অভাবমুক্ত জীবনযাপন একটি সুন্দর স্বপ্ন। প্রত্যেকেই চায় অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে এবং তার পরিবারের জন্য ভালো জীবনযাপন নিশ্চিত করতে। অভাব ঘুচানোর প্রধান পথ হলো কঠোর পরিশ্রম সঠিক পরিকল্পনা এবং সততার সঙ্গে আয়ের উৎস বৃদ্ধি করা। দক্ষতা উন্নয়ন সঞ্চয় প্রবণতা অপচয় রোধ এবং সময়ানুবর্তিতা আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করে। এছাড়া সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস ও শুকরিয়া আদায় মনে প্রশান্তি আনে এবং অভাব দূরীকরণে মানসিক শক্তি জোগায়। দেশের উত্তরাঞ্চলের এক সময় মঙ্গাপীড়িত এলাকার মানুষজনের অভাবের কথা আমরা কমবেশি সকলে অবগত। এই মঙ্গাপীড়িত মানুষজন কিভাবে অভাবকে মোকাবিলা করেছে এমন একটি বাস্তবতা কল্পকাহিনীকেও হার মানায়।
সাদেকা আক্তার একজন গৃহবধূ। স্বামীর ঘরের অভাবে তিনি আর হাত পা গুটে বসে থাকতে পারেননি। সংসারের অভাবের সঙ্গে লড়াই করে নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নে তিনি একা দেখেননি। সঙ্গে গ্রামের অভাবী নারীদের নিয়ে জোটগতভাবে সেই সংসারের অভাবের সঙ্গে লড়াই করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। এ জন্য সাদেকা নেতৃত্বের গড়ে তোলা হয় একটি সমিতি। সেই সমিতির মাধ্যমে অভাব ঘুচেছে গ্রামের অন্যান্য নারীদেরও। উত্তরজনপদের বাহের দ্যাশ খ্যাত রংপুর অঞ্চলের তারাগঞ্জ উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে এই সাদেকা আক্তারের নেতৃত্বে নিজেদের অভাব দূর করে এগিয়ে চলেছেন এক ঝাঁক নারী।
সাদেকার জীবনের গল্পটা ছিল অন্যরকম। ২০০০ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয় সাদেকা আক্তারের। শ^শুরবাড়িতে অভাব লেগেই থাকতো। কখনো খাবার জুটতো, কখনো জুটতো না। অভাব থেকে বাঁচতে ২০০৩ সালের দিকে গ্রামের নারীদের নিয়ে সমিতি গঠনের উদ্যোগ নেন সাদেকা। সিদ্ধান্ত নেন সপ্তাহে মাত্র ১০ টাকা করে জমা করবেন বলে। সাদেকা প্রথমে নিজে হস্তশিল্প পণ্য তৈরি প্রশিক্ষণ নেন তারাগঞ্জ পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি কেন্দ্র থেকে। তারপর সেই প্রশিক্ষণ দেন সমিতির অন্য সদস্যদের। এরপর জমা করা টাকা দিয়ে সেলাই মেশিন কিনে শুরু করেন পোশাক তৈরির কাজ।
এ বিষয়ে সাদেকা আক্তার বলেন, বর্তমানে আমাদের সমিতিতে প্রায় দুইশ জনের মতো সদস্য। প্রত্যেক সদস্যের জমা করা টাকা দিয়ে আমরা সেলাই মেশিন কিনে তৈরি করছি বিভিন্ন হস্তশিল্প। মেশিনে মেশিনে কাজের পাশাপাশি হাতের এমব্রয়ডারি কাজের ফাঁকে ফাঁকে করতেছি। আবার মেশিনের এমব্রয়ডারি কাজও চালাইতেছি।
রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামে সাদেকার নেতৃত্বে তৈরি হয় বেগম রোকেয়া মহীয়সী নারী মহিলা উন্নয়ন সমিতি। শুধুই কাপড় সেলাই নয়, গ্রামের শতাধিক নারী নানান পেশায় যুক্ত। কেউ সেলাইয়ে আবার কেউ কাপড়ে নকশা করায় আবার কেউ গরু পালন বা মাছ চাষ করে সফল হয়েছেন। স্থানীয় হাটসহ আশপাশের বিভিন্ন হাটে তাদের তৈরি পোশাক, ব্যাগ ও নকশি কাথার যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। স্থানীয়রা জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারাও বলছেন, এই গ্রামের প্রায় শতভাগ শিশু বিদ্যালয়ে যায় এবং বাল্যবিবাহ বন্ধে গ্রামের বাসিন্দারা সচেতন। এমনকি এ গ্রামে অপরাধ সংগঠনের হারও কম।
সাদেকা সমিতির এক নারী আঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, সমিতির কারণে এলাকায় কোনো নারী নির্যাতন নেই। বাল্য বিবাহ নেই। আরেকজন নারী আয়শা সিদ্দিকা বলেন, মেশিন চালিয়ে সংসারের অনেক উন্নতি হয়েছে। গত ৬/৭ বছর ধরে এই মেশিনে বিভিন্ন কাপড়ে নকশা তৈরি করে আধা-পাকা বাড়ি দিয়েছি। এছাড়া আমার স্বামীকে একটি ভ্যান কিনে দিয়েছে। সমিতির সদস্যরা যে টাকা জমান তা পাঁচ বছর পর পর নিজেরা ভাগ করে নেন। সেই টাকা দিয়েই তারা গরু ছাগল পালন ও পুকুরে মাছ চাষ করেন। এছাড়া সমিতির সঞ্চয়ের টাকায় ১০টি গরু কেনা হয়েছে যেগুলো বর্গা দেওয়া আছে। এছাড়া গ্রামের ৫০ শতক জমি বন্ধক নিয়ে ধান ও কলা চাষ করা হয়েছে। একটি পুকুর ইজারা নিয়ে বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ করা হচ্ছে। যা পরে বাজারজাত করে সমিতির খাতে জমা দেওয়া হয়। এছাড়া সেলিই মেশিন ক্রয় করা হয়েছে ২০টি। এখন সমিতির সদস্য ১৩০ জন নারী। পাশাপাশি সমিতির নারীদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে অবদান রাখায় স্বীকৃতি স্বরূপ রংপুর বিভাগীয় পর্যায়ে জয়িতা নির্বাচিত হয়েছিলেন সাদেকা।
প্যানেল/মো.








