদরের রেলক্রসিং এলাকায় গড়ে তুলেছিলেন অলিখিত যাত্রাপল্লি। সেখানে ছিল প্রায় ১৫-২০টি সাজঘর। আয়োজকরা এসব সাজঘর থেকে চুক্তি করে নিয়ে যেতেন নির্দেশক, পরিচালক, অভিনেতা, অভিনেত্রী, বাদক, বিবেক, প্রম্পটার, মেকাপ ম্যান, প্রভৃতি কলাকুশলীদের। যাত্রাগানই ছিল তাদের জীবন-জীবিকার অবলম্বন।

সংখ্যায় কমলেও তাদের অনেকে এখনো পেশাটি আঁকড়ে থাকার সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। তবে ভালো নেউ কেউই। কালেভদ্রে মঞ্চের ডাক পান। বাদবাকি সময় করেন অন্য কাজ। মঞ্চে যারা রাজা-রানী, বাদশা-সম্রাজ্ঞী বা উজির-নাজিরের অভিনয় করেন, বাস্তবে তারা দিন গুজরান করেন দিনমজুরি বা গৃৃহপরিচারিকার কাজ করে বা রিক্সা-অটো চালিয়ে। 
নেত্রকোনার বিশিষ্ট যাত্রানায়িকা ও নারী পালাকার প্রিন্সেস বিউটি বলেন, ‘অন্যান্য বছর শীত মৌসুমে কিছু পালার আয়োজন হতো। এবার জাতীয় নির্বাচন এবং টানা শৈত্যপ্রবাহের কারণে তাও হয়নি। কালেভদ্রে দুই-একটা শৌখিন পালার আয়োজন হলেও তার উপার্জন দিয়ে চলা সম্ভব হচ্ছে না।’ তিনি উল্লেখ করেন, ‘এবার জেলার কোথায়ও যাত্রাপ্রদর্শনীর প্যান্ডেল হয়নি। অভিনয়ই যাদের মূল পেশা এবং আর কোনো অবলম্বন নেই, তারা সীমাহীন কষ্টে দিন পার করছেন।’

রেলক্রসিং এলাকার পেশাদার শিল্পী দীন ইসলাম বলেন, ‘আগে দুর্গাপূজার দশমীর দিন থেকে মৌসুম শুরু হতো। চলত বর্ষার আগ পর্যন্ত। যারা দলে চুক্তিবদ্ধ থাকতেন, তারা সারাদেশ ঘুরে যাত্রাগান করতেন। বাড়ি ফেরার সময় পেতেন না। আর যারা দলের বাইরে থাকতেন, তারা অ্যামেচার (শৌখিন) পালায় অভিনয় করতেন, অথবা ছুটতেন যে দলের ডাক পেতেন সেই দলের প্যান্ডেলে। কিন্তু এখন যাত্রাগান নেই বললেই চলে।

করোনা পরিস্থিতির পর থেকে পরিস্থিতি খুব করুন।’ যাত্রার ড্রামসেট বাদক ভক্ত দাস বলেন, ‘আগে যাত্রাগানে মিউজিশিয়ানের কাজ করতাম। কখনো কখনো বিবেকের চরিত্রেও অভিনয় করতাম। এখন বিয়েশাদীতে ব্যান্ডপার্টির বাদ্য বাজিয়ে সংসার চালাই।’ এমন অবস্থা বেশিরভাগ যাত্রাশিল্পীর।
অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা উল্লেখ করে জেলার যাত্রাশিল্পীরা বলেন, ‘এভাবে আর কিছুদিন চললে শিল্পটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিকে বাঁচাতে এখনই সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।’ কেন্দুয়ার বিশিষ্ট পালাকার ও যাত্রাভিনেতা রাখাল বিশ^াস বলেন, ‘ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে বছরে একবার যাত্রা উৎসবের আয়োজন করা হয়।

সেটির মতো করে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত শিল্পকলা একাডেমি বা বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে সপ্তাহ, পক্ষকাল বা মাসব্যাপী যাত্রাপ্রদর্শনীর আয়োজন করা যেতে পারে।’ বিশিষ্ট নাট্যনির্দেশক ও অভিনেতা অধ্যাপক ননীগোপাল সরকার বলেন, ‘গ্রামবাংলায় এখনো হাজার হাজার দর্শক আছেন- যারা টিকিটের বিনিময়ে সুস্থ্যধারার যাত্রাপালা দেখতে চান। কিন্তু সে রকম আয়োজন নেই। যাত্রা হারিয়ে গেলে বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’ 
সঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা

×