ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৮ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

অনন্য মানবিক কবিয়াল

ড. বিশ্বজিৎ রায়

প্রকাশিত: ২১:৪২, ১০ নভেম্বর ২০২২

অনন্য মানবিক কবিয়াল

উনিশ শতকের যাত্রা শুরু থেকে নাগরিক গানের বিভিন্ন ধারার অজস্র শাখা-প্রশাখা বিস্তার শুরু করলো

উনিশ শতকের যাত্রা শুরু থেকে নাগরিক গানের বিভিন্ন ধারার অজস্র শাখা-প্রশাখা বিস্তার শুরু করলো। কলকাতা তখন রাজধানী। ব্রিটিশ আমল। সেই সময়টিকে নামকরণ করা হলো আধুনিক যুগ। উনিশ শতকের নাগরিক মানুষগুলোর প্রয়োজনে একদিকে তৈরি হচ্ছে উচ্চমার্গের ধর্মচেতনায় ব্রহ্মসংগীত। অন্যদিকে ইংরেজের কাছ থেকে প্রাপ্ত স্বাদেশিকতা তত্ত্বযুক্ত স্বদেশীগান। এই পটভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ নামক অসামান্য গীতিকবির আবির্ভাব। শহর কলকাতাকে ঘিরে আরো কিছু গানের সম্ভার পাই। নানাবর্গের গান। রাজধানী কলকাতার জৌলুসে আত্মাহুতি দিতে যা গ্রামীণ জনপদ থেকে কিংবা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন ধারার গান এসে জড়ো হতে লাগলো।

শুধুমাত্র পৃষ্ঠপোষকতালাভের উদ্দেশ্যে। কবিগান, যাত্রাগান, পাঁচালী, কথকতা, বাঈজীবাড়ীর গান এমনকি তাদের পাশাপাশি উচ্চমার্গের খেয়ালিয়া বা ধ্রুপদিয়া। এই নানাবর্গের গানে মত্ত ছিল ভদ্রশ্রেণী থেকে নিম্ন বর্গের মানুষজন। ক্রমে গ্রাম থেকে উঠে আসা বিষয়ের সঙ্গে ক্রমে ক্রমে যুক্ত হতে লাগলো অশ্লীলতা। কবিগান, যাত্রা বা পাঁচালী আক্রান্ত হলো সর্বসাধারণ নামক অপরিণত ¯ূ’লায়তন ব্যক্তিদ্বারা। তখন হঠাৎ বনে যাওয়া ধনিক শ্রেণী নিজের আর্থিক আত্মম্ভরতা দেখাতে নেশাগ্রস্ত হয়ে উঠলো। তবে গানের শুদ্ধতা কোথাও যে রক্ষিত হচ্ছিল না  তা নয়।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ কবিগান সম্পর্কে তিনি বলেছেন,
‘বাংলার প্রাচীন কাব্যসাহিত্য এবং আধুনিক কাব্যসাহিত্যের মাঝখানে কবিওয়ালাদের গান। ইহা এক নূতন সামগ্রী এবং অধিকাংশ নূতন পদার্থের ন্যায় ইহার পরমায়ু অতিশয় অল্প।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩৯২ বঙ্গাব্দ :৩০২)।
পরবর্তী সময়ে কবিগুরুর এই ধারণা যে তাঁর ভুল ছিল, তিনি তা স্বীকার করেছেন। লোকায়তবর্গের গানগুলোর মধ্যে কবিগান যে বহুকাল পূর্ব হতে চলে আসছে তা বলাই বাহুল্য। গোঁজলা গুই (১৮শ’ শতকের প্রারম্ভে) আদি কবিয়াল হিসেবে বিশেষ আলোচনায় আসে।

সেই সঙ্গে ঈশ^রগুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯) ও মনোমোহন বসু (১৮৩১-১৯১২) পর্যন্ত বহু কবিয়াল কবিগানের চিতান-পরচিতান ইত্যাদি রচনাকৌশলের সাহায্যে বাহ্বা কুড়াতেন। জনগণের মনোরঞ্জনের তাগিদ নিয়ে কবিগান যে নাগরিক সমাজে নিন্দিত ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, একথা সত্যি। কিন্তু একথাও সত্যি হরু ঠাকুর, রাম বসু, নিতাই বৈরাগী এঁরা অতি উঁচুদরের কবিয়াল ছিলেন। ইচ্ছে করলে ভাল গান যে বাঁধতেও পারতেন, একথাও সত্য। “সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রাম বসুর একটি বিরহের গান ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। গানটি হলো-
একে আমার যৌবনকাল তাহে কাল বসন্ত এল।
এ সময়ে প্রাণনাথ প্রবাসে গেল ॥
যখন হাসি হাসি সে ‘আসি’ বলে
সে হাসি দেখিয়ে ভাসি নয়নের জলে ॥
তারে পারি কি ছেড়ে দিতে, মন চায় ধরিতে
লজ্জা বলে ছি ছি ধোরো না ॥
বঙ্কিমচন্দ্রের অনুবাদ-
It is the spring of the year, and it is the spring of my life,
And the lord of my life his left me for a distant land.
He came to me with a smile and told me he would go ;
I swa that smile, and that smile filled my eyes and tears.
(দুর্গাদাস লাহিড়ি সম্পাদিত ২০০১ :০৯)

কবিগানের সেকালে অশ্লীলতা যুক্ত হয় পৃষ্ঠপোষকতাদানকারী কর্তাব্যক্তিদের চাহিদা মেটাতে। এরকম ভূরি ভূরি উদাহরণ দেয়া যাবে। শুধু কবিগান নয়, পাঁচালী-যাত্রা-আখড়াই-হাফ আখড়াইও আক্রান্ত হয়েছিল এই ভ্রষ্টাচারে। আজ যখন প্রতিপাদ্য ‘বিজয় সরকার’ নিয়ে লিখতে বসেছি তখন আখড়াই-হাফ আখড়াই হারিয়ে গেছে। আধুনিকীকরণ পাঁচালী উল্লেখিত হয় দাশরথি রায়ের (১৮০৬-১৮৫৭) নামে। আর কী কোনো রচয়িতা ছিলেন না পাঁচালীর। তার আগে ছিলেন গঙ্গানারায়ণ নষ্কর ও লক্ষ্মীকান্ত বিশ^াস। এই আধুনিক পাঁচালী সম্পর্কে ‘মনোমোহন গীতাবলী’ গ্রন্থে কিঞ্চিৎ পরিচয় পাওয়া যায়। একটু উদ্ধৃতি দেয়া যাক-
“পাঁচালির প্রণালী এইরূপ, হাফ আখড়াইয়ের ন্যায় তানপুরা, বেহালা, ঢোল, মন্দিরা, মোচং প্রভৃতি ইহার বাদ্যযন্ত্র- ইদানীং ঐক্যতান (ংরপ) বাদ্যের ফ্লুটাদি উপকরণও তৎসঙ্গে চলিত। হাফ আখড়াইয়ের ন্যায় বাদ্যেও লড়াই হইতÑ সে বাদ্যের নাম ‘সাজ বাজানো’। ‘সাজ বাজনো’র পরে ‘ঠাকরুণ বিষয়’ বা শ্যামা বিষয়। প্রথমেই শ্যামা বিষয়ক একটা গান সকলে মিলিয়া গাইবার পর কাটানদার উক্ত বিষয়ে ছড়া কাটাইতেন- অর্থাৎ ঐ কার্যের কোন এক ব্যক্তি অঙ্গভঙ্গির সহিত, কখনো বা সহজ গলায়, কখনো বা একপ্রকার সুরের সাহায্যে, কখনো বা গদ্যে, কখনো গদ্যের ছুট কথায় উচ্চ সুরে ছড়া বিন্যাস করিতেন- কাটাইতে জানিলে তা শুনিয়া শ্রোতৃবর্গের লোমাঞ্চ হইত।”
(গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ১৮৮৭ :১৬২)   
অথচ মধ্যযুগের কাব্যধারার প্রাধান্যযুক্ত রীতি ছিল পাঁচালীর। আর অন্যটি পদাবলির। মধ্যযুগের পাঁচালী কাহিনীযুক্ত পদ। যা পয়ার ছন্দে এবং লাচাড়ী (ত্রিপদী) ছন্দে বিবৃত হতো। পয়ার ছন্দে পঠিত অংশ টানা সুরে গীত হতো আর লাচাড়ী অংশ তাল সহযোগে গীত হতো। আমি যে গ্রামের বাসিন্দা সেই গ্রামে এখনো মনসার পাঁচালী পঠিত হয় এই দুই ছন্দে। কতদিন কতবার এই পাঁচালী মায়ের সঙ্গে বসে গেয়েছি তার অজ¯্র উদাহরণ দেয়া যাবে। এই শ্রাবণ মাসজুড়ে মনসার পাঁচালী ভাটি বাংলার গ্রাম-গঞ্জে পঠিত হয়।  
যাক, এবারে আসি মূল প্রতিপাদ্যে। বিজয় সরকার (১৯০৩-১৯৮৫) পেয়েছিলেন বাংলাদেশে কবিগানের একটি রুচিশীল ধারা। ১৯৪৩ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের মাধ্যমে যে কবিয়াল রমেশ শীল (১৮৭৭-১৯৬৭)। কমিউনিজমের দেখানো পথে পা বাড়িয়ে কবিগানে আমূল পরিবর্তন আনেন। যে কবিগান ছিল ধর্মীয় কাহিনী বা আচার নিয়ে লড়াইয়ের অনুষঙ্গ তা হয়ে উঠলো দিনবদলের হাতিয়ার। এরও আগে ছিলেন হরিচরণ আচার্য (১৮৬১-১৯৪১), মুকুন্দ দাস (১৮৮৭-১৯৩৪) ও অব্যবহিত পরে নিবারণ প-িত (১৯১২-১৯৮৪)।

এঁদের উচ্চারণে কবিগান হয়ে উঠেছে সুস্থধারার বাহক। হাজার হাজার মানুষ এই রস, কবির লড়াই দেখে-শুনে ঋদ্ধ হয়েছেন, ভালবেসেছেন। এখনো গ্রামবাংলার আবহে এই কবিগানের লড়াই প্রচলিত আছে। বিজয় সরকার সেই ধারারই একজন কিংবদন্তি কবিয়াল। সারাবাংলাজুড়ে কবিগান ছিল সাধারণ মানুষের চিত্ত বিনোদনের প্রধান উপকরণ। কিন্তু সেখানে অশ্লীলতা ছিল বলে ভ্রম হয়। মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন তাঁর নিবন্ধে বলেছেন-
“ভারতচন্দ্রে যে অশ্লীল ও বিকৃত রুচির সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, স্বভাবতঃই লোকসাহিত্য-রচয়িতারা সেই রস ও রুচির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করিয়াছিল। আর জনসাধারণও মানসিক বল ও উত্তম রসোপলব্ধি-শক্তি হারাইয়া ফেলিয়াছিল। সুতরাং কবিগানের লড়াই তাহাদের বাহ্বা সহজে কুড়াইয়া লইতে পারিয়াছিল।”
(বরুণকুমার চক্রবর্তী ও দিব্যজ্যোতি মজুমদার সম্পাদিত ২০১৩ : ২৭২)
একথা মেনে নেয়া কষ্টকর। যে বাঙালির অস্থিমজ্জায় কাব্যলক্ষ¥ীর বসবাস, যারা রস গ্রহণ করেছেন পদাবলি সাহিত্যÑময়মনসিংহ গীতিকা-মঙ্গলকাব্যের ধারা থেকেÑ সেই ধারা অষ্টাদশ শতাব্দীর (১৭৬০) মধ্যভাগে জন্ম নিয়ে সারাবাংলা অশ্লীলতা ও বিকৃত রুচিতে ভরিয়ে তুলবে? এটা প্রশ্ন জাগে। কলকাতাই তো আর সেদিন সারাবাংলা নয়। তৎকালীন একস্থান থেকে অন্যস্থানের যাত্রাপথ  এতো মসৃণ ছিল না। কবিগুরুর  মতো মনসুরউদ্দিন সাহেবও কলকাতাকেন্দ্রিক কবিগানের চর্চা দেখে তা বলেছিলেন বলে বোধ হয়। কেননা, কবিগান শুধু পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত ছিল না, পূর্ববঙ্গেও এর বেশ প্রচলন ছিল। প্রফুল্লচন্দ্র পালও বলেন, ‘ক্রমশঃ পশ্চিমবঙ্গ হইতে পূর্ববঙ্গে ইহার প্রসার ঘটেÑ’(প্রফুল্লচন্দ্র পাল : ॥?০)
একথা মোটেই স্বীকার করা যায় না। কেননা, পূর্ববঙ্গ লোক-সঙ্গীতের একটা খনি বিশেষ। এখানে পশ্চিমবঙ্গ হতে ধার করে কবিগান পূর্ববঙ্গে আনয়ন করা হবে এটা অতিশয় উক্তি। পল্লীকবি জসীম উদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬) ছিলেন কবিগানের বিশেষ সমঝদার। তিনি নিজেও কবিগানের লড়াইয়ে কয়েকবার যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৩২ সালের ঘটনা। ফরিদপুরের রাজেন সরকারের নেতৃত্বে দুই শিষ্য বিজয় সরকার ও নিশিকান্ত সরকারকে নিয়ে একদল গায়করা নৌকা করে কলকাতায় আসেন। জসীম উদ্দীন তাঁর জীবনস্মৃতিতে উল্লেখ করেছেন-
“কলিকাতার এ্যালবার্ট হল ভাড়া লইয়া নির্দিষ্ট তিনদিন তাঁহাদের কবিগানের ব্যবস্থা করিলাম।. . . নির্দিষ্ট দিনে এ্যালবার্ট হলে কবিগান হইল। তেমন আশানুরূপ জনসমাগম হইল না। পূর্ণ ভট্টাচার্য নামে এক ব্যক্তি ‘আনন্দবাজার পত্রিকায়’ এক বিবৃতি দিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, কবিগানকে এই দলের লোকেরা আধুনিক রূপ দিয়া ইহার রসাত্মক দিকটিকে ক্ষুণœ করিয়াছেন। সখীসংবাদ, ভোরগান প্রভৃতি যাহা কবিগানের অলঙ্কারস্বরূপ ছিল, তাহা বর্জন করিয়া ইঁহারা কবিগানকে ছড়া-সর্বস্ব বানাইয়া কবিগানের আসল রূপটিই নষ্ট করিয়াছেন।

ইত্যাকার সমালোচনায় পরদিন আর কবিগানে তেমন জনসমাগম হইল না। রাজেন সরকার আশাভঙ্গ হইয়া পাগলের মত হইয়া পড়িলেন। সঙ্গী-সাথীদিগকে দেশে পাঠাইতে রাজেন সরকারকে তার বহুকালের সঙ্গী নৌকাখানিকে বিক্রয় করিয়া দিতে হইল। কত আশা লইয়াই তিনি কলিকাতা আসিয়াছিলেন। কিন্তু গ্রামদেশের মানুষ যে এখানে আসিয়া তাহার রুচি বদলাইয়াছে, আর যে তাহারা সেই রসধারায় ফিরিয়া যাইবে না একথা হতভাগ্য রাজেন সরকার জানিতেন না।”(পুলক চন্দ সম্পাদিত ২০১৬ : ৮৬) জসীম উদ্দীন সাহেবের বহুদিনের বন্ধুত্ব ছিল বিজয় সরকার ও নিশিকান্ত সরকারের সঙ্গে। তিনি বলেছেন-
“বিজয় আর নিশিকান্ত এখন নামকরা কবিয়াল। উভয় বঙ্গে তাঁহারা কবিগানের বায়না পাইয়া থাকেন। বহুদিন উনাদের সঙ্গে দেখা হয় না। মাঝে মাঝে দেশীয় গ্রাম্য গায়কদের মুখে বিজয়ের রচিত বিচ্ছেদ গান শুনিয়া পাগল হই। এমন সুন্দর সুর বুঝি কেহই রচনা করিতে পারে না। ছাপাখানা বা রেডিও গ্রামোফোনের সাহায্য ব্যতিরেকে নতুন সুরের গানগুলি গ্রামবাংলার সর্বস্তরে ছড়াইয়া পড়িতেছে।” (প্রাগুক্ত ২০১৬ : ৮৭)
জসীম উদ্দীন সাহেবের সঙ্গে বিজয় সরকারের যে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল সেই সম্পর্কে জীবনীকার মহসিন হোসাইন জানিয়েছেন -
“১৯৬৯/৭০ সনে কবি জসীম উদ্দীন খুলনার সাহিত্য পরিষদের সম্মেলনে গিয়ে শুনতে পান দৌলতপুরের নিকট পাবলার সাহা বাড়িতে কবিয়াল বিজয় সরকার রামায়ণ গান করছেন। কবি জসীম উদ্দীন সাহিত্য পরিষদের কয়েকজনকে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন পাবনায়। কয়েক যুগ পরে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরলেন। কবিয়াল বিজয় সরকার পল্লীকবির খাতায় লিখেছিলেন :
কালের টানে চলে মানুষ জোয়ার ভাটা ধরে
আবার দেখা হলো বন্ধু চল্লিশ বছর পরে।।

পল্লীকবিও কবিয়াল বিজয়ের নোটবইয়ে লিখে দিলেন:
চোখের দেখা নয়তো এযে আত্মায় আত্মায় দেখা
তোমার আমার মধ্যে বন্ধু বিরাট ¯্রােতস্বতা।।”

(মহসিন হোসাইন ১৯৯৪ : ২৫৪)

বিজয় সরকারের বিচ্ছেদী গান :

বিচ্ছেদী গান কি? এ বিষয়ে করুণাময় গোস্বামী মহাশয় তাঁর রচিত সঙ্গীতকোষ গ্রন্থে জানিয়েছেনÑ
“নায়ক নায়িকার ভেতরকার বিচ্ছেদ এই গানের উপজীব্য। তবে মানবিক বিচ্ছেদ এই গানের প্রধান বিষয় নয়। পরমাত্মার সাথে জীবাত্মা, ¯্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টি ও ভক্তের সঙ্গে ভগবানের বিচ্ছেদই এই গানের প্রধান উপজীব্য। এই অর্থে বিচ্ছেদী আধ্যাত্মিক লোকগীতি। এই গানে প্রতীকসম্পর্কেও ব্যবহার যথেষ্ট। মরমী গুণ সম্পন্ন হওয়ার বিচ্ছেদী গানে এক প্রকার অস্পষ্টতা ও গূঢ়তার ব্যঞ্জনা দেখা যায়। রাধাকৃষ্ণের প্রণয় সম্পর্কের বিরহমূলক দিকটিকে এই গানে বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়।”(করুণাময় গোস্বামী,  ১৯৮৫ : ৪৮৪)
এছাড়া কোনো সংজ্ঞা পাওয়া যায় না। কিন্তু মহাশয়ের প্রদত্ত সংজ্ঞাতেও মন তৃপ্ত হলো না। লেখক মনে করে বিচ্ছেদী গান একক কণ্ঠবিহারী গান। মানুষের ব্যক্তিগত দুঃখ থেকে উৎসারিত কান্না যখন বাণী ও সুরে উচ্চারিত হয়Ñ সেই গানকেই বিচ্ছেদী গান বলা যায়। অনেকটা ভাটিয়ালি গানের মত সহমর্মী গান বিচ্ছেদী। এই গানের যোগসূত্র অন্য কোথাও নয়, মানুষের অন্তর নিঃসৃত সুরের কান্না শ্রোতার মনেও বিচ্ছেদীর জমিন নির্মাণ করে। তীব্র মানসিক বেদনা বা কষ্ট থেকে এর উৎসরণ। বাচিক শিল্পী বিপ্লব বালা কালি ও কলম পত্রিকায় বিজয় সরকারের বিচ্ছেদী গান নিয়ে লিখেছেনÑ“কবিগানের মুখপাঁচালিতে জনপ্রিয় রবীন্দ্র-নজরুল-জসীমউদ্দীনের গানের ধুয়া দিতেন তিনি। সেটা শ্রোতাসাধারণের পরিচিত প্রিয় বলেও। কবিগানের পাল্লায় শাস্ত্রীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশ থেকে একধরনের সহজ গানের আরাম পেত শ্রোতা। এসব ধুয়াগান দিয়েই তার বিচ্ছেদী গান রচনার সূচনা।”(বিপ্লব বালা : ২০১৭)
এই প্রসঙ্গে একটি কথা আমার বিবেচনায় জোর দিয়ে বলতে চাই, কবিয়াল বিজয় সরকারের চাইতেও বড় বিচ্ছেদী গানের বিজয়। কবিগানের মঞ্চে স্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ প্রাপ্তি মুহূর্তেই গানের মঞ্চ শোকের মঞ্চে পরিণত হলো। তবে জীবনীকার মহসিন হোসাইন জানিয়েছেনÑ“কবিয়াল বিজয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ‘পোষাপাখী’। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, ১৩৫২ সনে কবিয়ালের ১ম স্ত্রীর বিয়োগের পরে শেষকৃত্য সেরে বাড়ি ফেরার পথে ঐ বিচ্ছেদী গানটি রচনা করেন তিনি।”
(প্রাগুক্ত১৯৯৪ : ২৫৩)
পরিশেষে বলতে চাই, কবিয়াল বিজয় সরকার কেবল গায়কই নন, অনন্য গীত¯্রষ্টাও বটে। কবিগানের আসরে তাঁর অনেক বাণীপ্রধান গান রচিত হয়েছে। যেমন- ‘গানের পালা শেষ হইলে আসর ভেঙে যাবে’, ‘তোমার নামে নয়নে মোর অশ্রু ঝরে যেই’, ‘নক্সীকাঁথার মাঠেরে সাজুর ব্যথায় আজো কাঁদে রূপাই মিয়ার বঁশের বাঁশি’, ‘জানিতে চাই দয়াল তোমার আসল নামটা কি’, ‘যারে হারাইয়াছি জীবনে’ ইত্যাদি। তাঁর রচিত গানের মধ্যে বিচ্ছেদী গান বাংলা লোকগানে অন্যমাত্রা যোগ করেছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষায়- বেদনা কী ভাষায় রে / বাজে করুণ সুরে। বিজয় দুই বাংলার এক অনন্য মানবিক কবিয়াল। আজকের দিনে, তাঁর অনুপস্থিতি আমাদের ব্যথিত করে। যখন নিজ জেলায় লালন সাধকের আস্তানা ভেঙে ফেলা হয়। স্কুল শিক্ষককে জুতার মালা পরিয়ে রাস্তায় ঘুরানো হয়। তবুও বিজয় সরকারের মতো অসামান্য গীতিকবি বাংলাদেশের কোটি প্রাণে জেগে থাকুক, তাঁর গান সদা গীত হোক, -এই কামনা।

monarchmart
monarchmart