আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ১৭.২ °C
 
১৭ জানুয়ারী ২০১৭, ৪ মাঘ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

হাইড্রোলিক হর্নের তাণ্ডব বন্ধ হোক

প্রকাশিত : ১৩ মে ২০১৬
  • শাহজাহান মিয়া

বায়ু দূষণ ও শব্দ দূষণ নিয়ে গত ১৫ বছরে আমি পাঠকপ্রিয় এ পত্রিকাটিসহ আরও কয়েকটি বহুল প্রচারিত পত্রিকায় অনেকবার লিখেছি। বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্নভাবে শব্দ দূষণের তা-ব মারাত্মকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আরও একবার লিখার তাগিদ বোধ করছিলাম। যদিও লিখে আর কি হবে এ হতাশা ও দুঃখবোধটা মনের মধ্যে প্রচ-ভাবে কাজ করছিল, তবুও মনের ক্ষুধা নিবারণের জন্য বিষয়টি নিয়ে আরও একবার লিখার ইচ্ছা প্রবলভাবে জেগে ওঠে। তাই নতুন করে আমার এই প্রয়াস। যাদের উদ্দেশে লেখা তারা যদি জনসাধারণের স্বার্থে সমস্যাটি সমাধানে এগিয়ে না আসেন, তাহলে তো দুঃখের আর সীমা থাকে না। কারণ, সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা ‘কানে দিয়েছি তুলো পিঠে বেঁধেছি কুলো’ মন্ত্র নিয়ে ঠায় বসে থাকেন। ভাবখানা এমন যেন বিষয়টির দিকে তাদের নজর দেয়ারই সময় নেই। ‘মারাত্মক বায়ু ও শব্দ দূষণে রাজধানী ঢাকা’ শিরোনামে গত ২০১৫ সালের ২৩ জুন এই পত্রিকায় আমার একটি লেখা ছাপা হয়েছিল। তবে গত ৩০ এপ্রিল ‘অসহনীয় শব্দ দূষণ’ শিরোনামে এই পত্রিকাটিতে প্রকাশিত একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী, সুন্দর এবং তথ্যসমৃদ্ধ সম্পাদকীয় এ বিষয়টি নিয়ে আবারও আমাকে লিখতে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করে।

শব্দদূষণ নীরব ঘাতক। পরিবেশ ও দূষণমুক্ত জনস্বার্থ রক্ষা নিশ্চিতকরণের প্রেক্ষাপটে শব্দদূষণ মারাত্মক পরিবেশগত সমস্যার রূপ পরিগ্রহ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী-খাল-বিল এবং অন্য জলাশয়গুলো দূষণ ও দখলের ঘৃণ্য প্রতিযোগিতার ফলশ্রুতিতে অবধারিত বায়ুদূষণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শব্দদূষণ। আসলে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকা। নদী দখল ও দূষণ এবং বিপর্যয়কর বায়ু ও মারাত্মক শব্দ দূষণের কবলে পড়ে ঢাকার পরিবেশ ভয়ঙ্কর দূষিত হয়ে পড়ছে। ফলে এসব এলাকায় বসবাসকারী অসহায় মানুষগুলোকে প্রতিনিয়ত প্রচ- স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে দিনযাপন করতে হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার ভয়ঙ্কর দূষিত পানি, ভারি সীসাযুক্ত বাতাস, মারাত্মক শব্দদূষণ এবং ত্রুটিপূর্ণ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিয়েছে মহানগরী ঢাকাকে। বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে মেগাসিটি ঢাকা। পরিস্থিতি বিস্ফোরণোন্মুখ। গবেষকদের মতে, ঢাকায় বায়ু দূষণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে পাঁচগুণ বেশি। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে এ মাত্রা আরও বেশি। এসব এলাকার নদীর পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্যের কোটায়। এছাড়া শব্দ দূষণ কোথায়ও সহনীয় মাত্রায় নেই। দূষণের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় এসব জায়গায় বিশুদ্ধ পানি ও বায়ুর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশে এখন ভয়ঙ্কর দূষণের নাম হচ্ছে শব্দ দূষণ। সহনীয় মাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি শব্দের মধ্যে বাস করতে হচ্ছে রাজধানী ঢাকার মানুষদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৮০ ডেসিবেলের বেশি মাত্রার শব্দ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিরাপদ শব্দমাত্রা ৪৫ ডেসিবেল। ৬০ ডেসিবেলের বেশি মাত্রার মধ্যে দীর্ঘদিন বাস করলে শ্রবণশক্তি কমে যায়। হৃদযন্ত্রের স্পন্দন বৃদ্ধি পায়। শিশুদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা হয় বাধাগ্রস্ত। শব্দদূষণের কারণে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, অনিদ্রা, মাথাধরা-মাথাব্যথা এমনকি অস্বাভাবিক আচরণ করার মতো নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়। তবে বিভিন্নভাবে সৃষ্ট শব্দ ছাড়াও ঢাকা মহানগরীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বাস-ট্রাক লরির কর্ণবিদারী জঘন্য শব্দ সন্ত্রাসের আগ্রাসনের যাঁতাকলে প্রতি মুহূর্তে পিষ্ট হচ্ছে নগরবাসী। এটাকে নির্দ্বিধায় একটা বড় ধরনের জীবনবিনাশী সন্ত্রাসমূলক কর্মকা-ই বলা যায়। ঢাউস আকারের যন্ত্রদানবগুলোর অধিকাংশ চালক নামক দুর্বৃত্তগুলোর দস্যুতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বেআইনীভাবে বেশিরভাগ বড় বাসগুলোয় হাইড্রোলিক হর্ন লাগিয়ে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছাড়া তা বাজিয়ে রাস্তায় ত্রাস সৃষ্টি করে। প্রায়ই বড় বড় বাসের দস্যু প্রকৃতির এই চালকগুলো রাস্তার দু’পাশেই বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে। পথচারী বা রিক্সার যাত্রীসহ অন্যান্য ছোট যানে চলাচলকারী মানুষদের কিছুই করার থাকে না। রাজধানী ঢাকায় কান ফাটানো হর্ন বাজানো যেন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাস্তা ফাঁকা থাকলেও চালকরা জোরে হর্ন বাজায়। ওদের বেপরোয়া ও নির্লজ্জ মনোভাবের কোন সীমাপরিসীমা নেই। ওরা কোন কিছুরই তোয়াক্কা করে না। ওরা নিজেদের রাস্তার মহারাজা বলে মনে করে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, যানজটে আটকা পড়ে থাকে প্রায় সব ধরনের যানবাহন। কোনদিকে যাওয়ার উপায় নেই। তারপরও বড় বড় বাসের চালকরা হাইড্রোলিক হর্ন বাজিয়ে রিক্সার যাত্রী, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী এমনকি পথচারীদের কানের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। এটা স্রেফ পাশবিক আচরণ। কোন রিক্সায় বাবা-মায়ের সঙ্গে কোন অবুঝ শিশু থাকলে ঐ কোমলমতিদের কি অবস্থা হয় তা সহজেই অনুমেয়। আমি নিজে দেখেছি হাইড্রোলিক হর্নের বিকট আওয়াজে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে চলন্ত রিক্সায় মায়ের কোলে থাকা অবুঝ শিশুর কি বুকফাটা চিৎকার! বাস-ট্রাক লরির মানুষ নামের ড্রাইভার বাহাদুরদের সে বিষয়ে কোন ভ্রƒক্ষেপ নেই। এই হীন মানসিকতা সভ্য সমাজে আর চলতে পারে না। এটা জরুরী ভিত্তিতে বন্ধ করতে সামাজিক অন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজন।

ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা উড়ন্ত ধুলাবালি উদরস্থ করে রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে তাদের দায়িত্ব পালনের সময় অবশ্যই কিছুটা বুঝতে পারেন যে হাইড্রোলিক হর্নের তা-ব কতটা যন্ত্রণাদায়ক। রাস্তায় চলাচলকারী সহজ-সরল মানুষগুলো আসলেই অসহায়। রিক্সায় চলাচলকারী গরিব, নি¤œবিত্ত ও নি¤œ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষদের মুখ বুজে এই দুর্বৃত্তপনা সহ্য করা ছাড়া তাদের আর কিছু করার থাকে না।

গত আড়াই বছর ধরে রিক্সায় অফিসে যাওয়া-আসার সময় রাস্তায় চলাচলকারী বাসের হাইড্রোলিক হর্নের কর্ণবিদারী শব্দের তা-বে আমার ডান কানটি প্রায় অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাটি বর্ণনা দিলাম একজন ভুক্তভোগী হিসেবে শুধু রাস্তায় বাস-ট্রাক লরির হাইড্রোলিক হর্নের ভয়াবহতা তুলে ধরার জন্যই। সমস্যাটি হচ্ছে মন্ত্রী-এমপি ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বড় বড় নেতা ও সমাজের বিত্তশালীরা রাস্তায় চলাচল করেন বিলাসবহুল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে। তাদের তো এই সমস্যাটির সঙ্গে একেবারেই পরিচিত থাকার কথা নয়। তারা বসবাসও করেন রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকায়। সেখানে হয়তো হাইড্রোলিক হর্নের শব্দ ঢুকতেও ভয় পায়। তা না হলে যানবাহনের ড্রাইভার এমনকি মালিকদের দস্যুপনার দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে না কেন? যারা বড় রাস্তার পাশে বসবাস করেন তাদের দুর্দশার আর শেষ নেই।

হাইড্রোলিক হর্নের নির্মমতায় বাসায় তাদের টেকা দায় হয়ে পড়ে। পত্র-পত্রিকায় হাইড্রোলিক হর্নের বিরুদ্ধে এত লেখালেখির পরও যানবাহনের চালকদের এই দুর্বৃত্তপনা কেন বন্ধ হচ্ছে না? মারাত্মক শব্দ দূষণ সৃষ্টিকারী হাইড্রোলিক হর্ন বা বিকট শব্দ সৃষ্টিকারী অন্য যে কোন ধরনের হর্ন গাড়িতে ব্যবহারের বিরুদ্ধে দেশ আইন রয়েছে অথচ যথার্থ প্রয়োগ নেই।

শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষীয় উদাসীনতায় শব্দ দূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ২০০৬ সালে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা প্রণীত হলেও এর প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর ২৫, ২৭ ও ২৮ ধারামতে, শব্দ দূষণ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে অর্থদ- ও কারাদ- উভয় প্রকার শাস্তিরই বিধান রয়েছে। বিধি-বিধান থাকলেই হবে না, তার যথাযথ প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরী। শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণে মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান, বিভাগ, অধিদফতর এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে সমন্বিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিগত দশ বছরে আমি বেশ কয়েকবার বিষয়টির গুরুত্ব সম্পর্কে পুলিশ কর্তৃপক্ষেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছি। বেশ কয়েক বছর আগে বর্তমান আইজিপি শহীদুল হক যখন রাজধানী ঢাকার পুলিশ কমিশনার ছিলেন তখন একটি লেখায় তাঁর দৃষ্টিও আকর্ষণ করেছিলাম। আইজিপি সাহেব বাস-ট্রাকে হাইড্রোলিক হর্ন বাজানো বন্ধে অতি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেন বলে আমি মনে করি। জরুরী বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেয়ার জন্য ঢাকার বর্তমান পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার কাছেও থাকল আমার বিশেষ অনুরোধ। জনস্বার্থে বিয়য়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে মাননীয় হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়েও এ বিষয়ে দয়া করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। কারণ, এর আগেও অতি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মাননীয় হাইকোর্ট অনেক কিছু করেছেন। জনস্বার্থরক্ষা বিষয়ক ব্যাপারটির বিষয়ে কিছু করার থাকলে কার্যকর কিছু করার জন্য অনুরোধ করছি।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

প্রকাশিত : ১৩ মে ২০১৬

১৩/০৫/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: