ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৪ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

বীর মুক্তিযোদ্ধা হামিদুল হক

যুদ্ধদিনের স্মৃতি 

এ রহমান মুকুল, পঞ্চগড়

প্রকাশিত: ২৩:৪৫, ২৯ ডিসেম্বর ২০২২

যুদ্ধদিনের স্মৃতি 

বীর মুক্তিযোদ্ধা হামিদুল হক

১৯৭১ সাল। বছরের শুরু থেকেই বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্বপকিস্তান) কেমন একটা গুমোট পরিবেশ চলছে। নানাজনে নানান কথা বলছে। পশ্চিম পাকিস্তানিরাও শুরু করেছে বিভিন্ন টালবাহানা। 
এদিকে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশকে শত্রুমুক্ত করার ঐতিহাসিক ঘোষণা দিলে সে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চ লাইটের নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় শুরু করে  নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ। এক রাতেই তাদের হাতে নিহত হন এ দেশের অসংখ্য নিরীহ মানুষ। ঢাকার রাজপথ তখন রক্তের বন্যা। কথাগুলো বলছিলেন, পঞ্চগড় সদর উপজেলার মীরগড় গ্রামের যুদ্ধাহত বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. হামিদুল হক। তখন তিনি ২২-২৩ বছরের টগবগে যুবক। ইতোমধ্যে তিনি ১৯৬৩, ৬৪ ও ৬৫ সালে বোদা থানায় মুজাহিদ ট্রেনিং নিয়েছেন। কোথাও পদায়ন না হওয়ায় ’৭১ সাল পর্যন্ত তিনি বাড়িতেই ছিলেন।

এ বছরের ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তাকে উজ্জীবিত করে তোলে। ২৫  মার্চের পাকিস্তানি সেনাদের শতাব্দীর বর্বর হত্যাকা-ের খবর শুনে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার একটা উৎস খুঁজছিলেন। বর্তমান পঞ্চগড় পৌরসভা কার্যালয়ের কাছে তখন ইপিআরের হেড কোয়ার্টার ছিল। হেড কোয়ার্টারের দায়িত্বে থাকা মেজর আমজাদ সাহেব তখন পঞ্চগড়ে ট্রেনিংপ্রাপ্ত আনসার, মুজাহিদদের একসঙ্গে করার উদ্যোগ নেন। তার সেই উদ্যোগের খবর পেয়ে ২৮ মার্চ তিনিসহ আরও ৮০ জন আনসার, মুজাহিদ ইপিআর হেড কোয়ার্টারে যোগদান করেন। পরদিন ১২৫ জনের একটি প্রশিক্ষিত দল নিয়ে একটি কোম্পানি গঠন করে রাতেই ঠাকুরগাঁও ট্রেজারিতে নিয়ে যায়। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করার জন্য তাদের হাতে মেজর আমজাদ সাহেব তুলে দেয় অস্ত্র ও গোলা-বারুদ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন  হামিদুল হক ৬ নম্বর এর (ক) সেক্টরের হয়ে অসংখ্য সম্মুখযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াই করেছেন। এ সময় তার সেক্টর কমান্ডার ছিলেন এম বাশার আলী (বীর উত্তম)। যুদ্ধ চলাকালীন কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার, লেফটেন্যান্ট মাসুদুর রহমান, লেফটেন্যান্ট মতিন সাহেব। এ ছাড়া কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন সুবেদার আব্দুল খালেক, প্লাটুন কমান্ডার ছিলেন হাবিলদার আনোয়ার হোসেন, সেকসন কমান্ডার ছিলেন নায়েক আব্দুল মালেক।
হামিদুল হক বলেন, তার প্রথম ডিফেন্স ছিল দিনাজপুরের চাম্পাতলী। সেখানে দুইদিন অবস্থানের পর ভাদগাঁও ব্রিজের পাশে অবস্থান নেন। পাকিস্তানি সেনাদের আধুনিক অস্ত্রের সঙ্গে পেরে উঠতে না পেরে তারা পিছু হটে পঞ্চগড়ের পথে। এখানে তারা অমরখানা এলাকায় ঘাঁটি করেন এবং সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে একাধিক সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন।
যুদ্ধকালীন একদিকে পাকিস্তানি সেনাদের নিষ্ঠুর বর্বরতা অন্যদিকে থাকা ও খাবারের অভাব হামিদুল হককে দমাতে পারেনি। তিনি বলেন, যুদ্ধকালীন দীর্ঘ ৯ মাস মাটির বাঙ্কার, বন জঙ্গলে বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন। অত্যধিক পিপাসায় নোংরা পানি নির্দ্বিধায় পান করেছেন। ক্ষুধা নিবারণ করতে ডুমুরের ফল, কাঁচা বিচি কলা, আখের রস খেয়ে কাটিয়েছেন অনেক দিন। জগদল ও অমরখানা এলাকায় অসংখ্যবার খান সেনাদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধ করেন তিনি। শত কষ্টের পরও তিনিসহ তার সহযোদ্ধারা একটুও বিচলিত হননি। মনে তাদের একটাই চাওয়া, দেশকে স্বাধীন করতেই হবে।
২৬ নভেম্বর ১৯৭১। হামিদুল হকসহ সহযোদ্ধারা তখন অমরখানায়। খান সেনাদের অবস্থান জানতে পেরে অমরখানা থেকে অগ্রসর হয়ে লাল স্কুলের সামনে ফারাজউদ্দীন ডাক্তারের বাড়ির পেছনে তারা অবস্থান নেন। সেখান থেকে একটানা তিন দিন তিন রাত খান সেনাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়। সে সময় হামিদুল হকের হাতে ছিল একটি এলএমজি ও প্রয়োজনীয় গোলা-বারুদ। খান সেনাদের পরাস্ত করতে তিনি পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়া সড়কের বামপাশে একটি গর্তে পজিশন নেন। চারদিকে তাকাতেই দেখেন, খান সেনারা ডানদিক থেকে ক্রস করে বাম দিকেই আসছে। তাদের এমন গতিপথ দেখে অনবরত গুলি চালাতে থাকেন হামিদুল হক।

গোলাগুলির পাশাপাশি তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান লক্ষ্য করে বোমা মারতে থাকেন। তাদের একটি বোমার আঘাত হামিদুলের শরীরের বিভিন্ন অংশে লাগলে তিনি গুরুতর আহত হন। এ সময় সহযোদ্ধা আনসার আলী ও লেফটেন্যান্ট মাসুদুর রহমান তাকে উদ্ধার করে দেবনগরে মাটির নিচে তৈরি করা বিশেষ একটি হাসপাতালে ভর্তি করে। কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ হলে তিনি পুনরায় যুদ্ধে অংশ নেন।
জগদলের লাল স্কুলের কাছে তুমুল যুদ্ধে তার সহযোদ্ধা ইপিআর সদস্য হারুণ অর রশিদ, পুলিশ সদস্য সফি, আমতলার সুমু, লাঠুয়াপাড়ার রহিমউদ্দীন খান সেনাদের সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ লড়াই করে শহীদ হন। একই দিন সামনে অ্যাডভান্স করার পথে সহযোদ্ধা গোল হোসেন, ফকিরের হাটের হবিবর রহমানও শহীদ হন।
হামিদুল হক বলেন, ২৯ নভেম্বর মুক্তিফৌজ, মুক্তিযোদ্ধা, গেরিলা বাহিনী ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর যৌথ আক্রমণে পাক হানাদার বাহিনী টিকতে না পেরে পঞ্চগড় ছেড়ে ময়দানদীঘি চলে যায়। পরদিন ময়দানদীঘিতে তুমুল সংঘর্ষ হলে পাকিস্তানি বাহিনী ময়দানদীঘি ছেড়ে চলে যায়। প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা স্বাধীন হতে থাকে। এ দেশের বীর সন্তানরা প্রত্যক্ষ করেন কত ত্যাগ, কত সাধনা, কত কষ্টের বিনিময়ে একটি দেশ স্বাধীন হচ্ছে। সব হারিয়েও মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে মুখে তখন আনন্দের উচ্ছ্বাস। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে ১৮ ডিসেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ে ক্যাপ্টেন শাহরিয়ারের হাতে অস্ত্র জমা দেন। পরদিন তাদের নিয়ে যাওয়া হয় সৈয়দপুরে।

সৈয়দপুরে ২০ দিন থাকার পরদিন সেনা বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার চিত্ত রঞ্জন দত্ত, লেফটেন্যান্ট মতিন, লেফটেন্যান্ট লিয়াকত, ও ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার সকাল ৮টায় গ্রাউন্ডে তাদের ফোলিং করেন। দেশকে স্বাধীন করার পর দেশ রক্ষার দায়িত্ব সম্পর্কে তারা তাদের বক্তব্য পেশ করে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্য থেকে আনসার, পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানালে অধিকাংশ সহযোদ্ধাই আনসার ও পুলিশে যোগদান করেন। যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা হামিদুল হকসহ মাত্র ২৭ জন সেদিন সেনা বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি সেনা বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে তার সুখী পরিবার। বর্তমানে তিনি ধাক্কামারা ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ইউনিয়ন কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পূর্বে মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো মূল্যায়নই ছিল না। আওয়ামী লীগ সরকার ছাড়া অন্য কোনো সরকারই কখনো মুক্তিযোদ্ধাদের পৃষ্ঠপোষকতা দূরে থাক সামান্য মূল্যায়নই করেনি। বর্তমান সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানানোর পাশাপাশি মাসিক ভিত্তিতে আর্থিকভাবেও পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। এ জন্য তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

×