ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১৯ মাঘ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

সৈয়দপুরে বিহারিদের বর্বরতা

ট্রেন থেকে টেনে নামিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ৪৪৮ বাঙালিকে

জনকণ্ঠ ফিচার

প্রকাশিত: ২৩:৪৫, ৭ ডিসেম্বর ২০২২

ট্রেন থেকে টেনে নামিয়ে হত্যা করা হয়েছিল ৪৪৮ বাঙালিকে

একাত্তরে রাজাকার আলবদরদরে নৃশংসতার কথা কারও অজানা নয়। পাশাপাশি বাংলাদশেে বসবাসকারী পাকস্তিানি ও বহিাররিা নষ্ঠিুর ঘাতকরে ভূমকিায় অবর্তীণ হয়ছেলি।

একাত্তরে রাজাকার আলবদরদের নৃশংসতার কথা কারও অজানা নয়। পাশাপাশি বাংলাদেশে বসবাসকারী পাকিস্তানি ও বিহারিরা নিষ্ঠুর ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। বিশেষ করে সৈয়দপুর ছিল বিহারি ও পাকিস্তানি অধ্যুষিত। ফলে সেখানে বহু বাঙালিকে হত্যা করা হয়।
ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা যায়, একাত্তরে নীলফামারীর সৈয়দপুরে জনসংখ্যার ৮০ শতাংশ ছিল বিহারি এবং পাকিস্তানি। বাঙালি ছিল মাত্র ২০ ভাগ। ফলে সেখানে তারা তাদের নির্মমতার সর্বোচ্চটা দেখিয়েছে। একাত্তরে ২৫ মার্চের আগেই সৈয়দপুরে বিহারিরা বাঙালি-নিধন শুরু করে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পর বাঙালিরা প্রস্তুতি নিচ্ছিল মুক্তিযুদ্ধের।

আর সৈয়দপুরের বিহারিরা সংগঠিত হচ্ছিল বাঙালিদের বিরুদ্ধে। ১১ মার্চ বাঙালিদের ওপর বিহারিরা সরাসরি আক্রমণ করে। সেদিন ছিল শুক্রবার। শহরের লিবার্টি সিনেমা হলে দেখানো হচ্ছিল ‘আপন পর’ সিনেমাটি। ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শো চলার কথা। এর কোনো এক সময় বিহারিরা অস্ত্রে হাতে ওই সিনেমা হল ঘিরে ফেলে। জানিয়ে দেয়, এই শহরে আর কোনো বাংলা চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা যাবে না। উর্দু সিনেমা দেখাতে হবে। এর প্রতিবাদে ফুঁসে উঠে বাঙালি দর্শক। কিন্তু সংখ্যায় অধিক এবং সশস্ত্র বিহারিদের সঙ্গে  বাঙালিরা হার মানতে বাধ্য হয়।
মুক্তিযুদ্ধের স্থানীয় ইতিহাস বলছে, এরপর বিহারিরা সৈয়দপুরে শহরে সশস্ত্র মিছিল বের করে। হাতে ছিল লাঠিসোটা, হকিস্টিক, রামদা, কিরিচ এবং দেশী বন্দুক। প্রতি-উত্তরে ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও বের হয় পাল্টা মিছিল। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, মাঝে মাঝে ছোটখাটো সংঘর্ষ। এর মাঝে বিহারি এবং পাকিস্তানিরা আরও সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে সৈয়দপুর শহরের বাঙালিদের অবরুদ্ধ করে ফেলে চারদিক থেকে।

স্থানীয় সংবাদদাতা জানান, ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকায় গণহত্যা শুরু করলে সৈয়দপুরে বিহারি এবং পাকিস্তানিরা দ্বিগুণ উৎসাহিত হয়ে মাঠে নামে। শুরু করে নির্মম হত্যাকা-। দিনের বেলায় রাস্তাঘাটে বিহারিদের সশস্ত্র মহড়া আর রাতে চলত হত্যাযজ্ঞ। স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের তালিকা করে প্রতি রাতে হত্যা করা হতো। এ ধারাবাহিকতায় আসে ১৩ জুন। ওই দিন গোলাহাটে বর্বরতম  হত্যাকা- চালায় তারা।

আগের দুই দিন ১১ এবং ১২ জুন পাকিস্তানি সেনারা চরম প্রতারণার আশ্রয় নেয়। সারা শহরে তারা মাইকিং করে বলে দেয়, যারা সৈয়দপুর ছেড়ে ভারতে চলে যেতে চান তারা যেন ১৩ জুন সকাল ৮টার মধ্যে সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনে চলে আসেন। পাকিস্তানি সৈনিকরা একটি ট্রেনে করে ভারত-গমনেচ্ছুদের নিরাপদে চিলাহাটি বর্ডারে পৌঁছে দেবে। এই কথা অনেকে বিশ্বাস করে পাকিস্তানি ও বিহারিদের পাতা এই ফাঁদে পা দেয়।

প্রধানত হিন্দু মাড়োয়ারি এবং সাধারণ বাঙালি হিন্দুরা ১৩ জুন সকাল ৮টার মধ্যে পরিবার-পরিজন নিয়ে অগত্যা সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনে চলে আসেন। অন্য কোনো উপায় না পেয়ে প্রায় আট-নয়শ’ হিন্দু সেদিন পাকিস্তানিদের ট্রেনে ওঠে বসেন। অচিরেই যাত্রীরা বুঝতে পারেন যে, তারা ফাঁদে পা দিয়েছেন। ট্রেনটি ধীরগতিতে গোলাহাট এলাকায় এসে একটি কালভার্টের ওপর থেমে যায়। বিহারিরা টেনে নামাতে শুরু করে শরণার্থীদের।

তার পর চলে হত্যাজজ্ঞ। ভাগ্যগুণে বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের একজন ছিলেন কাল্টুদা। তার বর্ণনা অনুযায়ী, সর্বপ্রথমেই নামানো হয় এক বয়োবৃদ্ধকে। বৃদ্ধ মানুষটি বিহারি আর পাকিস্তানিদের কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে কাকুতি-মিনতি করছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানি সৈন্যরা অস্ত্র তাক করে আছে কামরার শরণার্থীদের দিকে। এ সময় দুজন বিহারি এসে ওই বয়স্ক মানুষটির গায়ের জামাটি দিয়ে তার মুখ ঢেকে ফেলে। এরপরে একজন বিহারি বৃদ্ধ মানুষটির দু’হাত টেনে পিছমোড়া করে ধরে থাকে।

অন্যজন তাকে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের দরজা দিয়ে বাইরে নিয়ে যায়। ওখানে, কালভার্টের গোড়ায় দাঁড়ানো একজন বিহারি উন্মত্ত যুবক হাতের ধারালো কিরিচ দিয়ে বৃদ্ধ মানুষটির মাথা এক কোপে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। দেহ থেকে ছিন্ন মাথাটি গড়িয়ে পড়ে কালভার্টের নিচে। এবারে মস্তকহীন মানুষটির কোমরে একটি লাথি দিয়ে কালভার্টের নিচে ফেলে দেয় অন্য একজন বিহারি।

তার পর এক এক করে শরণার্থীদের ট্রেন থেকে নামিয়ে গুলি কিংবা ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করতে থাকে স্থানীয় বিহারি এবং পাকিস্তানিরা। শরণার্থীদের রক্তে নয়নজলির জল লাল হয়ে যায়। রেললাইনের দু’পাশে দীর্ঘদিন পড়ে থাকে শহীদদের লাশ। সেখানে ৪৪৮ জন মানুষ হত্যা করা হয়েছিল বলে তথ্য পাওয়া যায়।
বর্তমানে গোলাহাট বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। ফলকে লিখে রাখা হয়েছে সেদিন শহীদ হওয়া কিছু মানুষের নাম। এর বাইরে তেমন কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। ইতিহাসটিও কোথাও ভালো করে লিখে রাখা হয়নি।
তবে শহীদ পরিবারের সদস্যরা বুকে বাঁচিয়ে রেখেছেন বেদনাবিদুর ইতিহাস। ৫১ বছর আগের সেই নির্মম হত্যাকা-ের বর্ণনা করতে গিয়ে এখনও আঁতকে ওঠেন শহীদ পরিবারের সদস্য ও প্রতক্ষ্যদর্শীরা। ট্রেন  থেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে পেরেছিলেন ২২ যুবক। তাদের মধ্যে বিনোদ আগারওয়াল, শ্যাম সুন্দর আগারওয়াল, তপন চন্দ্র দাস ও গোবিন্দ চন্দ্র দাস নামে চারজন বেঁচে আছেন এখনো। শহীদ তুলশীরাম সড়কে অবস্থিত তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়,  সকলেই এখন অশীতিপর বৃদ্ধ। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত। চলাফেরা করছেন কোনোভাবে। ভয়াল দিনের কথা জানতে চাইলে কষ্টে কেঁদে ফেলেন কেউ কেউ।
গোবিন্দ দাস বলেন, এ ঘটনা তো বলছি ৫১ বছর ধরে। ৭০ এর নির্বাচনের রায় ওরা মেনে নিতে পারেনি। তখন থেকেই নানা অজুহাতে দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করছিল। পরে পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে উর্দুভাষীরা পাকিস্তানি এবং বাঙালিরা বাংলাদেশের পতাকা উত্তলন করায় দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছে। ২৩ মার্চ থেকে তারা শুরু করে হত্যাযজ্ঞ।
শ্যাম সুন্দর আগারওয়াল জানান, ১২ জুন পাকসেনারা এসে বলে, আপনাদের ওপর মেজর সাহেব খুবই খুশি। তাই আপনাদের নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেয়া হবে। কিন্তু কেউ আর ভারতে যেতে পারিনি। ভয়ংকর মৃত্যু দেখতে হলো আমাদের। ওই দিনটি কেমন ছিল তা ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না।
তপন দাস জানান, একইভাবে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় পাকিস্তানি জল্লাদরা প্রায় সাড়ে তিনশ’ বাঙালিকে হত্যা করে। শহরব্যাপী মাইকিং করে সব রেলকর্মচারীকে কাজে যোগদানের জন্য নির্দেশ দেয়। সেখানে অবাঙালি অধ্যক্ষ মতিন হাশমী, হব্বু বিহারী, জাহিদ ও রেলওয়ের অবাঙালি নরপিশাচরা কারখানার ফাউন্ড্রি শপের ১৮শ’ সেন্টিগ্রেড ফারেনহাইট তাপমাত্রার ৩টি চুল্লি ও ফার্নেস চুল্লিতে বাঙালিদের নিক্ষেপ করে। কয়লা ও বৈদ্যুতিক বাতাস দ্বারা লোহা গলানো লাভায় তাদের দেহের হাড়, মাংস গলে যায়। এছাড়া কারখানার বিভিন্ন সপে বাঙালি কর্মচারীদের হত্যা করা হয়।
সৈয়দপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. একরামুল হক বলেন, এ শহরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রতিরোধ গড়া হয়নি। কারণ এখানে পাক সেনানিবাস ছিল। এরপরও অসংখ্য মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল।  
শহীদ পরিবারের সন্তান মহসিনুল হক বলেন, একাত্তরে যারা  আমাদের পূর্বসূরিদের হত্যা করেছিল তাদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা যায়নি। এমনকি ইতিহাসটি নিয়ে সেভাবে কাজও হয়নি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার স্বার্থে সৈয়দপুর গণহত্যা নিয়ে সরকারিভাবে কাজ করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

monarchmart
monarchmart