মূলত মেঘলা, তাপমাত্রা ২৭.৮ °C
 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, ১১ আশ্বিন ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সেদিন আহতদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি কেউ, মুখে তুলে দেয়নি পানি...

প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারী ২০১৬
সেদিন আহতদের বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি কেউ, মুখে তুলে দেয়নি পানি...
  • রংপুরে পেট্রোলবোমার আগুনে পুড়ে ৬ জনকে হত্যার বছর পূর্তি আজ

স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর ॥ চলন্ত বাসে গান পাউডার আর পেট্রোলবোমার আগুনে পুড়ে অঙ্গার বাদাম-বুট বিক্রেতা রহিম বাদশার স্বজনের চোখে এখনও ভেসে ওঠে সেদিনের বীভৎসতা! ভয়াবহ সেই দিনটির আজ এক বছর পূর্ণ হলো। তবু এখনও রহিম বাদশার পরিবারের সদস্যদের কানে ভেসে আসে শুধু বাঁচাও...বাঁচাও, পানি... পানি... বেঁচে থাকার আকুতি আর আহাজারি। সেদিনের সেই ভয়াল দৃশ্য অনেকের ঘুমকে তাড়া করে বেড়িয়েছে পরবর্তী তিন মাস। স্মৃতি হাতড়ে কথাগুলো বললেন, রহিম বাদশার মামী শাশুড়ি আজিলা বেগম। তিনি বলেন, সে দিনের মধ্যরাতের সেই আর্তচিৎকার ধ্বনিতে কাতর কাউকেই বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি কেউ। মুখে তুলে দেয়নি এক বিন্দু পানিও। সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া আজিলা বেগম আরও বললেন, জীবদ্দশায় এমন দৃশ্য যেন আর কাউকে দেখতে না হয়। চোখের সামনে পুড়ে অঙ্গার হলো ভাগ্নি রহিমা, জামাই রহিম বাদশা আর প্রতিবেশি ১২ বছরের জেসমিন আকতার। শুধু এ তিনজনই নয়। এ দিনে কুড়িগ্রামের উলিপুর থেকে ছেড়ে আসা খলিল স্পেশাল নৈশ কোচটি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের বাতাসন এলাকা অতিক্রম করার সময়ই কোত্থেকে যেন উড়ে এলো এক অগ্নিকু-লী। আর এতেই নিমিষে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো বাসটি। বাঁচাও...বাঁচাও আর পানি... পানি বলে চিৎকারের মধ্যে সঙ্গে সঙ্গে শেষ গেল সব, নিভে গেল ৬টি জীবন্ত প্রাণ। এসব বলতেই জ্ঞান হারালেন আজিলা বেগম।

কুড়িগ্রামের নদীবেষ্টিত উলিপুর উপজেলার বিজয়রাম তবকপুর গ্রামের বাদাম-বুট ফেরিওয়ালা রহিম বাদশা (৪৬)। কুড়িগ্রাম, উলিপুর, রাজারহাট আর নাজিম খাঁ ছিল তার মূল ফেরির স্থল। এসব এলাকাতেই বাদাম-বুট বিক্রি করে বৃদ্ধা মা, স্ত্রী আর তিন সন্তানকে নিয়ে অভাবের সংসার জোড়াতালি দিতেন তিনি। এরই মাঝে এক বন্ধুর সুবাদে সুযোগ ঘটেছিল ঢাকার তুরাগ তীরের বিশ্ব ইজতেমায় ‘কলা বেচা আর রথ দেখার’। ইজতেমায় গিয়ে ভালোই আয় হয়েছিল সেবার। প্রথম সুযোগ হয়েছিল আখেরি মোনাজাতে অংশ নেয়ারও। আর সে সুযোগকেই কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন রহিম বাদশা। কিন্তু গত বছর তার সে সুযোগ গ্রহণের ইচ্ছেকে আর পূরণ করতে দেয়নি বিএনপি-জামায়াত জোট আহূত হরতাল অবরোধ। ১৩ জানুয়ারি উলিপুর থেকে ছেড়ে আসা খলিল এক্সপ্রেস (ঢাকা মেট্রো ব- ১১-৬৮৬০) গাড়িটিকে উদ্দেশে করে ছোড়া গান পাউডার সংবলিত একটি পেট্রোলবোমাই কেড়ে নিয়েছিল রহিমের গর্ভধারিণী মাকেসহ আরও ৬টি তরতাজা প্রাণ। সেই পেট্রোলবোমায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে ধুঁকে ধুঁকে এখন বেঁচে আছেন অন্তত ২১টি প্রাণ। তাদের অনেকেই পঙ্গু আজ। কারও হাত আছে তো পা নেই। কারও পা আছে তো হাত নেই। কান্নায় ভেঙে পড়ে রহিম বাদশার স্ত্রী নিলুফা জানালেন, সেদিনের সেই ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী তাদের ডেকেছিলেন। স্বামীহারা স্ত্রী এবং সন্তানদের জন্য তিনি তার দফতর থেকে ১০ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। তবে সে টাকা নগদে পাননি তারা। ব্যাংককে হিসাব খুলতে বলা হয়েছিল এ টাকার বিপরীতে প্রতিমাসে শুধু লভ্যাংশই নেবেন তারা। বাকি টাকা ছ’বছর পূর্ণ হলে পাবে। ব্যাংকে থাকা সে টাকার বিপরীতে বর্তমানে প্রতিমাসে ১০ হাজার ৭ শ’ টাকা লভ্যাংশ উত্তোলন করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। জমি জিরাত বলতে কিছুই নেই তাদের। মামী শাশুড়ির জমিতেই যেন ‘রসুলপুরের সেই আসমানীদের’ মতোই বসবাস তাদের। বড় ছেলে নুরুন্নবী লিটন এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। বড় মেয়ে রুমী খাতুন সেভেনে আর ছোট ছেলে লিমন উঠেছে চতুর্থ শ্রেণীতে। নিলুফা জানালেন, ফেরি করে বাদাম বুট বিক্রি করলেও তার স্বামীর ইচ্ছে ছিল ছেলে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষিত করে তুলবেন। কিন্তু ব্যাংকের এ টাকায় তার সংসার আর সন্তানদের লেখাপাড়া চালানো কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। এইচএসসি পড়ুয়া ছেলে নুরুন্নবী লিটন জানালো, প্রধানমন্ত্রী যখন তাদের অনুদানের চেক তুলে দেন তখন বলেছিলেন, তাকে একটি চাকরি দিবেন। কিন্তু চাকরির বয়স না হওয়ায় এখনও অনিশ্চয়তায় আছে সে। তবে আগামী বছরই ১৮ বছর পূর্ণ হবে তার। এ সময়ে অন্তত একটি চাকরি হলে সংসারটা টিকিয়ে রাখতে পারবে সে।

এদিকে বোমা মেরে মানুষ হত্যার পর ওদিনই মিঠাপুকুর থানার উপ-পরিদর্শক আব্দুর রাজ্জাক বাদী হয়ে ৮৭ জনকে এজাহার নামীয় এবং আরও ৪০-৫০ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে সন্ত্রাস দমন আইনে একটি মামলা করেন। পরে তদন্ত শেষে ১৩২ জনকে আসামি করে গতবছরের ১৫ নবেম্বর আদালতে চার্জশীট দাখিল করলে আদালত তা গ্রহণ করেন। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপজেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা এনামুল হক, উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান আব্দুল বাসেদ মারজানসহ জামায়াতের বেশকিছু নেতাকর্মীসহ ৫৫ জনকে গ্রেফতার করলেও এখনও ৭৭ জন চার্জশীটভুক্ত আসামি রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সঙ্গত কারণে সুশীল সমাজ এ মামলার ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

অন্যদিকে স্পেশাল ট্রাইবুন্যালের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুস সাত্তার জানান, নির্ধারিত ৯০ কার্যদিবসেই বিচার নিষ্পত্তি হবে।

প্রকাশিত : ১৪ জানুয়ারী ২০১৬

১৪/০১/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: