১৭ নভেম্বর ২০১৯, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

শেখ হাসিনা কঠোর অবস্থানে ॥ শোভন-রাব্বানী বাদ

প্রকাশিত : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯
  • ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জয়, সম্পাদক লেখক
  • আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন ২০-২১ ডিসেম্বর

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কঠোর অবস্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের অনৈতিক অভিযোগের বিরুদ্ধে তার ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান স্পষ্ট করলেন তিনি। চাঁদাবাজির অভিযোগে সমালোচনার মুখে থাকা রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এই কঠোর অবস্থানের মাধ্যমেই কেউ অনিয়মে জড়ালে সে যত বড়ই নেতা হোক না কেন, ন্যূনতম ছাড় পাবেন না, সারাদেশের নেতাকর্মীদের কাছে এই মেসেজটিই পৌঁছে দিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।

শনিবার গণভবনে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাকে সরিয়ে দেয়ার এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ছাত্রলীগ সাবেক সভাপতি শোভন ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাব্বানীকে বাদ দিয়ে তাদের জায়গায় সংগঠনটির বর্তমান সিনিয়র সহ-সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

এদিকে শনিবারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর। বৈঠক শেষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, সভায় ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ২০ ডিসেম্বর বিকেলে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্মেলনের উদ্বোধন হবে। জানা গেছে, চরম বিতর্কের মুখে শোভন ও রাব্বানী নিজ নিজ পদ থেকে পদত্যাগ করে চিঠি দিলে তা গ্রহণ করা হয়েছে। ছাত্রলীগের ইতিহাসে মেয়াদপূর্তির আগে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দু’জনকেই সরিয়ে দেয়ার ঘটনা এই প্রথম।

বৈঠক সূত্র জানায়, আগামী জাতীয় সম্মেলন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সাত বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা সারাদেশে সংগঠনের বিস্তারিত চিত্র প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। সভায় আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগে যেসব জেলা-উপজেলা কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, সেখানে দ্রুত সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠন করা হবে।

সভায় উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক শাস্তির বিষয়টিও উঠে আসে আলোচনায়। সিনিয়র নেতারা এ বিষয়ে কেস টু কেস অর্থাৎ বিদ্রোহী প্রার্থীদের ব্যাপারে চুলচেরা বিশ্লেষণ ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে একমত পোষণ করেন বলে বৈঠক সূত্র জানায়। প্রায় দেড় শতাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীর বরাবরে শোকজ নোটিস পাঠানোর বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়।

আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন হয় তিন বছর পর পর। ২০১৬ সালের ২৩ অক্টোবর সর্বশেষ সম্মেলনে সভাপতি পদে শেখ হাসিনা টানা অষ্টমবারের মতো পুনর্নির্বাচিত হন। তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক পদে নতুন মুখ এসেছিলেন ওবায়দুল কাদের। সেই হিসাবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ পূরণের দুই মাসের মাথায় সম্মেলন হচ্ছে।

বৈঠক শেষে ছাত্রলীগ প্রসঙ্গে ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের জানান, শোভন-রাব্বানীকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। তবে ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি বহাল থাকবে। পদাধিকার বলে আল নাহিয়ান খান জয় ছাত্রলীগের ১ নম্বর ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ায় সভাপতির দায়িত্ব পেয়েছেন। আর লেখক ভট্টাচার্য এক নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক থাকায় তিনিই সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছেন। তারা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর। সে হিসেবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ আরও দশ মাস বাকি আছে। এ সময়ে নাহিয়ান ও লেখক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করবেন। তাদের দ্রুততম সময়ে ছাত্রলীগের সম্মেলন করার তাগিদ দেয়া হয়েছে বলেও জানান ওবায়দুল কাদের।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, গুরুতর অভিযোগের পর তাদের (শোভন-রাব্বনী) আর দায়িত্বে রাখা যায় না। আর ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ছাত্রলীগের এই দুই নেতার এমন আচরণ সত্যিই কষ্টের। আমিই তাদের নেতা বানিয়েছি। এরা অপকর্মে জড়িত হবে, এটা মানা যায় না। তবে আমি ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ভাংবো না। আগামী সম্মেলন পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগে ক্যাডার পলিটিক্সের জায়গা নেই। কেউ ক্যাডার পলিটিক্স করলে কিংবা ক্যাডার পলিটিক্সে মদদ দিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জানা গেছে, সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী ইতোমধ্যেই ছাত্রলীগের সাংগঠনিক নেত্রী, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তাদের পদত্যাগপত্রটি গৃহীত হয়েছে বলে জানান আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা।

শোভন ও রাব্বানী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ থেকে কয়েক শতাংশ চাঁদা দাবি করেছেন বলে সম্প্রতি অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৮ সেপ্টেম্বর দলের এক সভায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙ্গে দেয়ার নির্দেশ দেন বলে খবর প্রকাশ হয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এক চিঠিতে গোলাম রাব্বানী এ বিষয়ে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে উপাচার্যের স্বামী ও ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।

প্রধানমন্ত্রীকে রাব্বানী লিখেছিলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অভিযোগ আপনার (প্রধানমন্ত্রী) কাছে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপাচার্য ম্যামের স্বামী ও ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে ব্যবহার করে কাজের ডিলিংস করে মোটা অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য করেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ঈদ-উল-আজহার পূর্বে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা দেয়া হয়। এ খবর জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুরু হয় এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্য ম্যাম আমাদের স্মরণ করেন। আমরা দেখা করে আমাদের অজ্ঞাতসারে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগকে টাকা দেয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তোলায় তিনি বিব্রতবোধ করেন। নেত্রী, ওই পরিস্থিতিতে আমরা কিছু কথা বলি, যা সমীচীন হয়নি। এজন্য আমরা ক্ষমা প্রার্থী।

এর আগে ২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে ছাত্রলীগের জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ৩১ জুলাই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনকে সভাপতি ও গোলাম রাব্বানীকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রলীগের কমিটি অনুমোদন দেন। শুরু থেকেই ছাত্রলীগের এই দুই নেতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দরজা খোলা ছিল। এর ফলে অতীতের মতো আওয়ামী লীগের জাতীয় বা স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী কেউ চাইলেই ছাত্রলীগে সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ পাননি। কিন্তু শোভন-রাব্বানী এই ইতিবাচক দিকটির সদ্ব্যবহার না করে এটিকে নেতিবাচক বিষয়ে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ করেন অনেক নেতা।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার আগরপুর ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আলী খানের ছেলে আল নাহিয়ান খান জয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাবার হাত ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন তিনি। আল নাহিয়ান জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়েছেন। শোভনের সঙ্গে একই বর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। এখন ক্রিমিনোলজি বিভাগ থেকে সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স করছেন জয়। ছাত্রলীগের বিগত কেন্দ্রীয় কমিটির আইন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা জয় তার আগে সার্জেন্ট জহরুল হক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের ছাত্র। এখন স্নাতকোত্তর করছেন তিনি। যশোরের মনিরামপুরের ছেলে লেখক পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্যের ভাতিজা। লেখক ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ও জগন্নাথ হল শাখার বিগত কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

প্রকাশিত : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯

১৫/০৯/২০১৯ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: